বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আত্মীকরণের সম্ভাবনাকে নাকচ করে দিয়ে পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেছেন, ‘বাংলাদেশ সরকারের এ ধরণের কোন পরিকল্পনা নেই।’ সোমবার (২৪ আগস্ট) নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পিস স্টাডিজ (সিপিএস) আয়োজিত ‘রোহিঙ্গা সমস্যা: পশ্চিমা, এশীয় ও দ্বিপক্ষীয় প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারে প্যানেল আলোচক হিসেবে এ মন্তব্য করেন তিনি।
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আসে রোহিঙ্গারা। আর এর তিন বছর পূর্তি উপলক্ষে সিপিএস এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
রোহিঙ্গাদের জন্য বিপুল অর্থ বিনিয়োগে বাংলাদেশ আগ্রহী নয় উল্লেখ করে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ‘ বিনিয়োগ করলে রোহিঙ্গারা দলে দলে আবার বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে উৎসাহিত হবে। তবে রাখাইনে প্রত্যাবাসনের পরে রোহিঙ্গারা যেন জীবন জীবিকা অর্জন করতে পারে সে জন্য ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত মিয়ানমারের কারিকুলামে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছে বাংলাদেশ।’
অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র সচিব ছাড়াও মালয়েশিয়ার সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী সৈয়দ হামিদ আলবার, সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র ফেলো মোহাম্মাদ শহীদুল হক, মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার ও কানাডার হাইকমিশনার বেনোয়া প্রিফন্টেইনসহ অন্যান্যরা বক্তব্য রাখেন। এসময় কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির থেকে কয়েকজন প্রতিনিধি অনুষ্ঠানে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করেন।
মালয়েশিয়ার সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী সৈয়দ হামিদ আলবার বলেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যা শুধু মানবিক সমস্যা বরং এটি বৈশ্বিক ও রাজনৈতিক সমস্যা।’
রোহিঙ্গা সমস্যার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার ওপর পড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আসিয়ানের কয়েকটি সদস্য দেশ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনলেও ওই সংস্থার এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো নীতি নেই। মিয়ানমার আসিয়ানের সদস্য। কিন্তু রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আসিয়ান কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিতে পারেনি। কারণ আসিয়ানের সনদে সদস্য দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলানোর নীতি রয়েছে।’
রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে অচলাবস্থা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই জানিয়ে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র ফেলো মোহাম্মাদ শহীদুল হক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সেফ জোন প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব পুনরায় জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে হবে।’
শান্তি প্রতিষ্ঠার কোনো ইচ্ছা ছাড়াই শান্তি আলোচনায় মিয়ানমার অংশগ্রহণ করছে জানিয়ে উল্লেখ করে শহীদুল হক বলেন, ‘রোহিঙ্গারা মিয়ানমার জান্তাকে বিশ্বাস করেনা এবং এই সমস্যা সমাধানের কোনো চেষ্টা মিয়ানমার কখনো করেনি।’
দায়বদ্ধতা ও ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করা সম্ভব এবং এ জন্য দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার অধীনে ‘হাইব্রিড কূটনীতি’ অব্যাহত রাখতে হবে বলে তিনি জানান।
যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে যাতে করে সেখানে সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত না হয়।’
কানাডার রাষ্ট্রদূত বেনোয়া প্রিফন্টেইন দায়বদ্ধতার ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এ বিষয়ে আরও জোরালো ভূমিকা রাখা উচিৎ।’
আরও পড়ুন: রংপুর ও গাইবান্ধায় পৃথক অভিযানে আল্লাহর দলের ২ সদস্য গ্রেফতার
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘রোহিঙ্গা একটি জটিল সমস্যা এবং এটি সমাধানে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বক্তার অংশগ্রহণ ও বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে ভাইস চ্যান্সেলর বলেন, ‘আমি আশা করবো নীতিনির্ধারকরা এই অনুষ্ঠান থেকে ইতিবাচক কিছু উপাদান পাবে।’
সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অফ পিস এন্ড গভর্নেন্সের পরিচালক অধ্যাপক শেখ তৌফিক এম হক বলেন, ‘নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় রোহিঙ্গা বিষয়ে প্রকাশনাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে এবং এই অনুষ্ঠানটি সেটির একটি অংশ।’ সামনের দিনগুলিতে এ ধরনের আরও অনুষ্ঠান হবে বলে তিনি জানান।
সিপিএসের সহকারী অধ্যাপক ড. ইসরাত জাকিয়া সুলতানার সঞ্চালনায় আলোচনায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পিস স্টাডিজের সমন্বয়ক ড. এম জসিম উদ্দিন ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বক্তব্য রাখেন।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ এর ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে আট লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। বর্তমানে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। তবে এই সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমার চুক্তি স্বাক্ষর করলেও মিয়ানমারের অনাগ্রহের কারণে এই চুক্তি বাস্তবায়িত হয়নি।
ইত্তেফাক/এএএম
