মাদকের বলি দুই শিশু!

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:১১

রাজধানীর ডেমরায় দুই শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে চিকিত্সকরা নিশ্চিত হয়েছেন। তবে মৃত্যুর আগে তারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে কিনা সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত নন ময়নাতদন্তকারী চিকিত্সকরা। কী কারণে, কে বা কারা শিশু দুটিকে হত্যা করলো-সে ব্যাপারেও নিহতদের পরিবার বা পুলিশ স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারছে না। পুলিশ বলছে, সোমবার রাতে গোলাম মোস্তফা নামের যে প্রতিবেশীর ফ্ল্যাট থেকে তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়, সেই যুবক ‘মাদকাসক্ত’ ছিলেন। তাদের ধারনা, মূলত সেখানেই ‘মাদকাসক্ত’ ব্যক্তিদের যৌন বিকৃতির শিকার হয়েছিল শিশু নুসরাত জাহান (৪) ও ফারিয়া আক্তার দোলা (৫)। পরে কান্নাকাটির এক পর্যায়ে তাদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এদিকে ঘটনার পর থেকে মোস্তফা পলাতক রয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। রাত ৯ টার দিকে নুসরাতের বাবা পলাশ হাওলাদার বাদী হয়ে ডেমরা থানায় এ ঘটনায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় গোলাম মোস্তফা ও তার বন্ধু আজিজুল বাওয়ানীকে আসামি করা হয়েছে। মামলার এজহারে বলা হয়েছে, মোস্তফা ও আজিজুল পরিকল্পিতভাবে নুসরাত ও ফারিয়াকে নির্যাতনের পর হত্যা করেছে।

এর আগে গতকাল দুপুরে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে শিশু দুটির ময়নাতদন্ত করা হয়। হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ সূত্র জানায়, দুজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে সে বিষয়টি নিশ্চিত। তবে হত্যার পূর্বে তারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে কিনা সেটা নিশ্চিত হতে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ ব্যাপারে হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক নওশাদ মাহমুদ বলেন, দুই শিশুর শরীরে বেশ কয়েকটি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারনা করা হচ্ছে শ্বাসরোধ করে তাদের হত্যা করা হয়েছে। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুতের আগে মৃত্যুর নিশ্চিত কারণ বলা যাবে না। তিনি আরো বলেন, মৃত্যুর আগে ধর্ষণ হয়েছে কিনা সে বিষয়েও এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না।

পুলিশের তৈরি সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহত শিশু নুসরাত জাহানের কপালে অর্থাত্ বাম চোখের ওপরে চাপলাগা কালচে দাগ রয়েছে। নাকের ওপরেও কালচে দাগ রয়েছে। তবে তার কান ও বিশেষ অঙ্গ স্বাভাবিক রয়েছে। নিহত শিশু ফারিয়া আক্তার দোলা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, তার গলার ডানপাশের সামনের দিকে কালচে দাগ রয়েছে। তার বিশেষ অঙ্গ, নাক ও কান স্বাভাবিক রয়েছে।

এলাকাবাসী ও নিহত দুই শিশুর পরিবার এবং পুলিশের সঙ্গে কথা বলে এ হত্যার কারণ সম্পর্কে কোন ধারনা পাওয়া যায়নি। তবে দুই শিশুর পরিবার বলছে, তাদের সঙ্গে মোস্তফার কোন ধরনের বিরোধ নেই। মোস্তফা আগে রাজমিস্ত্রীর কাজ করতেন। বর্তমানে একটি পোষাক কারখানায় কাজ করেন। মোস্তফা মাদকাসক্ত বলে তার স্ত্রী ও শ্যালক পুলিশকে জানিয়েছেন। এলাকায়ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোস্তফা মাদক গ্রহণ করতেন।

