আবাসন সমস্যায় প্রতিবন্ধী কর্মজীবী নারী

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:২০

এক নারী শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েও পড়তে পারেনি ক্লাস নিচ তলায় না হওয়ায়। পরে তিনি নীলক্ষেতে একটি সিএ ফার্মে ভর্তি হন। কিন্তু কোন নারী হোস্টেলে তার হুইলচেয়ার নিয়ে থাকার ব্যবস্থা খুঁজে পাননি তিনি। বাসাভাড়া করতে গেলে তাকে বাসা ভাড়া দেওয়া হয় না। অগত্যা নিজের গ্রামের বাড়ি গিয়ে মাস্টার্স শেষ করে চাকরির জন্য ঢাকায় আসেন। চাকরি হয় তার। কিন্তু আবার সেই আবাসন সমস্যা! কোথায় থাকবেন তিনি? বাসা ভাড়া নিতে গেলে পাওয়া যায় না। ভাল বাসা ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য তার চাকরির বেতন দিয়ে হয় না। তাই একসময় বাড়ি থেকে টাকা এনে তাকে বাসাভাড়া পরিশোধ করে থাকতে শুরু করেন ঢাকায়। এভাবেই নিজের বাসস্থানের কথা জানান উইমেন উইথ ডিসএবিলিটি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন নাহার মিষ্টি।

একই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারপার্সন শিরিন আক্তারও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। অফিসের কাছে হোস্টেল পাননি তিনি। বাসা ভাড়া পাননি। অতিরিক্ত ভাড়া আর বাড়ির মালিকের নানা অজুহাতে বেশি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে থাকছেন এক আত্মীয়ের বাড়িতে। মানবাধিকার কমিশনে কল সেন্টারে কাজ করেন রওনক জাহান ঊষা ও মিতা আক্তার। উষা ইডেন কলেজে পড়া থেকে আজ অবধি ঢাকায় থাকার জন্য লড়াই করে চলেছেন। চাকরি হওয়ার পরে মানবাধিকার কমিশন ও কিছু বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সহযোগিতায় জায়গা করে নেন মিরপুরে অবস্থিত সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মজীবী হোস্টেলে। এর আগে সরকারি মহিলা হোস্টেলসহ অনেক হোস্টেল আর বাড়ির মালিকদের কাছে হেনস্তা হওয়ার গল্প এত বড় যে তা দিয়ে অনায়াসে গোটা কয়েক উপন্যাস হবে। আর মিতা মনিপুরি পাড়ার অলিগলি হাতড়ে বেড়িয়েছেন একটুকরো থাকার জায়গার জন্য। কিন্তু কোথাও স্থান হয়নি তার। অবশেষে সরকারের বিশেষ মহলের সহযোগিতা চেয়ে একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন হোস্টেলে জায়গা হয় তার। কিন্তু হুইলচেয়ার নিয়ে নয়, প্রতিদিন তাকে হামাগুঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে আর নামতে হয় বহু কষ্ট সহ্য করে। এখানে নেই হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীর জন্য কোন ব্যবস্থা।

এমন বাস্তবতার মধ্যে উইমেন উইথ ডিসএবিলিটিজ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, ঢাকা শহরে একশ প্রতিবন্ধী নারী চাকরি করছেন। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশিও হতে পারে কারণ তারা তাদের নেটওয়ার্কের কর্মজীবীদের সম্পর্কেই জানেন। অথচ প্রতিবন্ধী কর্মজীবী নারীদের নেই বসবাসের প্রয়োজনীয় সুবিধা। আত্মীয়ের বাড়িতে থেকে কেউ কেউ পেশা চালিয়ে নিলেও অনেক রকমের সমস্যা হচ্ছে তাদের।

সরকারি ও বেসরকারি হোস্টেল :নীলখেত কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলের ১৯৭৯ সালে যাত্রা শুরু। মহিলা অধিদপ্তরের আওতায় নীলক্ষেতসহ লিখগাঁও ও মিরপুরে ৩টি কর্মজীবী হোস্টেলে বর্তমানে এক হাজারের মত কর্মজীবী থাকছে। জাতীয় মহিলা সংস্থার আওতায় আছে বেইলী রোডে ২০০ জন থাকার হোস্টেল।

মহিলা অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসচিব শাহনেওয়াজ দিলরুবা খান বলেন, এই হোস্টেলগুলোতে দুই একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী থাকলেও নেই কোন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী। কারণ নেই র্যাম্পসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা। উপসচিব জানান, গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য আশুলিয়াতে ৭৪৪ জনের একটি হোস্টেল আছে তাদের। নিলখেতে বসবাসকারী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শাম্মির কাছে প্রশ্ন করা হল এখানে করিডোরে কোন ব্লক ব্যবহার করা হয়নি তাতে তার কোন অসুবিধা হয় কিনা। তিনি জানান, কোন দিনই ছিল না, তাই সুবিধা কি তা সে জানেন না। আর সবার সাথে মিলে মিশে দিন চলে যাচ্ছে। মহিলা সংস্থার চেয়ারপারসন এডভোকেট মমতাজ বেগম জানান, তাদের হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য ব্যবস্থা করা হয়ে উঠেনি। তবে এখন তারা বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন। লালমাটিয়া ও মনিপুরি পড়ার মা, অপরাজিতা, নিবেদিকা এমন অনেক ব্যক্তি মালিকানাধীন কর্মজীবী ও ছাত্রী হোস্টেল ঘুরে কোথাও প্রতিবন্ধী কর্মজীবী বা শিক্ষার্থী থাকার ব্যবস্থা পাওয়া গেল না। একজন মালিক কাকলী গোমেজ জানান, প্রতিবন্ধীদের কথা ভেবে করা হয়নি তার হোস্টেল। লালমাটিয়া নিবেদিকা হোস্টেলের হোস্টেল সুপার লুবনাকে প্রশ্ন করলে উল্টো প্রশ্ন করেন, প্রতিবন্ধীরা এখানে থাকবে কিভাবে?

একটাই ভরসা :উইমেন উইথ ডিসএবিলিটি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন নাহার মিষ্টি বলেন, ঢাকা শহরে প্রতিবন্ধী কর্মজীবীদের থাকার ব্যবস্থার সরকারি বেসরকারি তেমন কোন উদ্যোগ নেই বলা চলে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমাজসেবা অধিদপ্তর-এর তত্ত্বাবধানে ২০১০ সালে মিরপুর-১৪ -এ কর্মজীবী প্রতিবন্ধী নারী ও পুরুষের জন্য একটি হোস্টেল উদ্বোধন করে। এই হোস্টেল সুপার রেজাউল কবির জানান, ইন্টারনেটসহ অনেক সুবিধা না থাকলেও এখানে ১৬ জন নারী ও ১৬ জন পুরুষের থাকার ব্যবস্থা আছে।