টোনাই আর টোটনের গল্প

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২০:৫০

সকালবেলা একটা চড়ুই পাখি রোজ আমার বাসার জানালায় এসে টুইটুই করে। সকালে ঘুমটা ভাঙিয়ে দেয় সবসময় এই চড়ুইটা। আমি ওর নাম দিয়েছি ‘টোনাই’

আমাকে সবাই ‘টোটন’ ডাকে, আমিও নাকি টোনাইয়ের মতো সারাদিন টুইটুই করি!

টোনাইয়ের ডাকাডাকিতে প্রথম প্রথম আমার খুব রাগ হতো। সকালের ঘুমটাই নষ্ট করে দিত আমার!

একদিন সকালে আমার অনেক আগে ঘুম ভেঙে গেল, আমি অপেক্ষা করতে থাকলাম আজ টোনাই এলে তাকে দেখিয়ে দেবো যে তার টুইটুই ডাক ছাড়াই আমি জেগে গিয়েছি, আর খুব বকে দেবো যাতে করে আর আমার বারান্দায় না আসে সে।

কিন্তু আজ টোনাইয়ের আসার নাম নেই! ভাবলাম, হয়তো আরেকটু পর আসবে। সকাল আটটা, নয়টা, দশটা বেজে গেল। টোনাই এল না। আমার মনটাই খারাপ হয়ে গেল—কেন যে আগে উঠলাম! হয়তো এজন্যই টোনাই আসেনি!

পরদিনও টোনাইয়ের খবর নেই।

আমি পরপর আট দিন অপেক্ষা করলাম, টোনাইয়ের জন্য খাবার-পানি রেখে দিচ্ছিলাম, বারান্দায় যেয়ে এদিক-ওদিক উঁকি দিতাম টোনাইকে খুঁজতে, কিন্তু আর এলোই না সে!

আমার খুব মনটা খারাপ যাচ্ছিল।

হঠাত্ দেখি নয় দিনের মাথায় টোনাই এসেছে!

আমি ঘুমাচ্ছিলাম। হঠাত্ একটা অপরিচিত কণ্ঠ, ‘এই টোটন, টুইটুই, টোটন কুমার, টুইটুই।’

আমি তাকিয়ে দেখি টোনাই!

ঠিক আমার নাকের ডগায় বসে আছে!

আমি লাফ দিয়ে উঠলাম আর সে আমার চারপাশে উড়তে থাকল। আমি অবাক! টোনাই হাসছে আর বলছে, ‘দেখেছো, আমি না এলেও তুমি কিন্তু আগেই উঠে পড়ার অভ্যেস করে ফেলেছো। আবার আমি না আসায় আমার জন্য মনটাও খারাপ করেছো!’

আমি তখনো অবাক! টোনাই তো চড়ুই পাখি, ও কথা বলছে কী করে!

আমি চোখ কচলে বললাম, ‘তুমি কথা বলতে পারো কী করে? তুমি তো চড়ুই পাখি, মানুষ না।’

টোনাই  হেসে বলল, ‘আমি পাখিদের ভাষায় কথা বলছি, কিন্তু তা-ও তুমি বুঝতে পারছো, কারণ তুমি আমাকে খুব মিস করছিলে, আমার জন্য খাবার নিয়ে বারান্দায় অপেক্ষা করছিলে দেখে আমার খুব আনন্দ হয়েছে। আমি প্রার্থনা করেছিলাম—এই মানুষকুলের মাঝে যেন তুমি আমার কথা বুঝতে পারো।’

এটা শুনে আমার কান্না এসে গেল।

পাশের ঘর থেকে মা দৌড়ে এল।

এসেই বলল, ‘এই টোটন, তোর ঘরে চড়ুই ঢুকেছে আর তুই কীসব টুইটুই করছিস?’

টোনাই এক লাফে বারান্দায় যেয়ে বসে ‘টুইটুই’ শুরু করল। আমি মাকে বললাম যে মা, দেখো কত্তদিন পর টোটন এসেছে! ও আমার সাথে কথা বলছে!

মা হেসে দিয়ে বলল, ‘জলদি রেডি হয়ে আসো, স্কুলে যেতে হবে।’

আমি তো মহাখুশি! আজ স্কুলে যেয়ে সবাইকে বলব যে, চড়ুই পাখি টোনাই আমার সাথে কথা বলেছে!

মা যেতেই টোনাই বলে বসল, ‘এই টোটন কুমার, আমি যে তোমার সাথে কথা বলি—এটা আর কাউকে জানানো যাবে না কিন্তু। জানালে আমাকে সবাই ধরে নিয়ে যেতে চাইবে।’

আমার আনন্দ কমে গেল। বললাম, ‘আমি তো তোমাকে ধরে আটকে রাখতে চাই না, তবে অন্য কেউ কেন আটকাবে?’

তখন টোনাই বলল, ‘সবাই কি আর তোমার মতো? আমি মাঝে অনেকদিন আসতে পারিনি তোমার ঘুম ভাঙাতে, কারণ আমি কথা বলতে পারছি শুনে আমাকে একটা বাসায় আটকে রেখেছিল। আটকে রেখেছিল বলে আমি রাগ করে আর কথাই বলিনি। ওরা আমাকে তাই ঠিকমতো খেতে দিত না। আজ ছেড়ে দিলো খাঁচা থেকে। আমি উড়াল দিয়ে চলে এলাম তোমার এখানে।

তুমি রোজ আমার ডাকে ঘুম থেকে উঠে আমার সাথে কথা বলতে তাই মনে হলো, আমাকে না দেখে তোমার যদি মন খারাপ হয় তাই সব জানালাম।’

টোটন কেঁদে দিয়ে টোনাইকে বলল, ‘তুমি উড়ে এসে হাতে বসবে আমার?’

টোনাই সাথে সাথে উড়ে এসে টোটনের হাতে বসল।

টোটন টোনাইয়ের মাথায় হাতে রেখে বলল, ‘আমি কখনো তোমাকে খাঁচায় আটকাবো না। তুমি উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়াবে আর রোজ এসে আমায় ঘুম ভাঙিয়ে গল্প করে যাবে!’

টোটন আর টোনাই দুজনই আনন্দে কাঁদতে কাঁদতে হেসে উঠল।

টোটন এরপর থেকে সবসময় সবাইকে বলে—যাতে কোনো পাখিকেই খাঁচায় বন্দি না করা হয়।

পাখিদের বন্দি করলে টোনাইয়ের মতো চড়ুই পাখিরা কি আর কারো বারান্দায় যেয়ে শিস  বাজাবে? তাদের শিসের শব্দেই তো সকালটা অদ্ভুত সুন্দর হয়ে যায়!

বেঁচে থাকুক পাখিরা, বেঁচে থাকুক সব টোনাই চড়ুই। তাদের কলকাকলিতে মুখর থাকুক চারপাশ।