হামলার শিকার দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানমের শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। কেউ ডাক দিলে তিনি সাড়া দিচ্ছেন। স্বামীকে চিনতে পেরেছেন। সন্তানেরও খোঁজ নিয়েছেন। এখন তার ক্ষুধা অনুভব হচ্ছে। তবে তার ডান দিক প্যারালাইজড হয়ে গেছে বলে চিকিত্সকরা জানিয়েছেন।
এদিকে এই হামলার ঘটনায় গ্রেফতার প্রধান আসামি আসাদুল হকের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অপর দুই আসামি নবীরুল ইসলাম ও সান্টু কুমার বিশ্বাসকে গতকাল আদালতে হাজির করা হলে সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। গতকাল ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার মামলাটি থানা থেকে ডিবিতে স্থানান্তর করা হয়েছে।
অপরদিকে ওয়াহিদা খানমের বাবা মুক্তিযোদ্ধা ওমর আলী শেখের (৬৫) কোমরের নিচের অংশ পুরোটাই অবশ হয়ে গেছে। কথা বলতে ও খেতে পারলেও চলাচল করতে পারছেন না তিনি। আপাতত অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন না হলেও পুরোপুরি সেরে উঠতে তার দীর্ঘ সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন চিকিত্সকরা।
নিউরোসায়েন্সেস ইনস্টিটিউটের যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম ইত্তেফাককে বলেন, ‘ওয়াহিদা খানমের অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। শনিবার তিনি স্বামীকে চিনতে পেরেছেন। এমনকি একমাত্র সন্তানের খোঁজ খবরও নিয়েছেন। ক্ষুধা অনুভব হচ্ছে বলে আমাদের জানিয়েছেন। তবে তার ডান পাশ পুরোটাই প্যারালাইজড হয়ে গেছে। এখনো তাকে পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত বলা যাচ্ছে না। সাত দিন না গেলে মাথায় আঘাত পাওয়া রোগীর বিষয়ে কিছু বলা যায় না। এখন তার বয়স কম। বেঁচে উঠলে বিভিন্ন ধরনের থেরাপি দিয়ে তার ডান সাইডের উন্নতির চেষ্টা করা যেতে পারে। তবে কতটুকু উন্নতি হবে সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক হিসেবে গতকাল ওয়াহিদাকে দেখতে যান। গত সন্ধ্যায় তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘ডান দিকটা প্যারালাইজড হয়ে গেছে। তবে কিছুটা বোধ আছে। ফলে ভবিষ্যতে কিছুটা উন্নতির সম্ভাবনা আমরা দেখতে পাচ্ছি।’ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মো. খুরশিদ আলম গতকাল সকালে ওয়াহিদাকে দেখতে যান। তিনি ডাক দিলে ওয়াহিদা সাড়াও দিয়েছেন। তিনি বলেন, আপাতত অবস্থার উন্নতি হচ্ছে।
দিনাজপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিরামপুর সার্কেল) মিথুন সরকার বলেন, আসাদুল রংপুর মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি। ৩৫ বছর বয়সি আসাদুল ঘোড়াঘাট উপজেলার সাগরপুর এলাকার আমজাদ হোসেনের ছেলে। তিনি যুবলীগের ঘোড়াঘাট শাখার নেতা ছিলেন। শুক্রবার গ্রেফতারের পর তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়।
আমাদের রংপুরের স্টাফ রিপোর্টার জানান, গতকাল দুপুরে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিত্সক ও ওমর আলীর ছেলে শেখ ফরিদ উদ্দীনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তার বাবার কোমরের নিচের অংশ পুরোটাই অবশ হয়ে গেছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে ওমর আলীকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি ওয়ার্ড থেকে তিনতলার ভিআইপি কেবিনে নেওয়া হয়েছে।
রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. তোফায়েল হোসেন ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, ওমর আলী শেখের আগে থেকে ডায়াবেটিস ছিল। ঘটনার রাতে তিনি ঘাড়ে আঘাত পান। এতে স্পাইনাল কর্ডে গুরুতর আঘাত লাগে তার। সাধারণত এ ধরনের জটিলতায় হাত-পা সব অবশ হয়ে যায়। এক্ষেত্রে তার দুই হাত কিছুটা সচল থাকলেও নাভির নিচ থেকে পুরো নিচের অংশ এখন অবশ হয়ে গেছে। ডা. তোফায়েল হোসেন ভূঁইয়া আরো বলেন, সাধারণত এ ধরনের সমস্যা সেরে উঠতে দুই থেকে তিন মাস পর্যন্ত সময় লাগে। আপাতত তার অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন না হলেও দীর্ঘমেয়াদি চিকিত্সা প্রয়োজন। ওমর আলী শেখের ছেলে শেখ ফরিদ উদ্দিন বলেন, আপাতত বাবাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি।
রংপুরের জেলা প্রশাসক আসিব আহসান সাংবাদিকদের বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত এবং রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিত্সক এবং রোগীর স্বজনরা যদি ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার জন্য বলেন তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) সংবাদদাতা জানান, ওয়াহিদা খানমের সরকারি বাসায় চোরেরা শুধু কি চুরির উদ্দেশ্যে প্রবেশ করেছে, না হত্যার উদ্দেশ্যে প্রবেশ করেছে এ নিয়ে জনমনে ধোঁয়াশা কাটছে না। চোরের হাতে হাতুড়ি কেন এমন প্রশ্ন অনেকের। প্রায় দেড় ঘণ্টা তারা বাসার ভেতর কী করছিল—এমন প্রশ্নও অনেকের মনে। এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আসাদুলসহ অপর দুই জনের বিরুদ্ধে কোনো চুরির মামলা নেই। আসাদুল নিম্নমানের একজন মাদকাসক্ত। অপর দুই জন বিভিন্ন বাসাবাড়িতে রংমিস্ত্রির কাজ করত।
