অক্সিজেন স্বল্পতা: রাজশাহীতে দুই দিনে মাছের ক্ষতি ১৪ কোটি টাকা

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২০:৫৬

রাজশাহীতে প্রতিক‚ল আবহাওয়ায় দুই দিনে প্রায় ৬১৬ মেট্রিক টন মাছ মরে গেছে। গত মঙ্গলবার ও বুধবার (১ ও ২ সেপ্টেম্বর) পুকুরে এসব মাছ মরে পানিতে ভেসে ওঠে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে রাজশাহীর পবা, বাগমারা, মোহনপুর, গোদাগাড়ী, পুঠিয়া, দুর্গাপুর ও তানোর উপজেলার ৪ হাজার ৯৩০ জন মাছচাষির প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। 

এই তথ্য দিয়ে মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, মঙ্গলবার ও বুধবার রাজশাহীতে বৃষ্টি হয়েছে। আকাশ ছিল মেঘলা। এ কারণে পানিতে অক্সিজেন  স্বল্পতা দেখা দেয়। এতে পুকুরের মাছ মরে ভেসে উঠতে থাকে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজশাহীর আশপাশের জেলায়ও একইভাবে পুকুরের মাছ মরেছে। এতে চাষিরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। জানতে চাইলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ফিশারিজ বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. এম মনজুরুল আলম বলেন, সূর্য না ওঠার কারণে পুকুরের উদ্ভিদকণা সালোক সংশ্লেষণ করতে পারেনি। উদ্ভিদকণা কার্বনডাই অক্সাইড গ্রহণ করে অক্সিজেন ছাড়তে পারেনি। এ কারণে পুকুরে অক্সিজেনের স্বল্পতা দেখা দেয়। এদিকে করোনার কারণে চাষিরা পুকুরের কোনো মাছ বিক্রিই করতে পারেননি। তাই প্রায় প্রতিটি পুকুরে অতিরিক্ত মাছ ছিল। তাই অক্সিজেন স্বল্পতায় মাছ মরতে শুরু করে। চাষিদের আসলে কিছুই করার ছিল না।

জানা যায়, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পবা উপজেলার চাষিদের। এই উপজেলায় সবচেয়ে বেশি মাছ চাষ হয়। এছাড়া জেলার দুর্গাপুর, মোহনপুর, বাগমারা, তানোর, পুঠিয়া ও গোদাগাড়ীসহ সব উপজেলাতেই মাছের ক্ষতি হয়েছে। যেসব পুকুরে বড় আকারের মাছ ছিল সেই পুকুরেই বেশি মাছ মরেছে। বড় বড় মাছ নামমাত্র মূল্যে বিক্রির চেষ্টা করেছেন চাষিরা।
মোহনপুর উপজেলার কেশরহাটে বুধবার অন্য দিনের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মাছ নিয়ে চাষিরা হাজির হন। অতিরিক্ত মাছ আমদানির কারণে আড়ৎদাররা মাছ বেচাকেনা বন্ধ করে দেন। ওইদিন কেশরহাট বাজারে ৪ থেকে ৫ কেজি ওজনের মাছ ৫০ টাকা থেকে ৮০ টাকা কেজি দামে বিক্রি হয়েছে। প্রতি কেজি সিলভার কার্প বিক্রি হয়েছে ১০ টাকা থেকে ২০ টাকা কেজি দামে। 

দুর্গাপুরের মাছ চাষি নুরুল ইসলাম জানান, বৃষ্টির পরই তিনি পুকুরে গিয়ে মরা মাছ ভেসে উঠতে দেখেন। তার চোখের সামনেই লাখ টাকার মাছ মরেছে। এক দিনেই তার বড় ক্ষতি হয়েছে। বাগমারার মাদারীগঞ্জ, ভবানীগঞ্জ, হাটগাঙ্গোপাড়াসহ বিভিন্ন মাছের আড়তে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড় ছিল। বাগমারার বাজারে ৩ থেকে ৪ কেজি ওজনের রুই, কাতল ও সিলভার মাছ ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দামে বিক্রি হয়েছে। বাগমারার বালানগরের মাছচাষী আব্দুল মতিন জানান, বুধবার সকালে জানতে পারেন তার পুকুরের মরা মাছ ভাসছে। দ্রুত পুকুরে গিয়ে কিছু মাছ তুলে বাজারে নিয়ে যান। বাকি মাছ পুকুরে পচে যায়। 

বাগমারার মৎস্য কর্মকর্তা শাহাদৎ হোসেন জানান, দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে পুকুরগুলোতে অক্সিজেনের সল্পতা দেখা দেয়। পুকুরে অতিরিক্ত মাছ থাকলে মাছ মরার সম্ভাবনা বেশি। তবে যাদের পুকুরে পরিমিত মাছ আছে, তাদের ক্ষতি কম হয়েছে। তাই এখন পুকুরের মাছ কমিয়ে ফেলতে হবে।

রাজশাহী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা অলক কুমার সাহা জানান, মঙ্গলবার ও বুধবার আবহাওয়া খারাপ ছিল। রাজশাহীর অধিকাংশ ব্যবসায়ীরা পুকুরে অতিরিক্ত খাবার দিয়ে অতিরিক্ত মাছ চাষ করেন। বর্ষার আগেই পুকুরের মাছ কমিয়ে ফেলা উচিত। গত বৃহস্পতিবার তারা ক্ষতির প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছেন। এতে বলা হয়েছে, দুই দিনে রাজশাহীর প্রায় ৬১৬ মেট্রিক টন মাছ মরেছে। ক্ষতিগ্রস্ত চাষির সংখ্যা ৪ হাজার ৯৩০ জন। তাদের ১৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এটা কম-বেশি হতে পারে। ক্ষয়ক্ষতির এই হিসাব মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য অধিদপ্তরে পাঠানো হবে।

উল্লেখ্য, বিগত কয়েকবছরে রাজশাহীতে মাছ চাষে বিপ্লব ঘটেছে। জেলায় প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর জমিতে পুকুর রয়েছে। বছরে মাছের উৎপাদন হয় প্রায় ৮৪ হাজার মেট্রিক টন। জেলার চাহিদা মিটিয়ে এখানকার মাছ ঢাকায় পাঠানো হয়। তবে মাঝেমাঝেই দুর্যোগের মুখে পড়েন চাষিরা।

ইত্তেফাক/কেকে