প্রত্নতত্ত্ব

শহর মোহাম্মদাবাদ

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২০, ১৯:২৮

লেখা ও ছবি :হাসিনুর রেজা চঞ্চল

 

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে রয়েছে প্রায় ৭০০ বছরের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। প্রায় তিন বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এখানে আবিষ্কৃত হয় প্রাচীন শহর মোহাম্মদাবাদ। পনেরোটিরও বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে বেশিরভাগই মসজিদ। শহর মোহাম্মদাবাদ সম্পর্কে জানা যায়, প্রাচীনকালে বারোবাজারের নাম ছিল ছাপাইনগর, হিন্দু আর বৌদ্ধ শাসকদের রাজধানী। বারো জন সহচর নিয়ে খান জাহান আলী এখানে আসেন। সেখান থেকেই এর নাম বারোবাজার। যুদ্ধ কিংবা মহামারিতে ছাপাইনগর ধ্বংস হয়ে যায়।

বারোবাজারের মসজিদগুলোর সঙ্গে বাগেরহাটের কয়েকটি মসজিদের মিল রয়েছে। বারোবাজারের রেললাইনের পশ্চিম পাশে রয়েছে সাতগাছিয়া মসজিদ, ঘোপের ঢিপি কবরস্থান, নামাজগাহ কবরস্থান, গলাকাটা মসজিদ, জোড়বাংলা মসজিদ, মনোহর মসজিদ, জাহাজঘাটা, দমদম, গোড়ার মসজিদ, পীরপুকুর মসজিদ, শুকুর মল্লিক মসজিদ, নুনগোলা মসজিদ, খড়ের দিঘি কবরস্থান, পাঠাগার মসজিদ, গাজী কালু চম্পাবতীর কবরস্থান ইত্যাদি। ১৯৯৩ সাল থেকে খনন করে এ পর্যন্ত ঐ নিদর্শনগুলো উদ্ধার করা হয়। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের দেওয়া নাম ‘শহর মোহাম্মদাবাদ’। মনে করা হচ্ছে, এসব পঞ্চদশ শতাব্দীর কীর্তি। তবে ১৯৯৩ সালে জোড়বাংলা মসজিদ খননের সময় পাওয়া একটি শিলালিপিতে লেখা আছে—শাহ সুলতান মাহমুদ ইবনে পুসাইন ৮০০ হিজরি। বেশিরভাগ নিদর্শনের পাশে রয়েছে বড় বড় দিঘি।

বারোবাজারের সবচেয়ে বড় সাতগাছিয়া আদিনা মসজিদ। ৩৫ গম্বুজ বিশিষ্ট প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া এ মসজিদের ভেতরে এখনো দেখা যায় ৪৮টি পিলার। লাল ইটের তৈরি এই মসজিদ ২০০৭ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সংস্কার করে। জনশ্রুতি আছে, সুলতানি আমলে নির্মিত এই মসজিদে সমৃদ্ধ একটি পাঠাগার ছিল। মসজিদের পাশেই বড় একটি দিঘি, নাম ‘পিঠেগড়া পুকুর’।

বারোবাজার বেলাট দৌলতপুরের কারুকাজ খচিত বর্গাকৃতির মসজিদটি চার গম্বুজ বিশিষ্ট। মূল ভবনের সঙ্গে চার কোণে আট কোণ বিশিষ্ট স্তম্ভ এবং বারান্দার সঙ্গে আরো দুটি স্তম্ভ আছে। মসজিদটির মেহরাব ও দেয়াল বিভিন্ন নকশা সজ্জিত। ভেতরে চার দেয়ালের সঙ্গে সংযুক্ত আটটি ইটের তৈরি কেবলা দেয়ালেও মেহরাব পোড়ামাটির নকশা, শিকল নকশা, বৃক্ষপত্রের নকশা, পুষ্পশোভিত পোড়ামাটির নকশা খচিত। মসজিদের পূর্ব পাশে আছে বিশাল দিঘি।

বারোবাজার তাহেরপুর রাস্তার বামপাশে জোড়বাংলা মসজিদ। শোনা যায়, মসজিদের কাছাকাছি জোড়া কুঁড়েঘর ছিল। এ কারণেই হয়তো মসজিদটির নাম জোড়বাংলা হয়ে থাকবে। ধারণা করা হয়, এক গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদটি সুলতান গিয়াসউদ্দীন মাহমুদ শাহের শাসনামলে নির্মিত। মসজিদের পূর্ব পাশে তিনটি সূচালো খিলানযুক্ত প্রবেশপথ আছে। মসজিদের চার কোণে আছে আট কোণ বিশিষ্ট কারুকাজ খচিত চারটি টাওয়ার।

বারোবাজার হাসিলবাগের নুনগোলা মসজিদটিও বর্গাকৃতির। এর তিনটি অর্ধবৃত্তাকৃতির মেহরাব আছে। মেহরাবে ছোট ছোট বর্গাকৃতির মধ্যে বিভিন্ন জ্যামিতিক নকশা আছে। মসজিদের বাইরের দেয়ালে দেখা যায় পর্যায়ক্রমিক খাড়া চাল ও খাঁজ। এগুলোতে দিগন্ত রেখাকৃতির ছাঁচে গড়া নকশা ও বাঁধন আছে। মসজিদটি এক গম্বুজ বিশিষ্ট।

বারোবাজার তাহেরপুর রাস্তার উত্তর পাশের গলাকাটা মসজিদ সুলতানী আমলের অনিন্দ্যসুন্দর এক স্থাপত্যশিল্প। গোলাকার ঢিবির ওপর স্থাপিত মসজিদের ভেতরে কেবলা দেয়ালে তিনটি অর্ধবৃত্তাকার সুসজ্জিত মেহরাব আছে। মেহরাবের দুপাশে পোড়ামাটির দিগন্ত রেখাকৃতির বাঁধন, বিভিন্ন রকম জ্যামিতিক ও ফুলের নকশা করা। এছাড়া মসজিদের দেয়াল ও ছাদ জুড়ে আছে পোড়ামাটির ঘণ্টা ও চেইন নকশা। মসজিদের সঙ্গেই বৃহদাকার দিঘি।

শুকুর মল্লিক মসজিদ বর্গাকৃতির এক গম্বুজ বিশিষ্ট। দেখতে অনেকটা ঢাকার বিনত বিবির মসজিদের মতো। মসজিদের উভয় পাশে একটি করে বন্ধ মেহরাবসহ পশ্চিম পাশে অর্ধবৃত্তাকৃতির মেহরাব আছে। মেহরাবগুলোতে আছে পোড়ামাটির ঘণ্টা ও চেইন নকশা।