আয়নার ওপাশে

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২০, ২১:০৯

রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে দরজার পিপহোল দিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকি। কাউকে দেখা যায় না। অথচ আল্লার কসম, একটু আগেও পায়ের আওয়াজ শুনেছি! নেসারিকে ডাকতে গিয়েও থেমে যাই। আমার কোনো কথা বিশ্বাস না করলে, ও ওষুধের ডোজ বাড়িয়ে দেয়। ওষুধ খেলে কেবল ঘুম পায়। নেসারিকে বলা যাবে না কিছু। বিয়ের আগে অবশ্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওর সাথে ফোনে প্রেম করতাম। তখন দুপুরের খাওয়া করল্লা ভাজি কি বেশি তিতা ছিল নাকি—এইসব খুঁটিনাটি গল্প করতেও ভালো লাগত। অথচ সবকিছু কেমন বদলে গেল! পা টিপে টিপে বেডরুমে আসি আমি। বিছানায় নেসারি ঘুমাচ্ছে। চিংড়ি মাছের মতো দলা পাকিয়ে। ড্রেসিং টেবিল থেকে চিরুনি নিই। মোটা দাঁতের চিরুনি। ওষুধ শুরু করার পর থেকে মাথা থেকে সব চুল পড়ে যাচ্ছে। চিকন দাঁতের চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াতে গেলে এত্তগুলো চুল উঠে আসে। আয়না না দেখে চুল আঁচড়াতে এখনো সমস্যা হয় আমার। প্রায় পাঁচ মাস হয়, আয়না দেখি না। ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটা একটা পুরনো লাল শাড়ি দিয়ে ঢেকে রেখেছি। চুল কেমন জট পাকিয়ে গিয়েছে! সুন্দর আর লম্বা চুলের জন্য বান্ধবীরা আমাকে একসময় ডিজনি প্রিন্সেস ‘রাপানজেল’ ডাকত। এখন আমার মাথার পেছনে খাবলা খাবলা চুল উঠে টাক হয়ে গিয়েছে। আগে ইউটিউবে বিভিন্ন মেকাপ টিউটোরিয়াল দেখে দেখে, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্র্যাকটিস করতাম। এখন আয়নার দিকে তাকাতে পারি না। ভয় লাগে।

গত শীতে ঘুমানোর আগে মুখে ময়েশ্চারাইজার লাগাচ্ছিলাম। আয়নাতে নিজেকে দেখছিলাম মনোযোগ দিয়ে। নাকের চামড়া কেমন ফাটা ফাটা লাগছিল! বারবার সেখানে লোশন দিচ্ছিলাম। হঠাত্ করে আয়নাতে এক জোড়া পা দেখি আমি। শুধু পা। ঝুলছে। ছাদের ফ্যান থেকে। চমকে পেছনে তাকাই। হাত থেকে ময়েশ্চারাইজারের কৌটা পড়ে যায়। কেউ নেই। সেদিন চোখের ভুল মনে করেছিলাম। দুই সপ্তাহ পরে আয়নাতে দাদিকে দেখি। দাদি মারা গিয়েছিলেন যখন, আমার বয়স তখন তেরো। মৃত্যুর পরেও দাদির মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি ঘুমিয়ে আছেন। কিন্তু আয়নাতে সেদিন দাদিকে দেখে ভয় পেয়েছিলাম। দাদির মুখের বাম পাশ পোকাতে খেয়েছে। ডান পাশের গালের চামড়া পচে গিয়েছে। চিত্কার করে নেসারিকে ডেকেছিলাম সেদিন। ও আমার কথা বিশ্বাস করেনি। কিন্তু এরপর থেকে ব্যাপারটা ঘন ঘন হতে থাকে। খুব ঘন ঘন! আয়নাতে একেক সময় একেকটা মানুষকে দেখি আমি। মনে হতে থাকে, ওপাশে একটা অন্য পৃথিবী আছে। সেখানে শুধু মরে যাওয়া মানুষেরা থাকে। একদিন আমার ধারণা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। সে রাতে আয়নাতে দেখি, একজন মানুষ হামাগুড়ি দিচ্ছে। পশুদের মতো। তার চামড়ায় কুমিরের শরীরের মতো খাঁজ। সে রাতে হাতুড়ি নিয়ে আয়নাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। কাচ ভাঙার শব্দ শুনে, নেসারি দৌড়ে এসেছিল। তখন কেন যেন মনে হয়েছিল, আয়নার লোকটা নেসারির পোষা শয়তান! তাই ওর দিকে হাতুড়ি নিয়ে ছুটে যাই আমি। তারপর হাত থেকে হাতুড়ি ফসকে পড়ে। মাথা ঘোরাতে থাকে। মেঝেতে পড়ে মাথা ঠুকে যায়। তারপরেই আমাকে হসপিটালাইজড করা হয়। বেশ কয়েকজন সাইকিয়াট্রিস্টের সাথে কথা বলতে হয়।

