এখনই খুলছে না নাট্যমঞ্চ

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২০, ২২:২৭

এ বছর মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে ঢাকার মঞ্চে নাটক দেখেছে দর্শক। তারপর করোনা মহামারিতে বন্ধ সব মঞ্চ। বন্ধ মঞ্চ নাটকও। সময়ের বাস্তবতায় সবকিছু স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও চার মাস পেরুলেও নাটকের দেখা নাই ঢাকাসহ সারাদেশের নাট্যমঞ্চে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে করোনা ভাইরাস ছড়ানোর ভয়ে দর্শকরা কয়েক ঘণ্টা বসে নাটক দেখতেও আগ্রহী হবেন না। ফলে এ বছর মঞ্চে আর নাটক মঞ্চস্থ হবে বলে আশা করছেন না মঞ্চ সংশ্লিষ্টরা। অনলাইনে কিছু গানের ও আবৃত্তির অনুষ্ঠান হলেও নাটকসহ সকল ধরনের অনুষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ। শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চগুলো জনমানবশূন্য। শহিদ মিনার, টিএসসি, শাহবাগ প্রতিটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রই নির্জন, সুনসান।

যদিও তরুণ নাট্যকর্মীরা চান মঞ্চ খুলে দেওয়া হোক। তারা বলছেন, যেহেতু অফিস আদালত সব খুলে দেওয়া হয়েছে তাহলে মঞ্চগুলোই বা বন্ধ থাকে কেন! তবে, জীবনের প্রয়োজনে অফিস আদালত খুলে যাওয়াকে স্বাগত জানালেও করোনা ঝুঁকির মধ্যে মঞ্চ খুলে দেওয়ার পক্ষপাতী নন অনেক সংস্কৃতিকর্মী। তারা বলছেন, দর্শক, শিল্পী, কলা কুশলীদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলা ঠিক হবে না। যেখানে ক্রিকেট ও ফুটবল খেলোয়াড়দের করোনামুক্ত রাখতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে সে পরিস্থিতিতে মঞ্চ উন্মুক্ত করে দিয়ে সংস্কৃতিকর্মী ও দর্শকদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলা ভুল সিদ্ধান্ত হবে।

এ প্রসঙ্গে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, অফিস আদালত খুললেও স্কুল কলেজ সব বন্ধ। নাটক শারীরিক ক্রিয়া। মহড়া করতে হয়। মঞ্চেও সবসময় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা যায় না। তাই জীবনকে আগে প্রাধান্য দিতে হবে। করোনা পরিস্থিতি আরেকটু উন্নতি হলে তারপর সাংস্কৃতিক কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে। এ সময় দর্শকদেরও ঝুঁকির মুখে ফেলা ঠিক হবে না। গোলাম কুদ্দুছ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে শিল্পী কলাকুশলীদের যে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছিল সেটাই দ্বিতীয় দফা প্রদানের দাবি জানান। তিনি বলেন, অনেক শিল্পী আর্থিক কষ্টে রয়েছেন। মঞ্চ চালুর চাইতে তাদের পাশে দাঁড়ানো এখন বেশি জরুরি।

বর্তমানে সারাদেশে ছোট বড় মিলিয়ে ৫ শতাধিক নাট্যদল যুক্ত রয়েছে নাট্যচর্চায়। এর মধ্যে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত নাট্যদলের সংখ্যা ৩৮৬টি। রেপার্টরি দলের সংখ্যা প্রায় ৫০টি। আর গ্রাম থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত আছে ২৬২টি দল। এসব দলের ১০ হাজারের বেশি নাট্যকর্মী যুক্ত রয়েছেন সংস্কৃতির এ মাধ্যমে। অধিকাংশ নাট্যকর্মীর আয়ের উত্স ছিল গান শেখানো, নাচ শেখানো, টিউশনি কিংবা ছোটখাটো চাকরি। এমনকি পাঠাও বা উবার রাইড শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে জীবিকা চালিয়ে অনেকে যুক্ত ছিলেন থিয়েটার চর্চায়। কিন্তু মহামারির কারণে ঢাকা ছেড়েছেন অনেকেই। নাটকের দলগুলোকে বাঁচাতে প্রতীকী প্রতিবাদের পাশাপাশি আয়ের উত্স খুঁজতে নাট্যদল প্রাঙ্গণেমোর চালু করেছে থিয়েটার ভ্যান। কিছুদিন আগেও সেগুনবাগিচার শিল্পকলা একাডেমির সামনে থাকা সেই ভ্যানে সবজি বিক্রি করেছেন নাট্যকর্মীরা। এখন অনলাইনে চলছে সেই কার্যক্রম।

