শুধু আশুরা নয় মহাকোরবানিও বটে

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২০, ২১:৫৩

শাহ্ শাহজাদা রহমান বাঁধন

আরবি আশারাহ্ শব্দের অর্থ ১০। এই আশারাহ্ থেকে আশুরা শব্দের উত্পত্তি। অর্থাত্ আরবি বছরের প্রথম মাস মহরমের ১০ তারিখ হলো ‘আশুরা’। আশুরা দিবসের বহু ঐতিহাসিক তাত্পর্য রয়েছে। পবিত্র আশুরা মহান রাব্বুল আলামিনের পরম কৌশল ও কুদরত প্রকাশের অন্যতম দিন। অতীতের ঘটনাবলি থেকে ভবিষ্যত্ কর্মপন্থা নির্ধারণে মানুষ যেন তত্পর হয়, সেটির প্রতি মহরম বা আশুরা ইঙ্গিত প্রদান করে। এজন্যই পবিত্র আশুরাকে ‘তাজাকির বি আইয়া মিল্লাহ’ সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণের আদেশের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হিসেবে শ্রদ্ধায়ও স্মরণ করা হয়। পবিত্র আশুরার স্মৃতি থেকে সত্যের প্রতিষ্ঠা ও মিথ্যার অপসারণের ইঙ্গিত লাভ করা যায় এবং স্মরণ করে দেয় যে, একান্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে ধৈর্যসহ ন্যায় ও সত্যের জন্য এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন হলে আল্লাহর পথে প্রাণ উত্সর্গ করতে হবে। যেমনটি করেছিলেন সাইয়্যেদেনা হজরত ইমাম হোসাইন (আ.)। এ কারণেই পবিত্র আশুরাকে ‘তাজকেরা বি আলা ইল্লাহ’ জেকেরের উত্স হিসেবে কল্পনা করে সম্মানের সঙ্গে পালন করা হয়। পাক কোরআনের বিধান মতে দুনিয়ার সব ধরনের মায়া, ক্ষমতা, লোভ ও ধন সম্পদের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে এক সৃষ্টিকর্তার রাহে নিজেকে উত্সর্গ করে  আল্লাহ্র মনোনীত দিনকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং তার মনোনীত কোরবানি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আশুরা দিয়ে আমাদের নশ্বর পৃথিবীর কামনা-বাসনা, ক্রোধ-লোভ ইত্যাদি থেকে রিপুকে পবিত্র ও নিষ্কলঙ্ক রাখার শিক্ষা দেয়।

কোরআনের নির্দেশিত ‘উলিল আমর-নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির অনুগত হও। এই বাক্য যথাযথ পালন করার জন্য একই শ্রেণিভুক্ত হয়ে আল্লাহর মনোনীত ইমামের অনুসারী  হওয়ার ইঙ্গিত পবিত্র আশুরা আমাদের শিক্ষা দেয়।

