তরুণদের মুখের দিকে যদি একবার তাকানো হয়, তবে দেখা যায় সেখানে আনন্দের ঝলকানি যেমন আছে, তেমনি নিজেকে মেলে না ধরার আক্ষেপও আছে। সফলতা আছে, ব্যর্থতা আছে। আশা, আত্মবিশ্বাস আর অজেয়কে জয় করার অসীম সম্ভাবনা আছে। নতুন চিন্তা আর ভেতরের সৃষ্টিশীলতাকে প্রকাশ করার অদম্য সাহস আছে। অন্যদিকে, এর বিপরীত প্রতিক্রিয়াও আছে। তবে বাস্তবতা যাই হোক না কেন, তরুণদের এগিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের অনেক দায়বদ্ধতা আছে। সেখানে তরুণদেরও নির্জীব হয়ে বসে না থেকে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা অলস তরুণ চাই না, আমরা উদ্যোগী তরুণ চাই। সন্ত্রাস আর জঙ্গিবাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তারা জীবন ধ্বংস করুক এটি আমরা চাই না। আমরা চাই তরুণরা যেমন নিজেদের জীবন গড়বে, তেমনি জীবন গড়ার জাদুকরী শক্তি নিয়ে অন্যদের অনুপ্রাণিত করবে। আমরা নৈরাশ্যবাদী তরুণ চাই না, আমরা আশাবাদী তরুণদের চাই। আমরা তরুণদের দুর্নীতিবাজ হিসেবে দেখতে চাই না, আমরা তরুণদের সততা ও সমৃদ্ধির পক্ষে দেখতে চাই। আমরা স্বপ্নবাজ, আত্মবিশ্বাসী, সাহসী হিসেবে তরুণদের দেখতে চাই। কল্পনা, আবেগ, বাস্তবতা ও চিন্তাশীলতার সমন্বয়ে আমরা তরুণদের অগ্রযাত্রা দেখতে চাই।
আমরা তরুণদের জয়ও দেখতে চাই, পরাজয়ও দেখতে চাই। কারণ জয়ের মধ্যে আছে আত্মবিশ্বাস আর পরাজয়ের মধ্যে আছে অভিজ্ঞতা। আমরা চাই অমিত শক্তির সূর্যোদয়ের মতো আলোকিত তরুণদের। আমরা তরুণদের উদার মানবিক মূল্যবোধের মানুষ হিসেবে দেখতে চাই। সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় দেখতে চাই। প্রযুক্তির উদ্ভাবনে দেখতে চাই। ভালো মনের মানুষ হিসেবে দেখতে চাই। আমরা তো শুধু তরুণদের কাছে চাচ্ছি আর চাচ্ছি। তরুণদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা যেন আকাশ ছোঁয়া। কিন্তু দেনা-পাওনার হিসাবটা তো মেলাতে হবে। কিভাবে মেলানো সম্ভব সেটি নিয়েই আমাদের বেশি ভাবতে হবে। তারুণ্যের প্রত্যাশা পূরণে নতুন সরকারের কাছ থেকে অনেক ভালো আইডিয়া আমরা পাবো এটা আমরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। তরুণদের চাওয়া-পাওয়ার প্রথম উচ্চারণ হলো ‘কাজ চাই, কাজ চাই, কাজ চাই’। খুব সহজ কথা কর্মসংস্থান। কর্মসংস্থান দুই ধরনের হতে পারে। এর মধ্যে একটি হলো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা আর অন্যটি হলো নিজে উদ্যোক্তা হয়ে নিজের ও অন্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।
এখন আমাদের দেশে আইটি পার্ক হচ্ছে। বিশেষ শিল্পাঞ্চল হচ্ছে। অর্থনৈতিক জোন তৈরি করা হয়েছে। সমুদ্রসীমা জয়ের মাধ্যমে সেখানেও কাজের অনেক ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট এখন আর স্বপ্ন নয়, এখন এটি বাস্তবতা। এসব জায়গায় তরুণদের কিভাবে সম্পৃক্ত করে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায় তার পরিকল্পনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আশ্বাস দিয়ে আর তরুণদের বোঝানো যাবে না বরং বিশ্বাস সৃষ্টি করে তাদের অনুপ্রাণিত করতে হবে। পরিকল্পনা করে বসে থাকলে চলবে না, বরং পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। রপ্তানিমুখী শিল্প-কারখানা গড়ে তুলতে হবে। বর্তমানে যে শিল্পগুলো আমাদের দেশে রয়েছে তার বাইরে আরো নতুন নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপন করতে হবে। এই পণ্যগুলোর বাজার সৃষ্টির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
আমাদের দেশে এখন মেটেরিয়াল তৈরির কোনো শিল্প-কারখানা নেই। আমাদের দেশে বায়োলুব্রিক্যান্ট তৈরির শিল্প-কারখানা খুব একটা চোখে পড়ছে না। উন্নত মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি তৈরির শিল্প-কারখানা আমরা দেখছি না। সেন্সর, সফটওয়্যার, যন্ত্রাংশ তৈরির শিল্প-কারখানাও নেই। রোবোটিক্স বা অটোমেশনকে এখনও আমরা শিল্পে রূপান্তরিত করতে পারিনি। বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, সেল ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োলজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ন্যানোটেকনোলজি এর জ্ঞান ও গবেষণাকে প্রাধান্য দিয়ে যে আধুনিক শিল্প-কারখানা গড়ে তোলা যায়, সেটা নিয়ে আমরা তেমন একটা ভাবছি না। এগুলো নিয়ে ভাবতে হবে। তরুণদের গবেষণায় আরো বেশি করে সম্পৃক্ত করতে হবে। তরুণদের গবেষণায় অনুপ্রাণিত করতে হলে গবেষণাকে তরুণদের জন্য বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। যদি এটি করা যায় তবে তরুণরা চাকরির পেছনে না ছুটে গবেষণার মাধ্যমে নতুন নতুন শিল্প ধারণা সৃষ্টি করতে