টাঙ্গাইলে বিদেশি সংস্থার নামে ঘর নির্মাণ, হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকা

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২০, ২১:২৬

টাঙ্গাইলের চারটি উপজেলায় প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশি সংস্থার নামে পাকা ভবন নির্মাণ করে দেওয়া হচ্ছে টাকার বিনিময়ে। এতে ঘর বাদ প্রতিজনের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত। আর পাকা ভবন নির্মাণে খরচ হচ্ছে প্রায় ২০ লাখ টাকা। বিদেশি দাতা সংস্থা কুয়েত সোসাইটি ফর রিলিফের নামে এসব ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে ঢাকায় অবস্থিত সংস্থাটি বলছে, তাদের এরকম কোনো প্রকল্প চালু নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন কর্মকা- জঙ্গিবাদ বিস্তারকেই ইঙ্গিত করেন। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলার ভূঞাপুর উপজেলার ভূঞাপুর বাসস্ট্যান্ড জামে মসজিদের ইমাম নাজিম উদ্দিন, তার শশুর আব্দুর রউফ ও কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গার শরিফ খান ও ঢাকার মাহবুবুল হক মিলে টাঙ্গাইলের চারটি উপজেলার প্রায় দুই শতাধিক মানুষের কাছ থেকে পাকা ভবনের কথা বলে ভবন প্রতি সাড়ে চার লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা করে আদায় করেছেন। এরমধ্যে ওই উপজেলাগুলোয় প্রায় ২০টির মতো ভবনের কাজ শুরু হয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে তারা ঘর নির্মাণের কাজ করছে। এছাড়া নাজিম উদ্দিনের শশুর আব্দুর রউফ উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলায় একই কায়দায় বিদেশি সংস্থার কথা বলে টাকা নিয়ে ঘর নির্মাণের কাজ করছে বলে জানা গেছে। তবে ঘর নির্মাণের জন্য নেওয়া টাকার কোনো রশিদ না দিলেও  মালিকের জমির দলিল ভোটার আইডি কার্ডের ফটোকপি নেওয়া হচ্ছে। 

কালিহাতী উপজেলার মালতি এলাকায় ঘর পাওয়া বানু বেগম, সাইফুল, সাদেকসহ আরও অনেকেই জানান, বিদেশি সংস্থা পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে ১৮-২০লাখ টাকার ঘর করে দিবে শুনে যোগযোগ করি। ভূঞাপুর বাসস্ট্যান্ড মসজিদের ইমাম নাজিম উদ্দিন ও এলেঙ্গার শরিফ খানের কাছে অগ্রিম টাকা জমা দিলে তারা ঘর করে দিচ্ছে। কিন্তু কোনো ধরনের কাগজপত্র তারা দেয় না। উল্টো আমাদের কাছ থেকে বাড়ির দলিলের ফটো ও ভোটার আইডি কার্ড নেওয়া হয়। 

ঘর নির্মাণের কাজ পাওয়া ঠিকাদার আনিস জানায়, কেউ যদি ঘর নিতে চায় তাহলে তাকে ভূঞাপুর বাসস্ট্যান্ড জামে মসজিদের ইমাম নাজিমের কাছে পাঠিয়ে দেই। তারা সেখানেই টাকার লেনদেন করে। আমরা শুধু পাঁকা ভবন নির্মাণের কাজ করি। প্রতিদিন কাজ শেষে লেবারসহ অন্য বিলের টাকা নাজিমের কাছ থেকে বুঝে নেই। 

কালিহাতী উপজেলার নারান্দিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শুকুর মাহমুদ ও তার লোকজন মিলে এলাকায় বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে ঘর দেওয়ার কথা বলে টাকা তুলেছেন। এছাড়া চেয়ারম্যান নিজেই টাকা নিয়ে তার আত্মীয়-স্বজনদের ঘর করে দিয়েছেন।

ঘর পাওয়া ভূঞাপুর উপজেলার কষ্টাপাড়া গ্রামের শামীম হোসেন জানান, ইমাম নাজিম ও তার শশুর আব্দুর রউফের মাধ্যমে সাড়ে চার লাখ টাকা দিয়ে পাকা ভবন পেয়েছি। ভবনের এ পর্যন্ত ছাদ নির্মাণ হয়েছে। ভবনের কাজ এখনও বাকি রয়েছে।

