শীতের তীব্রতায় উষ্ণতা ছড়িয়ে দিন

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:৩৫

আরাফাত শাহীন

দেশে হঠাত্ করেই তীব্র শীত শুরু হয়েছে। শৈত্যপ্রবাহের দরুন এমনটা হচ্ছে। সারাদেশে ব্যাপকভাবে শীত তার প্রভাব বিস্তার করলেও উত্তরাঞ্চলে যে এই প্রভাব ঢের বেশি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ভৌগোলিকভাবে দেশের উত্তরাঞ্চল- বিশেষ করে রাজশাহী এবং রংপুর বিভাগের মানুষ শীতের দিনে সবচেয়ে বেশি কষ্ট ভোগ করে থাকে। হিমালয় থেকে হিমেল হাওয়া এসে এসব এলাকার মানুষের জীবনে সীমাহীন কষ্টের তীব্রতা নিয়ে হাজির হয়। শীতের দিনগুলোতে দেশে শীতের প্রকোপ বৃদ্ধি পাবে এটাই স্বাভাবিক। তবে শীত যেন মানুষের জীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলে স্বাভাবিক কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখা কর্তব্য।

পড়াশোনা করার তাগিদে আমাকে দেশের উত্তরাঞ্চলের প্রধান শহর রাজশাহীতে থাকতে হয়। শীতের তীব্রতা ঠিক কতটুকু হতে পারে এবং জনজীবনে তা কীরূপ প্রভাব ফেলতে পারে তা আমি বেশ ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছি। আশপাশের জেলাগুলো অপেক্ষাকৃত অনুন্নত হওয়া এবং সেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিদিন ভোর সকালে বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজের সন্ধানে শহরের দিকে ছুটে আসে। সন্ধ্যায় আবার তারা গ্রামের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। এই মানুষগুলোর একটা বড় অংশই আসে সাইকেলে চেপে। বাকিদের বড় একটা অংশ বাসের খোলা ছাদে চড়ে আসে। এমন শীতের দিনে তীব্র ঠান্ডায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেন তারা এভাবে ছুটে আসে? শুধুমাত্র দুই মুঠো অন্নের জন্য এই মানুষগুলোর বিরামহীন ছুটে চলা।

আমাদের দেশ এখন পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিকমাত্রায় উন্নতি এবং অগ্রগতি লাভ করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পেয়েছে, খাদ্যে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের কাছাকাছি চলে এসেছি, দারিদ্র্যের হারও পূর্বের তুলনায় বহুলাংশে কমে এসেছে। মানুষ এখন বিভিন্ন প্রকার নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে যা পূর্বে ধারণাও করতে পারেনি। কিন্তু এমন শীতের দিনে যখন একটা শিশু কিংবা একজন বৃদ্ধ মানুষকে প্রায় খালি গায়ে ফুটপাতের বেঞ্চিতে শুয়ে রাত কাটাতে দেখি তখন স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগে, সরকারের দেওয়া সুযোগ-সুবিধা সমাজের সকল মানুষের কাছে সমভাবে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে তো? সত্যি কথা বলতে কী, এখনও দেশের মানুষের একটা বড় অংশ নাগরিক সুবিধা পাওয়া থেকে বঞ্চিত রয়েছে। এমনকি তারা মৌলিক অধিকারটুকুও পাচ্ছে না। এ দায় আমাদের। এ দায় আমাদের সমাজের ও রাষ্ট্রের। আমরা কিছুতেই এ দায় এড়াতে পারি না।

শীতকাল এলেই গরিব, দুস্থ ও অসহায় মানুষের মধ্যে কম্বল ও শীতবস্ত্র বিতরণের ধুম পড়ে যায়। আমি এই প্রবণতাকে খারাপ বলে অভিহিত করতে পারি না। এই বিতরণের উদ্দেশ্য যেন লোকদেখানো ও ফেসবুকে প্রচারণার জন্য না হয়। যে পোশাকগুলো মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে তা যেন তাদের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে, শীতের তীব্রতাকে দূরে ঠেলে দিয়ে তা যেন উষ্ণতা এনে দিতে পারে। সুতরাং আমদের উচিত অভাবী মানুষের অভাবকে মনের দরদ দিয়ে অনুভব করা। তাদের প্রতি আমাদের মমত্ববোধের মাধ্যমে পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পারলে তবেই সেটা ফলপ্রসূ বলে বিবেচিত হবে।

কিছুদিন পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা গেট দিয়ে প্রবেশ করছিলাম। গেটের সামনে দেয়ালের সঙ্গে ‘মানবতার দেয়াল’ নামে পোস্টার আটানো দেখে থমকে দাঁড়ালাম। সেখানে পুরনো পোশাক রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। আবার যার পোশাকের প্রয়োজন তিনি সহজেই সেখান থেকে পোশাক নিয়ে নিতে পারবেন। দেশের অনেক জায়গাতেই এমন ব্যবস্থা রয়েছে বলে পত্রিকাতে দেখেছি। সত্যিই এমন আয়োজন আমাদের আশাবাদী করে তোলে। আমি বিশ্বাস করি এটা অবশ্যই সমাজের জন্য উপকারী বলে প্রতীয়মান হবে। এখন এই জায়গাগুলোতে আমরা যদি সাধারণ পোশাকের পাশাপাশি শীতের পোশাকও রাখতে শুরু করি তাহলে যে মানুষগুলো শীতের তীব্রতায় কষ্ট অনুভব করছে তারা সহজেই এখান থেকে শীতের পোশাক নিয়ে নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে পারবে।

আমরা আরাম-আয়েশে উষ্ণতার মধ্যে দিন অতিবাহিত করবো আর আমাদের সমাজেরই অন্য কেউ শীতে কষ্ট অনুভব করে সেটা কিছুতেই হতে পারে না। আমাদের অবশ্যই মানবিক হতে হবে। এসব সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দিকে মমতামাখা দৃষ্টি দিয়ে তাকাতে হবে। শীতের এই তীব্রতায় একটু উষ্ণতা ছড়িয়ে দিন। আপনার ছড়িয়ে দেওয়া উষ্ণতায় হয়ত হাজারো প্রাণ একটু শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। সামান্য এই ত্যাগটুকু কি স্বীকার করতে পারি না?

n লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়