দু:খের শেষ নেই কয়রার মানুষের

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২০, ১০:১৯

‘সাড়ে তিন বিঘে জমি, তিন লাখ টাকা দিয়ে রাখিলাম, রাখার পর কল পুতিছি, দুই পাশে রাস্তা দিছি। ছয় ঘেরের জাল আনিছি, ত্রিশ খান আটক। পাতাপুতি দিয়ে কেবল জমিতি ঘর উলিছি, ওমনি জমি চলে গেল ভাঙ্গনে। নিজির ঘর নেই, স্বামী নেই। এখন ওয়াপদার উপর বাসা বান্দে রইছি। পরের জায়গায় বাস করতিছি। এখন নেই কোনো আশ্রয়। এই ভাঙ্গনে সব কিছু গেল। আর আমাদের উপায় কিছু নেই । এই রাস্তা যদি ভালো হয়, তাহলি থাকলাম ওয়াপদার কানায়; তা না হলি কোন জায়গায় ভাসে যাতি হবে তা জানিনে। চার মায়ে আর এক ছাওয়াল রাখে স্বামী মরে গেছে ১৮ বছর আগে। ছাওয়ালডাও অসুস্থ। এখন আমি ছাওয়াল-মাইয়ে নিয়ে কী করব তাই ভাবতিছি। বেড়িবাঁধের ভাঙ্গনে বাড়িঘর হারানো কয়রা উপজেলার দুই নম্বর কয়রা গ্রামের বিধবা এক নারী এভাবেই তার কষ্টের চিত্র তুলে ধরেন।

উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের হাজতখালি-কাশির হাটখোলার বেড়িবাঁধের উপর কুঁড়েঘরে বসবাসরত মনোরঞ্জন সরকারের স্ত্রী সুচিত্রা সরকার (৪৫) হতাশার সুরে বলেন, ‘বসবাসের ঘরবাড়ি নেই। বড় কষ্টে ওয়াপদার উপর কুঁড়েঘর বেঁধে আছি। তিন বেলা দু’মুঠো খাবার জোটে না। এক সাঁঝ (বেলা) খেলে দুই সাঁঝ না খেয়ে থাকি। কুঁড়ে ঘরে পানি পড়ে। রান্না করা খুব কষ্ট। ঝড়-বাতাস, বর্ষায় চুলায় পানি পড়ে। ত্রাণসামগ্রী সব ভাঙনের দুই পাশে দেয়। যাদের প্রয়োজন নেই তারাই ত্রাণ পাচ্ছে; আমাদের নিয়ে চিয়ারম্যান-মেম্বর গে কোনো চিন্তা-ভাবনা নেই। তারা আমাদের কোনো খোঁজ-খবর নেয় না।’

সুপার সাইক্লোন আম্ফানের পর দীর্ঘ তিন মাসে কেটে গেলেও এখনো ঘরে ফিরতে পারেনি সুচিত্রা সরকারের পরিবার। তাদের মতো বেড়িবাঁধের ওপর কুঁড়েঘর বেঁধে মানবেতর জীবনযাপন করছে আরো ১৮০টি পরিবার। এর সঙ্গে প্রায় প্রতিদিন যোগ হচ্ছে নতুন নতুন আরো মানুষ। অনিশ্চিত জীবনযাপনের মধ্যে থাকা এই হতদরিদ্র মানুষেরা জানে না তারা কবে ফিরবে পারবেন তাদের বসত-বাড়িতে।

গত ২২ আগস্ট সরেজমিন উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের হাজতখালী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ঘরবাড়ি লবণ পানিতে তলিয়ে আছে। সেই পানিতে তলিয়ে থাকা ঘরবাড়ির মধ্যেই ওই গ্রামের মজিদ মোল্লা খাট দিয়ে মাচা করে পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবযাপন করছেন। ভাঙ্গা ঘরবাড়ি। কোনো আয়-রোজগার নেই তার। সংসার চালানো খুবই কঠিন। যাতায়াতের কোনো রাস্তা নেই। একটু পর ট্রলার থেকে গলা সমান পানিতে নেমে বড় কষ্টে মজিদ মোল্লা তার বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলেন।

শুধু সুচিত্রা সরকার, মজিদ মোল্লায় নয়, একই রকমভাবে তাদের কষ্টের কথা জানান, বেড়িবাঁধের ওপর কুঁড়েঘর ও আশপাশে ডুবে যাওয়া বাড়িঘরে পানির মধ্যে ইট দিয়ে খাট উঁচু করে বসবাসরত হাজতখালি গ্রামের অমূল্য বরকন্দাজের স্ত্রী গোলাপী বরকন্দাজ, আবু সাইদ সানার স্ত্রী তহমিনা বেগম, জামাত সানা, চারু সরকারের স্ত্রী যশোমতি সরকার, আজগর গাজীর স্ত্রী করিমন্নেছা, ভরত মণ্ডল, হরেন সরকারের স্ত্রী প্রকৃতি সরকার, নিমাই সরকারের স্ত্রী কবিতা সরকারসহ আরও অনেকে। তাদের দাবি, ত্রাণ নয়, সরকার আমাদের মজবুত  (টেকসই) বাঁধ নির্মাণ করে দিলেই আমরা বেঁচে যাই।

