যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট পদে লড়াই
শিফারুল শেখ
যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ৩ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর আগে গুঞ্জন ছিল, করোনা ভাইরাসের দোহাই দিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনে বিলম্ব ঘটাতে পারেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেরকম আলামত পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন কোনো নির্বাচনের কথা জানা যায়নি যে, সার্বিক ভোটাভুটিকে কোনো প্রার্থী মেনে নেননি। কিন্তু এবার নতুন এক ইতিহাস সৃষ্টির আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ হারলে যে কোনো প্রার্থী সেটা মেনে নাও নিতে পারেন। আবার আদালতেও ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন।
আশঙ্কা যে কারণে
যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণত নির্বাচনের পর পরাজয়বরণ করা প্রার্থী ফলাফল মেনে নিয়ে জয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানান। আবার জয়ী প্রার্থী পরাজিত প্রার্থীকে নিয়েই একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেন। কিন্তু এবারের নির্বাচনটা ভিন্ন হবে বলেই ধারণা। কারণ এই প্রথম কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট বলছেন, আগামী নির্বাচনে কারচুপি হতে পারে। আবার বিরোধীরাও কারচুপির আশঙ্কা করছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সহজেই ফলাফল মেনে নেবেন না বলে জানিয়েছেন। আবার সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনও নির্বাচনের রাতে ফল মেনে না নিতে তার দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জো বাইডেনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
আমেরিকায় এ বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অন্যতম বিতর্কিত বিষয় হয়ে উঠেছে ডাক ব্যবস্থা। ট্রাম্প তার সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, এবারের নির্বাচনে আমাদের হারার সম্ভাবনার একমাত্র কারণ—ভোটাভুটিতে কারচুপি। তার প্রতিপক্ষ জো বাইডেন কঠিন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভোট চুরি করতে যাচ্ছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প ডাক ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। আর এই কাজে সহায়তা করছেন নতুন নিয়োগ পাওয়া পোস্টমাস্টার জেনারেল লুইস ডিজয়।
গত ২০ বছর ধরে পোস্টমাস্টার জেনারেল পদটি দেওয়া হয়েছে ডাক বিভাগের ভেতরের কাউকে। কিন্তু গত জুনে এই পদে বসানো হয় ডিজয়কে যিনি ডাক বিভাগের বাইরের লোক। তিনি ট্রাম্পের নির্বাচনি তহবিলে ১২ লাখ ডলার চাঁদা দিয়েছেন। ইতিমধ্যে ডিজয় কিছু পরিবর্তন করেছেন যা নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা অভিযোগ করেছেন, ডিজয় ডাক ব্যবস্থাকে এমন অকেজো করার চেষ্টা করছেন যাতে ট্রাম্প নভেম্বরের নির্বাচনে কিছুতেই না হারেন। আর ট্রাম্প বলেছেন, ডাকে ভোট দেওয়ার সুযোগ বাড়ালে কারচুপির সম্ভাবনা আরো সহজ হবে এবং আমেরিকার নির্বাচনি ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত নির্বাচনে পরিণত হবে। তার বিশ্বাস, পোস্টাল ব্যালট ডাকবাক্স থেকে চুরি করা হবে। দেশের ভেতরেই বিভিন্ন দল সেগুলোর বদলে ভুয়া ব্যালট দেবে এবং লাখ লাখ বিদেশি শক্তি যারা চায় না ট্রাম্প জিতুক তারাও এগুলো নিয়ে জালিয়াতি করবেন। এসব ঝুঁকির অভিযোগ তুলে তিনি নির্বাচন পেছানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে দেশভিত্তিক এবং রাজ্যভিত্তিক অসংখ্য গবেষণা হয়েছে তাতে দেখা গেছে, ভোট কারচুপির সংখ্যা খুবই কম। অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির চালানো ২০০০ এবং ২০১২ সালের জরিপে দেখা গেছে, কয়েক লাখ পোস্টাল ভোটের মধ্যে জালিয়াতি হয়েছে ৪৯১টি ভোটের ক্ষেত্রে।
ভোট শেষ হলেও আইনি লড়াই শেষ হবে না!
মার্কিন প্রভাবশালী পত্রিকা নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে, ২০০০ সালে এক ফ্লোরিডা রাজ্যের ভোট গণনা নিয়ে সমস্যা দেখা দেওয়ায় আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে ফ্লোরিডা নিয়ে আদালতে চ্যালেঞ্জ হতে পারে। এবার একটা মামলা নয়, বহু মামলা হতে পারে। এবার ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমনকি তিনিও নির্বাচনে কারচুপির আশঙ্কা করছেন। ইতিমধ্যে ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারণা বিভাগ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, ডেমোক্র্যাটরা ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ জানাতে আইনজীবীদের প্রস্তুত করছেন। এমনকি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি আগেই নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করেন কিংবা তার শক্ত অবস্থানগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পাঠান তাহলে কী করতে হবে সেই পরিকল্পনাও করছেন। অন্যদিকে ডাকযোগে ভোট গণনা করতে সপ্তাহ কিংবা মাসও লেগে যেতে পারে। নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ল এর প্রফেসর রিচার্ড এইচ পিলডেস বলেন, কিছু রাজ্যে হয়তো ব্যালট গণনা করতে সপ্তাহ পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। এটা একটা সংকট সৃষ্টি করবে। তিনি বলেন, কেউ হয়তো ভোটের দিন এগিয়ে থাকতে পারেন, কিন্তু এরপর হেরে যেতে পারেন। এতে সন্দেহ বাড়বে, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব সৃষ্টি হবে এবং নির্বাচনে কারচুপির আশঙ্কা বাড়বে। তাই অবস্থা যে বিস্ফোরক হবে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
