প্রাণবন্ত এবং জীবনঘনিষ্ঠ ছবির জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দারুণ সুনাম কুড়িয়েছেন লন্ডনের চিত্রশিল্পী সারাহ এসেকিয়েল। মূলত প্রতিকূল শারীরিক অবস্থার মধ্য থেকেও অসাধারণ সব শিল্পকর্ম সৃষ্টির জন্যই তিনি অনন্য এক উচ্চতায় জায়গা করে নিয়েছেন। স্ট্রোকের কারণে শারীরিকভাবে পুরোপুরি অক্ষম হয়ে পড়া সারাহ তার ছবিগুলো এঁকেছেন চোখের ইশারায় বা চোখ-ট্র্যাকিং প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে।
২০০০ সালের আগে পর্যন্ত তিনি পুরোপুরি সুস্থই ছিলেন। কিন্তু সে বছর দ্বিতীয় সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় দুরারোগ্য মোটর নিউরন রোগে আক্রান্ত হন সারাহ। এই মোটর নিউরন রোগের আরেক নাম এমায়োট্রফিক ল্যাটারাল সেক্লরোসিস (এএলএস) বা লাউ গেহরিগ রোগ। এই রোগে আক্রান্তরা ক্রমাগতভাবে সম্পূর্ণ শারীরিক অসাড়তার দিকে ধাবিত হয়। কিন্তু এমন পরিস্থিতির মধ্যেও দমে যাননি সারাহ এসেকিয়েল। তিনি ছবি এঁকেছেন চোখ ট্র্যাকিং প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে। এটি এমন এক প্রযুক্তি যা চোখের নড়াচড়া দিয়ে ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন ডিভাইস নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করে। এই প্রযুক্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আই ট্রাইব-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা সিউন আলস্ট্রাপ বলেন, এই প্রযুক্তি যে কোনো ডিভাইসে ব্যবহার করা যেতে পারে, যেমন—কম্পিউটার, স্মার্টফোন, ঘড়ি কিংবা গাড়িতে যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার চিন্তা অনুযায়ী যে কোনো কাজ সমাধানে সহায়তা করবে।
এএলএস এমন এক প্রযুক্তি যা গড়ে ৫০ হাজার মানুষের মধ্যে একজনের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হওয়া প্রসঙ্গে সারাহ বলেন, অসুস্থ হওয়ার আগে পর্যন্ত আমি সাদামাটা জীবনযাপন করতাম। আমি পুরোপুরি একজন মায়ের দায়িত্ব পালন করতাম। কিন্তু অসুস্থ হওয়ার পর আমার জীবনধারা অনেকটাই বদলে গেছে। প্রথমে নিজেকে অনেক বেশি অসহায় মনে হয়েছিল। কিন্তু প্রযুক্তি আমার জীবনকে আরো অর্থবহ করে তুলেছে।
চোখ ট্র্যাকিং প্রযুক্তিতে ‘আই গেজ’ যন্ত্র শারীরিকভাবে অক্ষম মানুষকে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সাহায্য করে। এই প্রযুক্তিতে কেউ তার চোখ ব্যবহার করে কম্পিউটারের কারসর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কম্পিউটার চালনা, ক্যামেরা চালনা কিংবা অন্যান্য কাজ সমাধা করতে পারে। চোখ ট্র্যাকিং প্রযুক্তির সহায়তায় সিএনএনকে সাক্ষাত্কারও দিয়েছেন তিনি। অনলাইন দুনিয়ায় বিচরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, এমনকি অনলাইনের মাধ্যমে কেনাকাটা সবকিছুই তিনি এই প্রযুক্তির সহায়তায় করেন। কিন্তু তিনি তার এই প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার করেছেন শিল্পকর্ম চর্চার ক্ষেত্রে। এভাবেই তিনি এঁকেছেন অসাধারণ সব চিত্রকর্ম।
নিজের কাজ সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি যখন কাজ করি তখন পুরোপুরি তার মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দেই। আমার সব সমস্যা তখন অদৃশ্য হয়ে যায়। আমি আগে যখন হাতে ছবি আঁকতাম এখনো তেমনভাবেই ছবি আঁকতে পারি। তবে তার জন্য আমাকে প্রতিনিয়ত শিখতে হয়। যদি এই প্রযুক্তি না থাকত তাহলে হয়তো অসুস্থ হয়ে পড়ার পর আর কখনোই ছবি আঁকা হতো না আমার। এই প্রযুক্তি আমাকে সম্পূর্ণ নতুন এবং আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রেরণাদায়ক জীবন উপহার দিয়েছে।—সিএনএন