নেসারি ঘুমের মধ্যে কথা বলছে। অস্পষ্ট বিড়বিড়। বোঝা যায় না কিছু। আমার কথা কেউ বিশ্বাস করে না। কতবার সবাইকে বলেছি, প্রতিটি আয়নার ওপাশে তারা থাকে। মরে যাওয়া মানুষেরা। আমার ইচ্ছা করে, নেসারিকে মেরে ফেলতে। ও যখন নিজেকে আয়নার অন্য পাশে আবিষ্কার করবে, তখন নিশ্চয়ই বুঝবে যে, মরে গেলে সব মানুষ অন্য একটা জীবন শুরু করে। আয়নার এই পাশ থেকে ঐ পাশে যায়। অথবা আত্মহত্যা করে পাকাপাকিভাবে আমি আয়নার অন্য পাশে গিয়ে বাস করা শুরু করতে পারি। তখন নেসারি আমাকে আয়নায় দেখে বিশ্বাস করবে যে, আমি সত্যি কথাই বলেছিলাম ওকে। আয়না দেখতে ভয় লাগে। তবু আয়না দেখতে ইচ্ছা হয়। আমি যখন ক্লাস ফোরে পড়ি, আমাদের ক্লাসের একটা মেয়েকে রেপ করে মেরে ফেলেছিল স্কুলের দারোয়ান। আমার কেন যেন মনে হয়, আজকে আয়নার কাপড় সরালে আমি ঐ মেয়েটাকে দেখতে পাব। তিথি। ওর নাম ছিল তিথি। একদিন স্কুলের গেটের সামনে আচার কিনতে গিয়ে দেখেছিলাম, দারোয়ান তিথির প্যান্টে হাত দিচ্ছে। আমাকে কেউ গুড টাচ-ব্যাড টাচ শেখায়নি ছোটবেলায়। দারোয়ানের ব্যাড টাচ বুঝতে পারলে নিশ্চয় আমি তিথিকে বাঁচাতে পারতাম।

ধীরে ধীরে আয়নার কাপড় সরাই। তিথি নেই। আমি নিজেকে দেখতে পাই। এই প্রথম আয়নায় নিজেকে দেখি। বিছানায় শুয়ে আছি। হসপিটালের সাদা বিছানা। আমার ঠোঁটের কোনায় ফেনা জমে আছে। আয়নায় নিজেকে দেখতে দেখতে হঠাত্ করে আমার রুমটা বদলে যেতে থাকে। আশপাশে তাকিয়ে নেসারিকে দেখতে পাই না। কেবল নিজেকে দেখতে পাই। বিছানায় শুয়ে আছি। আমি ভয়ে চিত্কার করি।

নেসারি! আমি কোথায়?’

একজন অ্যাপ্রোন পরা মধ্যবয়স্ক লোক ছুটে আসে। বিছানার পাশে আমার দাদি দাঁড়িয়ে আছে। পাশে আমার আম্মা।

আম্মা আমাকে বলে, ‘নেসারি নামে কেউ নেই, তিথি।’

আমি প্রতিবাদ করি।

‘আমার নাম তিথি না, আম্মা! তুমি নিজের মেয়ের নাম ভুলে যাও কীভাবে? আমি মিথিলা। তিথি তো আমার ছোটবেলার বান্ধবী। তুমি ভুলে গিয়েছ? ঐ যে স্কুলের দারোয়ান যেই মেয়েটাকে রেপ করে মেরে ফেলেছিল। আমাকে গুড টাচ আর ব্যাড টাচ শেখাওনি কেন, আম্মা? শেখালে তো তিথিকে বাঁচাতে পারতাম আমি।’

আম্মা কাঁদে। ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে, ‘তিথি, মা, কী হইলো তোর?’

আমি রেগে যাই।

‘আম্মা, আমি মিথিলা। মিথিলা! তুমি নেসারিকে ডাকো। ওকে আমি সব বলেছি।’

অ্যাপ্রোন পরা লোকটা আমার দিকে হেঁটে আসে তখন। কাছে এলে লোকটার চেহারা স্পষ্ট দেখতে পাই। সেই লোকটা! তিথিকে যে মেরে ফেলেছিল, সেই লোকটা! দারোয়ানের খাকি জামা বদলে অ্যাপ্রোন পরে ডাক্তার সেজেছে এখন।

আমি গলা ফাটিয়ে ডাকি, ‘নেসারি! নেসারি!’

নেসারি আসে না। তখন আমার মনে হয়, আমি আসলে আয়নার এপাশে চলে এসেছি। এখানে নেসারি নেই। ও আসতে পারবে না। আমি কাঁদতে থাকি।

ভাঙা ভাঙা স্বরে ডাকি, ‘নেসারি! তিথি!’

সবাই ভাবে, আমি অসুস্থ। আয়নার এপাশেও কেউ আমার কথা বিশ্বাস করে না। ওপাশেও না। কেউ আসে না। আমার হাতে সুচ বেঁধাচ্ছে কারা যেন!