ভূঞাপুর বাসস্ট্যান্ড জামে মসজিদের ইমাম নাজিম উদ্দিন জানান, পাকা ভবনের জন্য বিদেশি সংস্থা কুয়েত সোসাইটি ফর রিলিফ অফিসে সাড়ে চার লাখ টাকা জমা দিতে হয় অফিস খরচের জন্য। টাকা লেনদেনের রশিদও প্রদান করা হয়। যারা ঘর নেয় তাদের সঙ্গে সরাসরি অফিসের যোগাযোগ করে দেই। এতে আমরাও কিছু টাকা পেয়ে থাকি।

ঢাকার দারুস সালামের মেসার্স এসএম মাহবুব ট্রেডার্সের মালিক মাহবুবুল হকের মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি এবিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

বিদেশী সংস্থা কুয়েত সোসাইটি ফর রিলিফের ঢাকার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের মানব সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা আব্দুল হালিম মোবাইলে জানান, টাঙ্গাইলে টাকার বিনিময়ে ১৮২টি ঘর নির্মানের বিষয়টি জানতে পেরেছি। তবে সেখানে (কুয়েত সোসাইটি ফর রিলিফ) কোনো কাজ চলমান নেই। তারা আমাদের নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে। তার দাবি, দেশের স্বাধীনতা ও মানবতা বিরোধী সংগঠনগুলোর একটি চক্র তাদের রূপ পরিবর্তন করে কৌশল অবলম্বন এসব কাজ করছে। তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এসব চক্রকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানান। 

মাওলানা ভাসানি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. নাজমুস সাদেকীন জানান, দেশের বাহির থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক অথবা এনবিআরের গাইড লাইন অনুযায়ী টাকা না আনা হয় তাহলে তা মানি লন্ডারি আইনে দ-নীয় অপরাধ এবং এই টাকা সরকারের হিসেবের মধ্যেও পড়ছে না। টাকা যদি ভিন্ন উপায়ে দেশে আনা হয় সেটা ভিন্ন খাতে ব্যয় হতে পারে। তা জঙ্গি অর্থায়নের কাজেও ব্যয় হতে পারে। সরকারের কাছে সঠিক হিসাব না থাকায় এই টাকা অপব্যবহার হচ্ছে। এই টাকার বেনিফিট রুরাল অথবা ভার্নাবেবল পিপুলের কাছে যাওয়ার কথা ছিলো সেটাও তারা পাচ্ছেনা। যার ফলে মুদ্রাস্ফীতিসহ সার্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ছে। 

মাওলানা ভাসানি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি ও পুলিশ সাইন্সের সহযোগী অধ্যাপক ড. জহিরুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশে যুদ্ধ অপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ার পর থেকে জঙ্গী সংঘঠনগুলো মাথা তুলে দাড়ানোর সাহস পাচ্ছেনা। তবে তারা তাদের অস্তিত্ব ধরে রাখতে নানা কৌশল অবলম্বন করছে। এক্ষেত্রে মনস্তাত্বিক সমর্থক আদায়ও তাদের একটি কৌশল। তাই শুধু ঘর করে দেয়া নয় বিভিন্ন সময় দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের স্কলারশিপের মাধ্যমে বিদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে। ফলে সেখান থেকে তারা ওই শিক্ষার্থীদের মগজ ধোলাই করে জঙ্গি সংগঠনগুলোর সাথে সম্পৃক্ত করছে এবং তার পড়াশুনায় অর্থ ব্যয় করে। এছাড়া গ্রাম পর্যায়ে গরীব অসহায় মানুষকে সহযোগিতার নামে তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এখন হয়তো চোখের সামনে দেখা যাচ্ছে তারা ঘর করে দিচ্ছে। কিন্তু তারা এরবাইরেও যারা বেকার ও অসহায় গরীব রয়েছে তাদের সহায়তা করছে। তাদের এই কাজগুলোকে যথাযথভাবে নজরদারী করা প্রয়োজন। 

আরও পড়ুন: মদনে নৌকাডুবির তদন্ত প্রতিবেদন: প্রচণ্ড বাতাস ও ঢেউ প্রাণহানীর কারণ

টাঙ্গাইলের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ফিল্ড অফিসার মোস্তাক আহমেদ বলেন, টাকা নিয়ে ঘর নির্মাণের কোনো তথ্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কাছে নেই। এধরনের কোনো তথ্যও নেই। তবে কেউ যদি অভিযোগ করেন তাহলে সেটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

কালিহাতীর সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) রাসেল মনির জানান, তাদের ঘর নির্মাণের বিষয়টি নিয়ে গোয়েন্দা সংস্থাসহ পুলিশের সদস্যরা কাজ করছে। এবিষয়ে যারা ঘর নির্মাণ করে দিচ্ছে তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য চাওয়া হয়েছে। কিভাবে তারা এই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে সেটার তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইত্তেফাক/এসি