নিহত ফারিয়ার মা পারভিন বেগম বলেন, তিনি আদমজীতে গার্মেন্টসে কাজ করেন। ফারিয়ার বাবা ফরিদুল ইসলাম ফতুল্লার টিন কারখানায় কাজ করেন। তারা প্রতিদিন সকালে কাজে চলে যান। দিনভর নানীর কাছে থাকতো মেয়ে। তাদের সঙ্গে মোস্তফার কোন সর্ম্পক বা বিরোধ কিছুই নেই।

নুসরাতের বাবা পলাশ মিয়া কাঁচামালের আড়তে কাজ করেন। মা ফাহিমা আক্তার গৃহিণী। পলাশ মিয়া বলেন, সোমবার দুপুরের দিকে মেয়েকে গোসল করিয়ে নিজে গোসল করতে যান। তার কিছুক্ষণ আগেই পাশের বাসার ফারিয়া তাদের বাসায় আসে। এরপর দুইজনেই বেরিয়ে যায়। পরে খাবারের সময় মেয়েকে না পেয়ে তারা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। নুসরাতের মা ফাহিমা বলেন, নুসরাত তাদের একমাত্র সন্তান। তাকে নিয়ে তাদের অনেক স্বপ্ন ছিল। এবারই প্রথম স্কুলে ভর্তি করেছিলেন মেয়েকে। সোমবারই প্রথম স্কুুলে যায় নুসরাত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মোস্তফার একজন প্রতিবেশী বলেন, শিশু দুটিকে খোঁজার সময় তিনি মোস্তফাকে বাসার গেটের সামনে সিগারেট খেতে দেখেছেন। তিনি ধারনা করছেন, এর আগেই সে ফারিয়া ও নুসরাতকে হত্যা করে। মোস্তফা মাদকাসক্ত বলে এলাকায় জনশ্রুতি রয়েছে।

ডেমরা থানার ওসি সিদ্দিকুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, হত্যাকাণ্ডের মূল সন্দেহভাজন মোস্তফার স্ত্রী ও শ্যালককে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় আনা হয়েছে। আটককৃতদের কাছ থেকে মোস্তফার ব্যাপারে তথ্য নেয়া হচ্ছে। তাকে শিগগিরই গ্রেফতার করা হবে। মৃত্যুর কারণ কী হতে পারে জানতে চাইলে ওসি বলেন, এ হত্যাকান্ডের সঠিক কারণ জানা যায়নি। নিহত দুই পরিবারের সঙ্গে কথা বলে কোন বিরোধের তথ্যও পাওয়া যায়নি। তবে ধারনা করা হচ্ছে মোস্তফা কিংবা তার বন্ধুদের মাধ্যমে ওই দুই শিশু যৌন বিকৃতির শিকার হয়েছে। শিশু দুটি কান্নাকাটি করলে দুর্বৃত্তরা তাদের হত্যা করে।

ডেমরা থানার পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) নূরে আলম বলেন, মোস্তফার স্ত্রীর কাছ থেকে জানা গেছে মোস্তফা মাদকাসক্ত ছিলেন। তাকে পাওয়া গেলেই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য জানা যাবে।

উল্লেখ্য, রাজধানীর ডেমরার কোনাপাড়ার হযরত শাহ জালাল রোডে কাছাকাছি দুটি বাসায় বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতো শিশু নুসরাত ও ফারিয়া। শিশু দুটি গত সোমবার দুপুর থেকে নিখোঁজ ছিল। খোঁজাখুঁজি করে তাদেরকে না পেয়ে দুই পরিবার এলাকায় মাইকিং করে। সন্ধ্যায় এলাকার এক যুবক তাদের জানায়, দুপুরের পর তাদের প্রতিবেশী মোস্তফা শিশু দুটিকে ডেকে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে যান। ওই যুবকের কাছে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মোস্তফার ফ্ল্যাটে গিয়ে শিশু দুটির লাশ পাওয়া যায়।

বিক্ষোভ:এদিকে শিশু দুটির হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে গতকাল সকালে কোনাপাড়া বাসষ্ট্যান্ডে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। মানববন্ধনে বিভিন্ন-স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা ছাড়াও সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।