এ জন্যই রাসুলে খোদা (স.) এরশাদ করেছেন—তোমরা আল্লাহ পাকের প্রিয় ও সম্মানিত মাস বিশেষত : আশুরার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন কর। যারা পবিত্র আশুরাকে শ্রদ্ধা ও তাজিম করিবে তারাই পরিত্রাণ পাবে। নবি পাক (স.) আরো এরশাদ করেন ‘আমি আল্লাহ তালার দরবারে আশা রাখি আশুরার (১০) রোজ উহার পূর্ববর্তী বছরের গুনাহের কাফফারা হবে’—(মুসলিম শরিফ)। এটাই প্রতিয়মান হয় যে, মহরম মাস বিশেষত : আশুরার দিন পুণ্যময়দের স্মরণে সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য সব ধরনের কাজের মাধ্যমে ইবাদত বন্দেগি দিয়ে সৃষ্টিকর্তা রাব্বুল আলামিনের রহমত ও নৈকট্য লাভ করা যাবে। পক্ষান্তরে  এ কর্মের বিরোধিতা করলে সৃষ্টিকর্তার রহমতের আশা বাতুলতা মাত্র। সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক হজরত ইব্রাহিমের (আ.) ওপরে কোরবানির হুকুম হইলে তিনি পর্যায়ক্রমে ৫০, ১০০, ৫০০টি ছাগল, দুম্বা, উট কোরবানি করলেন। কিন্তু আবার হুকুম হলো ‘তোমার সর্বাপেক্ষা প্রিয় বস্তু কোরবানি কর।’ হজরত ইব্রাহিম (আ.) ঐ আদেশে বিশেষ চিন্তাযুক্ত হইয়া পরবর্তী সময়ে নিজ পুত্র হজরত ইসমাইলকে (আ.) প্রিয় ভাবিয়া হুকুম পালনের জন্য তাকেই আল্লাহর রাহে কোরবানি করলেন। কিন্তু হজরত ইসমাইলের (আ.) পরিবর্তে দুম্বা কোরবানি হলো। উক্ত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে হজরত ইব্রাহিম (আ.) মহাবিচলিত হয়ে পরলেন এবং আল্লাহর রাহে ফরিয়াদ করলেন ‘ইয়া গফুরুর রাহিম তোমার হুকুম মোতাবেক প্রিয় পুত্রকে কোরবানি করলাম, কিন্তু তা গ্রহণ না হয়ে দুম্বা কোরবানি হলো। তোমার মহিমা কিছুই বুঝতে পারলাম না। তখন ওহি নাজিল হলো ‘আমি মহাকোরবানির বিনিময়ে তাকে মুক্ত করে দিলাম’ আমি ভবিষ্যত্  বংশধরদের মধ্যে সুযশ স্থায়ী করিলাম—(আল-কোরআন)।

আখেরি জামানায় দোস্ত মুহাম্মদের (স.) উম্মত এবং ইসলামকে রক্ষা করার জন্য তোমার বংশীয় হজরত ইসমাইলের (আ.) গোত্র থেকে এ কোরবানি মহাকোরবানি সমাধা হবে। তাই দুম্বা কোরবানি হলো। পরবর্তী সময়ে কারবালার ময়দানে আখেরি নবির (স.) কলিজার টুকরা সাইয়েদুস সোহাদা হজরত ইমাম হোসাইন (আ.) নিজ ইচ্ছায় শাহাদতের মাধ্যমে মহাকোরবানির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

পানি পিপাসায় কাতর শিশুপুত্র হজরত আলী আজগরসহ বংশের সব পুরুষ সদস্য একের পর এক আল্লাহর পথে উত্সর্গ করতে হজরত ইমাম হোসাইনকে (আ.) দুনিয়ার কোনো ধরনের মায়ামহব্বত বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি, বরং নিজ জ্ঞানে সর্বহারা অবস্থায় কুটিল শত্রুর কাছে মাথা না নোয়াইয়ে মহাকোরবানি সমাধা করলেন। রাব্বুল আলামিন এ রূপ কোরবানির জন্যই পাক কোরআনে ঘোষণা করেছেন—শুধু মাংস ভক্ষণ ও অর্থের বাহাদুরির জন্য কোরবানি নয়। তাই কোরআনে আছে ‘আল্লাহর কাছে কখনো না তাদের গোশত পৌঁছে, না রক্ত, বরং তার কাছে পৌঁছে সাধুতা। হে মোমিনগণ ‘তোমরা তোমাদের প্রিয়বস্তু দান না করা পর্যন্ত পূর্ণ ফল লাভ করতে পারবে না।’ উল্লিখিত কারণেই রাব্বুল আলামিনের হুকুম যথাযথভাবে পালনার্থে সর্দার-ই-শুহাদা হজরত ইমাম হোসাইন (আ.) ফোরাত তটে মরুময় প্রান্তরে মহাকোরবানি, প্রিয়বস্তু দান করে আল্লাহর মনোনীত কোরবানির নিদর্শন দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত করে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। সেজন্যই আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত কোরআনে এরশাদ করেন ‘যারা জেহাদ করেছেন আল্লাহর পথে, পদমর্যাদাশীল ও নিজেদের প্রাণ দিয়ে—তারাই আল্লাহর মাকসুদে পৌঁছাবেন।   

‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মোহাম্মদ, ওয়া আলে মোহাম্মদ ওয়া আজ্জিল ফারাজাহুম।’

n লেখক :ইসলামি চিন্তাবিদ, আলোচক ও বিশ্লেষক, পীরজাদা, গড়পাড়া ইমামবাড়ী দরবার শরীফ