ঘরে তৈরি মাস্ক

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২০, ২১:০৫

—এই কী করিস?

—কিছু না!

—হাত সরা! দেখি কী করছিস খাতায়?

মেঝেতে উবু হয়ে বসে ছিল প্রত্যয়। খাতায় আঁকছিল। বাবা বকা দেবেন—এই ভেবে সে দিল দৌড়। বাবাও ওর পিছু নিলেন। রান্নাঘরে গিয়ে মাকে খাতাটা দেখিয়ে অনুযোগের সুরে বলে—

—বাবা খালি বকা দেয়! শুধু বলে অঙ্ক করো। ইংরেজি পড়ো। এই বন্ধে বাংলা, ইংরেজি ভালোমতো পড়ে লিখো! আর অঙ্কগুলো অনুশীলন করো। আচ্ছা মা, তুমিই বলো, ড্রয়িং কি সাবজেক্ট না?

বাবা নিঃশব্দে পা টিপে টিপে রান্নাঘরে এসে দাঁড়ান। তর্জনী তাক করে চোখ গোল করে চুপ থাকার ইঙ্গিত দেন। আলুভাজার তপ্ত কড়াই থেকে চোখ সরিয়ে নেন মা! বাবার দুষ্টুমি দেখে হেসে দেন তিনি। তখনই প্রত্যয় বাবার দিকে মুখ ঘুরে দাঁড়ায়।

—দেখো দেখো! মা বলেছে ছবিটা ভালোমতো রং করতে!

বাবা দেখেন পুত্র তার দিনে দিনে দক্ষ হয়ে উঠছে অঙ্কনে। ছবিতে প্রত্যয় এঁকেছে ওর পরিবারের ছবি! মা, বোন, দিদন, বাবা ও সে। আবার ছবিতে সবারই মাস্ক পরা।

ছবির প্রশংসায় পঞ্চমুখ বাবা! বললেন, বড়ো হলে ইমারত কারিগর বা অঙ্কনশিল্পী যা-ই হও না কেন ভালোমতো তোমাকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করতে হবে বাবা। ছবিটা মেলে ধরে তাতে হাত বুলান বাবা। ছেলের কাছে প্রশ্ন—

—সকলকে মাস্ক পরিয়ে দিয়েছো কেন?

—এটা তো বাইরের দৃশ্য বাবা! তুমি জানো না ঘরের বাইরে গেলে সকলকেই মুখে মাস্ক পরতে হয়। সবাই মাস্ক পরলে করোনা জীবাণু চলে যায়!

সকালের খাবার টেবিলে নিয়ে এলেন মা। স্বামীর উদ্দেশে বললেন, ও আমার সঙ্গে বসে কাল রাতে টিভিতে খবর দেখেছে। চীনের পাশের দেশ ভিয়েতনাম ও তাইওয়ানে সবাই মাস্ক পরিধানের মাধ্যমে করোনাকে তাড়িয়েছে—সে খবর প্রত্যয়ও জেনেছে। ওটা জেনেই এই ছবি এঁকেছে বোধ হয়!

ক্রান্তিকালে অনলাইনে একাদশ শ্রেণির ক্লাস করে ক্লান্ত বোন প্রমিতি ড্রয়িংটা দেখে হতবাক! খাবার টেবিলে পরোটা সুজি মুখে দিতে দিতে বলল—

—কী অপূর্ব বাবা, দেখেছো! আবার প্রত্যেকের নামও দিয়েছে—মা, আমি, দিদন, তুমি ও সে! জার্মানির ইংরেজি একটি দৈনিকের সাংবাদিক বাবা মাথা নাড়েন।

—ভারি সুন্দর এঁকেছে ও।

খাবার খেয়ে বাবা চলে গেলেন তার কক্ষে! ঘরে থেকেই পেশা ও পাঠ-নেশার কাজ সারছেন! ওষুধ ও বাজারের জন্য পিপিই পরে ঘরের বাইরে যান তিনি, তা-ও সপ্তাহে একদিন। ফিরে সোজা স্নানাগারে। প্রত্যয়দের পাশের বিল্ডিংটা করোনাক্রান্ত। রেডজোনে পড়েছে ওরা!

সিদ্ধেশ্বরী বয়েজ স্কুলের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে প্রত্যয়। করোনার কারণে স্কুল বন্ধ। স্কুল খুলেই পরীক্ষা! তাই বাসায় থাকার কারণে বাবা প্রত্যয়কে সিলেবাস অনুযায়ী অঙ্ক ও ইংরেজি পড়াতে চান! কিন্তু পড়তেই চায় না সে! পড়ার কথা বললে মুখটা কালো হয়ে যায় ওর! ল্যাপটপে অনলাইন ক্লাস নিয়ে ব্যস্ত দিদি। একই ঘরে মায়ের অ্যানড্রয়েড ফোন সেটে প্রত্যয় প্রায় সারাক্ষণ ফানি ভিডিও ও গেম দেখে।

ক’দিন ধরে বাবা তার হাতাকাটা গেঞ্জি খুঁজে পাচ্ছেন না! বেশ অস্বস্তি বোধ করছেন বাবা! স্নানে যাবেন। বাবার ব্যবহার্য জিনিস প্রায়সময় প্রত্যয়ও এলোমেলো করে রাখে। জিজ্ঞাসা করলে বলবে—আমি জানি না।

প্রত্যয়ের অঙ্কন ও কারিগরি বিদ্যার প্রতি বেশ ঝোঁক। ক’দিন আগে প্রত্যয় বাবাকে জিজ্ঞাসা করছিল সুতির কাপড় আছে কি না। গায়ের গেঞ্জির সন্ধানে সব তন্নতন্ন করে খুঁজে যখন ক্লান্ত,  তখন স্ত্রীকে ডাকছেন—

—মারিয়া, এই মারিয়া, কোথায় তুমি?

চিত্কার শুনে মা দৌড়ে এলেন! পাশের ঘর থেকে প্রত্যয়কে ডাকলেন! সবাই এল বাবার কক্ষে। মা প্রত্যয়ের কাছে জানতে চাইলেন—

—বাবার গেঞ্জি দেখেছো?

প্রত্যয় আঙুল দিয়ে দেখিয়ে সটকে পড়ল। বাবার ঘরে

ওয়ারড্রবের নিচের ড্রয়ারে একটা শপিংব্যাগে কতগুলো কাপড় মোড়ানো। মা একে একে বের করে আনেন পাঁচটা মাস্ক!

বাবার বুঝতে বাকি রইল না—এটা কার কাণ্ড!

—প্রত্যয়! এই, এদিকে আয়! দাঁড়া তোকে দেখাচ্ছি মজা। প্রমিতি ধরে নিয়ে আসে প্রত্যয়কে। দুরু দুরু বক্ষে এসে সে বলে—

—তুমিই তো বলেছো মাস্কের অনেক দাম। বাজারে নকল মাস্কের ছড়াছড়ি। তাই তোমার ধোয়া গেঞ্জিগুলো কেটে এসব বানিয়েছি।

দিদামণি মানে দিদনও ওর কাণ্ড দেখে হতচকিত। তিনি বললেন, এই বুদ্ধি কোথায় পেলি ভাই? প্রত্যয়ের সরাসরি উত্তর—

—আমি ইউটিউবে দেখেছি কীভাবে মাস্ক বানাতে হয়।

উচ্ছ্বসিত দিদন। —বাহ্! ভালো গৃহকাজ! ঘরে তৈরি মাস্ক।