বৈরুত বিস্ফোরণ জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করবে কি

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২০, ২১:৪৩

এম এ আল আমিন

 

লেবাননে এর আগেও দুঃসময় এসেছে। তবে ৪ আগস্ট বৈরুত বন্দরে বিস্ফোরণ দেশটিকে নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে। সেখানে রাজনৈতিক সংকট দীর্ঘদিনের। এই সংকটের ফলে সরকারগুলোও ঠিকমতো কার্যকর হতে পারেনি। দুর্নীতি, বিচারহীনতা ও অর্থনৈতিক দুরবস্থায় জনমনে ক্ষোভ জমছিল।

৪ আগস্টের বিস্ফোরণের ভয়াবহতা এত ব্যাপক ছিল যে পাঁচ মাইল ব্যাসার্ধ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বন্দরের শস্যগুদাম। বন্দর এলাকায় ঘটনা ঘটলেও মানবসৃষ্ট ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে পুরো শহর। ঐ ঘটনায় দুই শতাধিক ব্যক্তি নিহত এবং আহত হয় ৬ হাজারের ওপর। ঘটনার পাঁচ দিনের মাথায় ক্ষমতাসীন সরকার পদত্যাগ করে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় বিস্ফোরণে ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে লেবাননের অনেক বছর সময় লাগবে। দেশটি ধূসর অতীতের জের এখনো টেনে চলেছে। গত অক্টোবর থেকে চলছে সরকার বিরোধী বিক্ষোভ। করোনাকালেও এ বিক্ষোভ থামেনি। এ সময়ের মধ্যে লেবাননের লিরার দর ডলারের মোকাবিলায় ৮০ শতাংশ পড়ে গেছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি কেবল সরকারের পদত্যাগই ছিল না বরং এলিট শ্রেণিরও শাসনের অবসান তারা চেয়েছে। শান্তিপূর্ণ এ বিক্ষোভ অক্টোবর আন্দোলন নামে শুরু হয়েছিল। বর্তমান অবস্থায় সাধারণ মানুষ প্রচণ্ড হতাশ। তারা চায় অবস্থার আমূল পরিবর্তন।

১৯৭০ ও ৮০ এর দশকে লেবানন গৃহযুদ্ধ, বিপ্লব ও প্রতিবিপ্লবের মধ্যে ঘুরপাক খায়। ৯০ এর দশকের গোড়াতে সেখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কিছুটা ফিরে আসে। দেশটি শিয়া, সুন্নি, খ্রিষ্টান ও দ্রুজের গোষ্ঠীগত বিভাজন যেমন আছে, তেমনি আছে রক্ষণশীল ও প্রগতিশীল এবং এলিট শ্রেণি ও সাধারণ মানুষের বিভাজন। আছে দুর্নীতি, অর্থপাচার ও সামাজিক বৈষম্যের মতো বিষয়গুলো। গৃহযুদ্ধের পর অবস্থা মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসেনি। ক্ষমতা ঘুরে-ফিরে গেছে এলিট শ্রেণির হাতেই।

১৯৭৫ সাল থেকে দুই প্রভাবশালী প্রতিবেশী সিরিয়া ও ইসরাইল লেবাননে আগ্রাসন চালিয়েছে এমনকি রাজধানী বৈরুতও তারা দখল করে নিয়েছিল। লেবাননের বহু মানুষের মন থেকে সংঘাতময় সে সময়ের কথা এখনো মুছে যায়নি। গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মার্কিন, ফরাসি ও অন্যান্য ইউরোপীয় সেনাদল সেদেশের মাটিতে পা রেখেছে। এসব দেশের পাশাপাশি উপসাগরীয় কিছু দেশের সেনাবাহিনীও দীর্ঘদিন লেবাননে অবস্থান করেছে। বিদেশি বাহিনী অনুপ্রবেশের সময় বিবদমান স্থানীয় পক্ষগুলোর কেউ কেউ বিশেষ করে শাসকদের পক্ষ থেকে তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভুলে গিয়ে তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য বিদেশি বাহিনীকে স্বাগত জানায়। লেবাননের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ হিযবুল্লাহ। ইরানের সমর্থনপুষ্ট শিয়া গ্রুপটির প্রভাব দেশটির রাজনীতি, অর্থনীতি, সামরিক বাহিনী এমনকি সামাজিক পরিমণ্ডলেও বহুদূর বিস্তৃত। হিযবুল্লাহর মাধ্যমে ইরান ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলে বিস্তৃত এলাকা জুড়ে নিজের প্রভাববলয় গড়ে তুলেছে। নয় বছরের গৃহযুদ্ধে সিরিয়ায় আসাদের টিকে থাকার নেপথ্যে বাইরের যেসব শক্তি কাজ করেছে তার মধ্যে হিযবুল্লাহ অন্যতম। তারা ইরাক এবং ইয়েমেনেও মিলিশিয়াদের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।

বৈরুত বিস্ফোরণ জনগণকে বেপরোয়া করে তুলতে পারে। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থা, মূল্য হ্রাস পাওয়া মুদ্রা সব মিলিয়ে যে বিক্ষোভ চলছিল তা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। সাধারণ মানুষের কাছে এটিও স্পষ্ট নয় যে তাদের একটি পরিবর্তন দরকার, একটি বড় রকম পরিবর্তন। কেবল সরকার পরিবর্তন হলেই সে লক্ষ্য পূরণ হবে তা নয়, বরং রাজনীতির খোলনলচে বদলে যাক সেটাই আশা করে আমজনতা। পশ্চিমা দেশগুলো এখনো লেবাননের জনগণের পাশে দাঁড়াতে চায়। তারা ঘটনার একটি আন্তর্জাতিক তদন্তের ওপর জোর দিচ্ছে। যেটি হবে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য। পশ্চিমা দেশগুলো দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ত্রাণ সহযোগিতা, খাদ্য ও চিকিত্সাসহায়তা এবং সাময়িক আশ্রয়ের জন্য সহযোগিতা করলেও দেশটির অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য বড় ধরনের কোনো সহায়তার প্রস্তাব দেয়নি। কারণ দেশটিতে দায়িত্বশীল বা জবাবদিহিতামূলক কর্তৃপক্ষ নেই। বিস্ফোরণের কিছুদিন আগে বৈরুতের অসহযোগিতায় হতাশা প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফ। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য আইএমএফ বেশকিছু অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছিল কিন্তু লেবাননের সরকার এতে রাজি হয়নি। বিস্ফোরণের ঘটনাকে দেখা যেতে পারে পরিবর্তনের জন্য জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার একটি উপলক্ষ্য হিসেবে। জনগণ এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে তা হবে ট্র্যাজেডির একমাত্র ইতিবাচক দিক।