তারা জানান, গত ২০ মে প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় আম্ফান আঘাত হানলে কয়রা উপজেলার চারটি ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে লোনা পানি প্রবেশ করে। জনপ্রতিনিধিদের চেষ্টায় ও এলাকাবাসীর স্বেচ্ছাশ্রমে তিনটি ইউনিয়নের বেড়িবাঁধে রিং বাঁধ দিয়ে আটকানো সম্ভব হলেও উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের হাজতখালি বেড়িবাঁধের ভাঙন আটকানো সম্ভব হয়নি। সেই থেকে ঘরবাড়ি হারিয়ে অতিকষ্টে বেড়িবাঁধের ওপর বসবাস করছে মানুষ। এখন তাদের আয়ের কোনো সুযোগ নেই। নেই খাবার জন্য নিরাপদ সুপেয় পানি। ছোটো ছোটো কুঁড়ে ঘরে অতিকষ্টে তাদের দিন কাটছে। এলাকার যে ঘরগুলো এখনো দাঁড়িয়ে আছে সেখানে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি।  তার ওপর গত কয়েক দিনের বৈরী আবহাওয়ার কারণে কপোতাক্ষ নদের পানির প্রবল চাপে গত ২০ আগস্ট সকালের জোয়ারে কয়রা সদর ইউনিয়নের দুই নম্বর কয়রা, হরিণখোলা ও ঘাটাখালী বেড়িবাঁধের রিংবাঁধ ভেঙে লোকালয় লোনা পানিতে তলিয়ে যায়। এলাকাবাসীর আশঙ্কা শিগগির রিংবাঁধ সম্পন্ন করা না হলে কয়রা উপজেলা পরিষদসহ গোটা কয়রা উপজেলা লবণ পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। তারা বলেন, আমাদের ত্রাণের দরকার নেই।

স্থানীয়রা জানান, বর্তমানে কয়রা উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দুটি পোল্ডারে কমপক্ষে ২১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এরমধ্যে মহারাজপুর ইউনিয়নের লোকা, পুর্ব মঠবাড়ি, দশালিয়া, কয়রা সদর ইউনিয়নের গোবরা, গুড়িয়াবাড়ি স্লুইসগেট গেট এলাকা, মদিনাবাদ লঞ্চঘাট, মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের বানিয়াখালি, হড্ডা খেয়াঘাট এলাকা, তেঁতুলতলারচর ট্রলার ঘাট এলাকা, উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের গাতিরঘেরি, কাশিরহাট ও গাববুনিয়া এলাকা এবং দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের চরামুখা, মাটিয়াভাঙ্গা, জোড়শিং ও ছোট আংটিহারা এলাকা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। 
কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি ইউপি চেয়ারম্যান জিএম শামছুর রহমান বলেন, এ মুহূর্তে নদীতে জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের কয়েকটি স্থানের ঝুঁকিপুর্ণ বেড়িবাঁধ ছাপিয়ে পানি প্রবেশ করার উপক্রম হয়েছে।

মহারাজপুর ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল মামুন লাভলু বলেন, লোকা বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে দির্ঘদিন পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে এলাকার মানুষ। রিংবাঁধ দিয়ে পানি আটকানো হলেও সংশয় রয়েছে।  এছাড়া পুর্ব মঠবাড়ি এলাকার পবনা ক্লোজারের উত্তর পাশের বাঁধে ব্যাপক ধ্বস নেমেছে।

এ ব্যাপারে পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মশিউল আবেদীন বলেন, চলতি অর্থ বছরে কয়রা উপজেলার দুটি পোল্ডারের কয়েক কিলোমিটার বাঁধ মেরামতে মাটির কাজ করা হয়েছে। নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক স্থানের বাঁধে নতুন করে ধ্বস নেমেছে। যে ২১ কিলোমিটার বাঁধ ঝুকিপুর্ণ হিসেবে ধরা হয়েছে সেখানে  জরুরিভাবে সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, কয়রা উপজেলার মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে পাউবোর ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ। এখান প্রয়োজন জরুরিভিত্তিতে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ। টেকসই বেড়িবাঁধ  নির্মাণ হলে কয়রার মানুষের আর জমিঘর প্লাবিত হবে না। লবণ পানিতে ফসলেরও কোনো ক্ষতি হবে না।

 

ইত্তেফাক