২ মার্চ থেকে বলতে গেলে আমরা বেতারের সবাই অসহযোগ করছিলাম। কিন্তু বেতার সচল রাখা হয়েছিল বাঙালিকে উদ্বুদ্ধ করা ও উদ্দীপ্ত রাখার জন্য। তাই সরকারি বিধি অনুসারে অফিস না করে আমরা সবাই শাহবাগের বেতারভবনে নিয়মিত উপস্থিত থাকতাম। তাছাড়া বেতার তখন শিল্পী-কবি-কুশলীদের মিলিত হবার স্থান হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছিল। না হলে ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে (আজকের বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর) দেখা হতোই। ১১ মার্চ সম্ভবত সকাল দশটায় হন্তদন্ত হয়ে মোহাম্মদ আবদুল জব্বার এসে উপস্থিত।
বঙ্গবন্ধু গতকাল বলেছেন—বেতার-টেলিভিশনে বাংলার গান হতে হবে। আর আমাকে হুকুম দিয়েছেন তোমাকে দিয়ে গান লেখাতে—এমন গান, যে গানে শহিদদের স্মরণ করা হবে, আবার মানুষ শহিদ হওয়ার জন্যে প্রাণ বাজি রাখবে।
জব্বারের কথা শুনেই আমার ‘সালাম সালাম’ গানটির কথা মনে পড়ে গেল, যেটি আমি ঊনসত্তরে গণঅভ্যুত্থানের সময় লিখেছিলাম এবং শিল্পী বশির আহমদকে দিয়েছিলাম। কিন্তু বশির গানটি করেনি। আশ্চর্য, এতদিন গানটির কথা একবারও মনে হয়নি। জব্বারকে বললাম, একটি গান লেখাই আছে।
—কোথায়?
—বাসায়।
—চল, এক্ষুনি চল। পছন্দ হলে ভালো, না হলে নতুন করে লিখতে হবে কিন্তু।
বাসায় গেলাম। আমি খুঁজে বের করলাম গানটা। জব্বার গানটি খুব মনোযোগ দিয়ে দু-তিনবার পড়ল। বলল—এই না হলে কবি। চল, গানটিকে এবার ধার দিতে হবে।—বলেই আমাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে তার বাসায় তুলল জব্বার। দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে বসলাম। উঠলাম সেই সন্ধ্যায়—সন্ধ্যা তখন ঘোর হয়ে গেছে। মাঝে একবার জব্বারের স্ত্রী কিছু খাবার দিয়ে গেছে।
এবার চল বাবার কাছে—মানে বঙ্গবন্ধুর কাছে। বাবা পাস করে দিলে কালই রেডিওতে রেকর্ড করব। চললাম ৩২ নম্বরে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা হলো রাত এগারোটায়। তিনি গান শুনলেন এবং বললেন—যা, কাল থেকে রেডিওতে এ গানটি বাজাতে শুরু কর।
গান তো হলো। বঙ্গবন্ধুর অনুমতিও পাওয়া গেল। কিন্তু গোল বাধালেন রেডিওর সংগীত বিভাগের প্রধান নাজমুল আলম। কারণ—‘বাংলাদেশের লাখো বাঙালি, জয়ের নেশায় চলে রক্ত ঢালি’—অন্তত বাঙালিদের রক্ত ঢালার কথা বলা যাবে না। পাকিস্তান আর্মি-পুলিশ দুষ্কৃতকারীদের (?) শায়েস্তা করছে। কোনো দেশপ্রেমিককে তারা মারছেও না, ধরছেও না।
জব্বার তো রেগে টং। ধীর আলী ভাই (প্রখ্যাত সুরকার ও সংগীত পরিচালক) বললেন—চল, বড়ো জামান সাহেবের কাছে যাই। বড়ো জামান সাহেব মানে আশরাফ-উজ-জামান খান তখন ঢাকা বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক। তিনি জব্বারকে অতিরিক্ত স্নেহ করেন। তিনি সব শুনে বলে দিলেন—গানটি এখন রেডিও থেকে প্রচার হওয়া দরকার। শুধু একটি কথার জন্যে প্রচার হবে না, তা করা ঠিক হবে না। ফজল-এ-খোদাকে বল, আমি বলেছি—শুধু ‘রক্ত ঢালি’ পরিবর্তন করে দিতে। তিনি ‘রক্ত’ ‘ঢালি’ শব্দ দুটিতে গোল চিহ্ন দিয়ে গানটি নিজেই পাস করে দিয়েছেন। শেষে ‘জয়ের নেশায় চলে রক্ত ঢালি’-র জায়গায় ‘জয়ের নেশায় আনে ফুলেরও ডালি’ এভাবে লিখে দিলাম। গানটি ১৪ মার্চ ধীর আলী মিয়ার সংগীতায়োজনে রেকর্ড হলো এবং সেদিনই বেতার থেকে প্রচার করা হলো। ১৫ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত প্রতি অধিবেশনে একবার করে অর্থাত্ দিনে ২/৩ বার প্রচারিত হতে থাকল গানটি। আর প্রচারমাত্রই শহরে নগরে গ্রামে গঞ্জে বাঙালিদের কণ্ঠে কণ্ঠে ছড়িয়ে পড়ল—
সালাম সালাম হাজার সালাম
সকল শহিদ স্মরণে,
আমার হূদয় রেখে যেতে চাই
তাদের স্মৃতির চরণে ...
লেখকের ‘সংগীতভাবনা’ (বাংলা একাডেমি, ২০১২) বই থেকে