পারবে। সেই ধারণা বাস্তবে প্রয়োগ করে শিল্পায়ন বাড়ানো যেতে পারে। তবে তরুণ গবেষকদের গবেষণায় ধরে রাখতে হলে অর্থের বরাদ্দ রাখতে হবে। বাইরের দেশগুলোতে তরুণদের কর্মক্ষেত্রের পরিসর বাড়াতে হবে। তরুণদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের জন্য বিনা অর্থে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তরুণদের বাইরে পাঠানোর ক্ষেত্রেও সরকারকে প্রয়োজনীয় ঋণসহায়তাসহ সহায়তার হাত প্রসারিত করতে হবে। এই ধরনের জনশক্তি রপ্তানিকে বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারিগরি শিক্ষাকে আরো বেশি প্রাধান্য দিয়ে কর্মমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে শিল্প-উদ্যোক্তা সৃষ্টি করতে হবে। তরুণদের জন্য বাজেটে আলাদাভাবে অর্থ বরাদ্দ রাখা যেতে পারে। এটাকে তরুণদের জন্য বিনিয়োগ হিসেবে চিন্তা করতে হবে। কয়েকজন তরুণ মিলে যাতে নিজেরাই ছোট বা মাঝারি আকারের শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে পারে এজন্য বিভিন্ন প্রজেক্ট অনুমোদন করা যেতে পারে। শিল্পায়ন সৃষ্টি, কর্মক্ষেত্র তৈরি ও প্রোফিটের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তরুণবান্ধব শিল্পনীতি প্রণয়ন করতে হবে। আমাদের দেশের তরুণদের অনেক সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী ধারণা আছে কিন্তু লোন নিয়ে এগুলো শুরু করার সামর্থ্য নেই। ফলে তরুণরা লোনের বোঝা মাথায় নিয়ে নতুন শিল্প ভাবনায় নিজেদের সম্পৃক্ত করতে চায় না।
তরুণদের আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনার সাথে যুক্ত করে কৃষিকে প্রকৃত অর্থে শিল্পায়নে রূপ দিতে হবে। আমাদের দেশে আবহমানকাল ধরে চলে আসা কুটির শিল্পগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে উন্নত করে তরুণদের এর সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। একজন মানুষ ও একটি শিল্প এই ধারণা গ্র্রাম কিংবা শহর সব জায়গার তরুণদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নিতে হবে। নিজের দেশ, স্বাধীনতার ইতিহাস আর সংস্কৃতি চর্চায় তরুণদের অনুপ্রাণিত করতে হবে। সাহিত্য-সংস্কৃতি ও খেলাধুলা চর্চার মাধ্যমে তরুণদের মানসিক শক্তির বিকাশ ঘটানোর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তরুণদের নিয়ে গবেষণা করতে হবে। গবেষণার মাধ্যমে অর্জিত ফলাফলকে তরুণদের উন্নয়নে কাজে লাগাতে হবে। তরুণরা আবেগপ্রবণ হয় বলে অনেক সময় মন ও চিন্তাশীলতা তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। ফলে তাদের জীবনের বিভিন্ন সময়ে নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা, চ্যালেঞ্জ ও জটিলতা আসে কিন্তু সেগুলো কিভাবে মোকাবিলা করতে হবে তা তাদের জানা থাকে না। এজন্য তরুণদের মানসিক শক্তির বিকাশ ও মেধার উত্কর্ষ সাধনের জন্য মনোবিজ্ঞানীদের কাজে লাগাতে হবে। তরুণদের ইতিবাচক প্রযুক্তির সাথে যুক্ত করে বই পড়ায় আগ্রহী করে তোলার জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন কনফারেন্স ও সেমিনারে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
তরুণদের কিভাবে সফলতা ও অনুপ্রেরণার গল্প শোনানো যায় সেটি নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। বার বার ব্যর্থ হয়ে জীবনে যারা সফল হয়েছে, তাদের গল্পও তরুণদের শোনাতে হবে। বিভিন্ন বিষয়ে তরুণদের নেতৃত্বের গুণাবলি কিভাবে গড়ে তোলা যায় সে বিষয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে। বঙ্গবন্ধু আমাদের দেশের তরুণদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রীয় খরচে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশে ফিরে তারা অর্জিত জ্ঞানকে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাবে। আমরা এখনও যেসব বিষয় ও প্রযুক্তিতে পিছিয়ে আছি সে জায়গাগুলোতে তরুণদের রাষ্ট্রীয় খরচে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য সরকারি খরচে প্রেরণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তবে এ তরুণরা যাতে দেশে ফিরে উন্নয়নে অংশীদার হতে পারে সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। তরুণরা তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, সফলতা, উদ্ভাবন, ভাবনা, ব্যর্থতা ও হতাশার বিষয়গুলো যাতে সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক মহলের কাছে তুলে ধরতে পারে সেজন্য একটি সেল গঠন করা যেতে পারে। এই সেলের প্রধান লক্ষ্যই হবে তরুণদের চিন্তাশীলতাকে প্রাধান্য দিয়ে তাদের সমস্যাগুলোর বাস্তব সমাধান করা।
n লেখক: অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর
