ভেজাল ‘হাজারী গুড়ে’ সয়লাব বাজার

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:১৮

শহিদুল ইসলাম সুজন, মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি

লোকজ সংগীত আর হাজারী গুড় মানিকগঞ্জ জেলার ব্যান্ডিং হলেও ভেজালের ভীড়ে হারিয়ে যাচ্ছে জেলার হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা এলাকার বিখ্যাত এই হাজারী গুড়। ‘ঝিটকার হাজারী ও পাটালী গুড়’ বাংলার শেষ সুবেদার নবাব সিরাজউদ্দৌল্লা’র আমল থেকেই অন্যতম লোকায়ত খাদ্য হিসেবে সুনাম বহন করে আসছে। তখনকার সময় এই হাজারী গুড়ের সুনাম ছিল ভুবনজোড়া। জনশ্রুতি আছে, এক সময় ঢাকার বিখ্যাত নবাব পরিবারের সদস্যরা ‘হাজারী গুড়’ ব্যতীত অন্য গুড় দিয়ে ফিরনি পায়েস বা ক্ষীর রান্না করলে সেটি মুখেই দিতেন না। ‘হাজারী গুড়’ ছিল নবাবদের খাদ্য তালিকার অন্যতম পছন্দের উপাদান। শীতকালে নবাব পরিবারের গৃহীণিরা এই গুড়ের জন্য অপেক্ষা করতেন। এখনো এই গুড়ের কদর দেশ বিদেশে রয়েছে। তবে আগের সেই স্বাদ ও ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে কলের আবর্তে।

আমরা বিখ্যাত মধুময় এই গুড়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে কথা বলছি; কিন্তু বাস্তবে নতুন প্রজন্মের মাঝে গল্প ছাড়া তেমন কিছু দেখানোর নেই। হারিয়ে যাচ্ছে খেঁজুর গাছ, গাছ কাটার গাছি, গুড় তৈরির প্রাকৃতিক উত্স। এগুলোর পেছনে রয়েছে নানাবিধ কারণ। যেমন- জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে খেঁজুর গাছ নতুন করে বেড়ে উঠছে না এবং পুরাতন গাছগুলো হঠাত্ করে মারা যাচ্ছে। পাশাপাশি ইটের ভাটার উত্তম জ্বালানি হিসেবে খেঁজুর গাছ প্রচলিত বলে সারাদেশে আশংকাজনক হারে খেঁজুর গাছের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। যে সকল স্বল্প সংখ্যক খেঁজুর গাছ আছে সেগুলোও রক্ষণাবেক্ষণ ও গাছ কাটার কারিগর নেই এবং নতুন করে কেউ খেঁজুর গাছ কাটা শিখছে না।

এলাকার  বিখ্যাত গাছির মধ্যে ঝিটকার আরশাদ আলী বলেন, ‘খেঁজুর গাছ কাটা অনেক পরিশ্রমের কাজ। আগে আমি একাই ১৬০-১৭০টি গাছ কাটতাম। সেগুলোতে হাড়ি বাঁধতাম, রস করে গুড় তৈরি করে বাজারে বিক্রি করতাম ৬০-৭০ টাকা কেজি দরে। অনেক লাভ হতো। সংসার ভালোই চলতো।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন ৩০০-৩৫০ কেজি দরে গুড় বিক্রি করেও লাভ হয় না। কারণ খেঁজুরের রস থেকে গুড় তৈরি করার জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো জ্বালানি।’ তিনি বলেন, ‘গুড় তৈরি করার জন্য প্রচুর জ্বালানি খরচ হয়। আর সব জ্বালানি দিয়ে খেঁজুরের গুড় হয় না। গুড় তৈরির জন্য সবচেয়ে ভালো জ্বালানি হলো ধান ক্ষেতের নাড়া, খেসারি, মুসুড়ি, সরিষার ডাটা। আর এগুলো বর্তমানে তেমন চাষাবাদ করা হয় না। প্রকৃত কৃষক কৃষিকাজ ছেড়ে দিয়েছেন এবং যারা জমি ভাড়া নেন তারাও লাভজনক ফসল চাষ করে। যে কারণে আমি খেঁজুর গাছ কাটা বাদ দিয়েছি।’ তিনি জানান, গাছগুলো থেকে আগের মতো রস আসে না। বাজারে ভেজাল গুড়ে সয়লাব আসল নকল বোঝা মুশকিল। বাড়িতে ছেলে-মেয়েরা আর পছন্দ করে না যে তিনি গাছে উঠে গাছ কাটেন। কিন্তু তার এখনো নেশা। শীতকাল এলেই যেন খেঁজুর গাছে উঠতে চান।

ঝিটকার বিখ্যাত হাজারী পরিবারের সপ্তম পুরুষ মো. শামীম হাজারী বলেন, ‘আজ থেকে প্রায় তিনশত বছর আগে মানিকগঞ্জের হরিরামপুর থানার ঝিটকা গ্রামের ‘মহাম্মদ আলী’ নামে এক গুড় চাষী তার ফরমুলার মাধ্যমে খেঁজুরের রস থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে ভিন্ন স্বাদ, গন্ধ ও বর্ণের পাটালী গুড় উদ্ভাবন করেন। পরবর্তীতে তার নামানুসারে ঐ পাটালী গুড় ‘হাজারী গুড়’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই বিশেষ ধরনের গুড় আবিষ্কারের ফলে গুড়ের জন্য পরিবারের সুনাম মানিকগঞ্জ থেকে রাজদরবার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়লো। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল হতে ‘হাজারী গুড়’ তৈরির অর্ডার বা ফরমায়েশ আসতো ঝিটকার হাজারী বাড়িতে।’