ইহাই আধাসামন্ত সমাজের চিত্র

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২০, ২১:২১

দেশের গণমাধ্যমে একটি হূদয়বিদারক ছবির সঙ্গে সংবাদ প্রকাশিত হইয়াছে। সংবাদে বলা হইয়াছে, কক্সবাজারের চকরিয়ায় গরু চুরির অপরাধে বয়স্ক মা ও তরুণী দুই মেয়েকে মোটা রশিতে বাঁধিয়া নির্যাতন করা হইয়াছে। পরে কোমরে রশি বাঁধা অবস্থাতেই প্রকাশ্যে সড়ক দিয়া হাঁটাইয়া স্থানীয় চেয়ারম্যানের অফিসে লইয়া যাওয়া হয়। অতঃপর চেয়ারম্যানও তাহাদের প্রহার করেন বলিয়া অভিযোগ উঠিয়াছে। শুধু চেয়ারম্যান নহেন, পত্রিকান্তরে প্রকাশিত হইয়াছে, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতিও এই নির্যাতনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত।

ইহা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নহে। এই ধরনের আইন হাতে তুলিয়া লওয়ার প্রবণতা দীর্ঘকালের। আমাদের এই দেশ চলিতেছে আধাসামন্তবাদী সমাজব্যবস্থায়। ফলে যাহারা এই দেশের জনপ্রতিনিধি হন, বিশেষ করিয়া নিম্নস্তরে নিরীহ ও অসচেতন জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেন, তাহারা নিজেদের রাজা-বাদশা বলিয়া মনে করেন; রাজা বাদশার মতো আচরণ করেন। ঐ স্থানীয় চেয়ারম্যান ও তাহার সহযোগীদের কাছে কে জানিতে চাহিবে যে দেশের অন্য নাগরিক যাহাদের বিরুদ্ধে একটি মামলা রুজু করা হইবে, তাহাদের বিচার করিবার তুমি কে হে বাহে! অর্থাত্ যাহার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা লওয়া হইতেছে, তাহাকে শাস্তি দিতে আইন হাতে তুলিয়া লওয়া কেন? ইহাই কি মানুষের ভবিতব্য যে হাজতে যাইবার পূর্বে স্থানীয় প্রতিনিধির ‘ডলা’ খাইয়া যাইতে হইবে? পুলিশ রেজুলেশনস, বেঙ্গল বা পিআরবির বিধিতে পরিষ্কার উল্লেখ রহিয়াছে {৩৩০ (ক)} ‘কোনোক্রমেই একজন নারীকে হাতে হাতকড়া পরানো যাইবে না।’ যেই দেশে এই ধরনের বিধি রহিয়াছে নারীর প্রতি বিশেষ বিবেচনায়, সেই দেশের একজন জনপ্রতিনিধি কী করিয়া কোমরে দড়ি বাঁধিয়া বৃদ্ধ মা ও যুবতি মেয়েদের নির্যাতন করিতে পারেন? পুলিশ তাহাদের আহত অবস্থায় উদ্ধার করিয়া হাসপাতালে লইয়া চিকিত্সা দিয়াছে। এই ক্ষেত্রে বাস্তবতা হইল, যাহারা আইন হাতে তুলিয়া লইয়াছে, তাহাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো ব্যবস্থা লইতে পারে নাই। পুলিশ ‘সমাজসেবা’র দায়িত্ব পালন করিয়াছে। তাহার কারণ এই সকল ব্যক্তি ক্ষমতার পতাকা টাঙাইয়া তাহাদের ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করিয়া থাকে। যাহার ফলে সমাজে সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতা উত্সাহিত হইয়া থাকে। 

আমরা জানি, এই অবস্থা থাকিবে না। মানুষ সচেতন হইবে। দেশে শিক্ষায় উন্নতি আসিবে, প্রচলিত আইনকানুন সম্পর্কে জ্ঞান রাখিবে। কিন্তু সামন্ততন্ত্রের বিষমুক্ত হইতে সময় প্রয়োজন হইতেছে। আর সমাজের এই ক্ষত দ্রুত দূর করিতে হইলে নীতিনির্ধারকদেরও উপর্যুক্ত ভূমিকা রাখিতে হইবে। আমরা মনে করি, যাহাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উঠিয়াছে তাহাদের জবাবদিহিতার অধীনে আনা জরুরি। তাহা না হইলে এই ধরনের অপরাধ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলিতেই থাকিবে।