এ প্রসঙ্গে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সভাপতি ও শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী বলেন, করোনাকালে সবখানেই স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে। সংস্কৃতি অঙ্গনও এর বাইরে নয়। পরিস্থিতি অনুকূল না হলে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শুরু করা কঠিন। এর মধ্যেও দিবসভিত্তিক অনুষ্ঠান হচ্ছে। তাছাড়া, শিল্পকলা নিয়মিতভাবেই অনলাইনভিত্তিক অনুষ্ঠান চালু রেখেছে। এর পাশাপাশি দুস্থ শিল্পী কলাকুশলীদের সরকারি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তবে, মঞ্চ উন্মুক্ত হবে কি না, সে বিষয়ে এখনই বলা যাচ্ছে না। আবেগ দিয়ে নয়, দর্শক ও শিল্পী কলাকুশলীদের নিরাপত্তা বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

থিয়েটারের স্থবিরতায় হতাশার কথা জানিয়েছেন নাট্যজন মামুনুর রশীদ। তিনি জানান, থিয়েটারের বিকাশে মঞ্চশিল্পীদের অনেক ত্যাগ থাকলেও তারা চিরকালই পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ভুগেছেন। অথচ অনেক দেশেই থিয়েটারকর্মীরা সরকারিভাবে ‘স্যালারি গ্র্যান্ট’ পান। এমনকি পাশের দেশ ভারতের নাট্যকর্মীরাও এই সুবিধা পান। আমাদের দেশেও এটা প্রচলিত হওয়া উচিত। যারা নিয়মিত নাটক মঞ্চায়নের সঙ্গে যুক্ত সেসব নাট্যদলের নাট্যকর্মীদের এই সুবিধার আওতায় আনা উচিত।

ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের (আইটিআই) সাম্মানিক সভাপতি নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার জানান, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের অব্যাহত ধারায় ২০২০ সালে নাটক মঞ্চায়নের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তাছাড়া বর্তমান বাস্তবতায় দেড়-দুই ঘণ্টার মঞ্চনাটক দেখার বিষয়ে দর্শকরাও খুব একটা আগ্রহী হবেন না। মঞ্চশিল্পীদের জন্য এটা অনেক বড় দুঃসংবাদ। কারণ, তারা নিজের পয়সা খরচ করে মঞ্চের জন্য সময় ব্যয় করেন। আলোক প্রক্ষেপণকারী, সেট ডিজাইনার, কস্টিউম ডিজাইনাররা মঞ্চ থেকে আয় করলেও অভিনেতা-অভিনেত্রীরা বিনা সম্মানিতেই শ্রম দেন। করোনাকালে নাটক না হওয়ায় তাদের মানসিক উত্কণ্ঠাও ক্রমশ বাড়ছে। তবে সংকট কেটে গিয়ে একসময় আবার সুদিন আসবে। সেই সুসময়ের অপেক্ষায় থাকা ছাড়া এখন আর উপায় নেই। এর বাইরে মঞ্চনাটকের পুনরুজ্জীবনে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতারও প্রয়োজন হবে।

বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সভাপতি লিয়াকত আলী লাকী জানান, করোনা বাস্তবতায় ফেডারেশনের উদ্যোগে ‘স্বল্প ব্যয়ে নতুন স্থানে নতুন নাটক’ শীর্ষক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। মহামারির প্রকোপ কমে শিল্পকলা একাডেমি খুলে গেলে ৯০টি মিলে এক মাসের জন্য হল ভাড়া নেবে। এ পদ্ধতিতে নাটকের সময়ের ব্যাপ্তি কম হবে। অভিনয়শিল্পীর সংখ্যাও কম হবে। ব্যয়বহুল বিশাল লাইটিং বা মিউজিক থাকবে না। প্রতিদিন একাধিক দলের একাধিক নাটকের মঞ্চায়ন হবে। একসঙ্গে তিনটি দলের তিনটি নাটক হলো। এতে সবার হল ভাড়া কমে যাবে। অন্যান্য ব্যয়ও কমে যাবে।