মহিলা অঙ্গন প্রতিবেদক
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটি ও ঢাকা মহানগর কমিটির যৌথ উদ্যোগে অনলাইনে সিডও দিবসের আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে দুইটি ধারার সংরক্ষণ তুলে নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। বলা হয়, সরকার যেসব নারীবান্ধব কর্মসূচি গ্রহণ করেছে তার সঙ্গে সিডও সনদের পূর্ণ অনুমোদন না দিলে সেগুলোর সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হবে না। উক্ত অনুষ্ঠানে অতিথি আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউএন উইমেন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম এনালিস্ট সোহেল রানা, প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন, প্রতিবন্ধী নারীদের প্রতিনিধি নাজমা আরা বেগম পপি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম।
১৯৮৪ সালে ৬ নভেম্বর চারটি ধারায় সংরক্ষণ আরোপ করে বাংলাদেশ সরকার সিডও সনদ অনুমোদনের মাধ্যমে এর বাস্তবায়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়। পরবর্তী সময়ে এদেশের নারী আন্দোলনের প্রবল দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ধারা ১৩(ক) এবং ১৬.১(চ) থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার করা হলেও ধারা ২ এবং ১৬ দশমিক ১(গ) থেকে এখনো সংরক্ষণ প্রত্যাহার করা হয়নি। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ২ নম্বর ধারা সিডও সনদের প্রাণ বলে এবং ১৬ দশমিক ১(গ) নারীর জীবনের সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবকের সঙ্গে সম্পৃক্ত, অর্থাত্ বিয়ে সম্পর্কিত নারীর ব্যক্তিগত জীবন। ২ নম্বর ধারায় বৈষম্য বিলোপ করে নারী ও পুরুষের মধ্যে সমতা স্থাপনের নীতিমালা গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে। দেশের সংবিধান এবং আইনকানুনে এ সমতার নীতিমালা অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রের সব পর্যায় থেকে নারীর প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন রোধ করা এবং নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আইন, রীতিনীতি, আচার-ব্যবহার নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে।
দশকের পর দশক ধরে নারী আন্দোলনের লাগাতার প্রচেষ্টার পর বিশ্বসমাজ নারীর প্রতি সহিংসতাকে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ব্যক্তিগত বিষয় নয় বলে স্বীকার করে নেয়। ১৯৯৩ সালে ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত মানবাধিকারবিষয়ক সম্মেলনে বিশ্ব নারী আন্দোলন অর্জন করল যুগান্তকারী স্লোগান ‘নারীর অধিকার মানবাধিকার’ আর ‘নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা মানবতার বিরুদ্ধে সহিংসতা।’ একই বছর ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ‘নারী নির্যাতনবিষয়ক ঘোষণা’র মাধ্যমে নারীর মানবাধিকার রক্ষা ও অর্জনের লক্ষ্যে গ্রহণ করে এক বৈশ্বিক পদক্ষেপ। ১৯৯২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নারীর প্রতি বিরাজমান সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ-সিডও সংক্রান্ত ১৯ নম্বর সাধারণ সুপারিশে বলা হয়েছিল যে নারীর প্রতি বৈষম্য, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং নারীর মানবাধিকার লঙ্ঘন পরস্পর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত। দেশে দেশে সহিংসতার মাত্রা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত ৩৫ নম্বর সুপারিশে নারীর প্রতি সহিংসতাকে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এই সুপারিশে সহিংসতা প্রতিরোধে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। সিডও সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশও নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে দায়বদ্ধ।
নারীর মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট বেসরকারি সংগঠনসমূহের যৌথ উদ্যোগে সরকারের সাময়িক প্রতিবেদনের পাশাপাশি বিকল্প/ছায়া প্রতিবেদন জমা দেওয়া অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ বাংলাদেশ ৫৩টি বেসরকারি নারী ও মানবাধিকার সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত সম্মিলিত প্ল্যাটফরম ‘সিটিজেনস ইনিশিয়েটিভস অন সিডও’ ২০১৫ সালে অষ্টম সরকারি প্রতিবেদনের সম্পূরক হিসেবে একটি ছায়া প্রতিবেদন সিডও কমিটিতে জমা দিয়েছে। বাংলাদেশের নারী আন্দোলন সিডও সনদের ২ ও ১৬.১ (গ) ধারা থেকে সরকারের সংরক্ষণ প্রত্যাহার এবং সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবিতে সোচ্চার রয়েছে।
কোভিড-১৯ মহামারিতে সারা বিশ্ব বিপর্যস্ত। বাংলাদেশেও এই মহামারির সংক্রমণ আশঙ্কাজনক। মহিলা পরিষদ কর্তৃক সংগৃহীত ১৩টি দৈনিক পত্রিকার পরিসংখ্যান এবং বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, কোভিডকালীন এই মহামারির সময়ে নারী ও কন্যার প্রতি সহিংসতা অন্য সময়ের তুলনায় উদ্বেগজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। শারীরিক, মানসিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, স্বামীর দ্বারা স্ত্রী হত্যার মতো পারিবারিক সহিংসতার নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটে যাচ্ছে নির্বিচারে। বাল্যবিবাহ, নারী পাচারও থেমে নেই। এসব ঘটনার পিছনে কাজ করে প্রাচীন সনাতন দৃষ্টিভঙ্গি, নারীকে দমন করে রাখা, নারীকে অধস্তন ও পণ্য হিসেবে দেখার মানসিকতা। এই মৌলিক জায়গাটিতে পরিবর্তন না এলে নারীর অধিকার, মর্যাদার বিষয়টি আরো বহুদিন থেকে যাবে অমীমাংসিত। পরিবর্তন আনতে হলে চাই নতুন আইন, প্রচলিত আইনের সংস্কার, আইন-নীতিমালার সঠিক প্রয়োগ, ন্যায্য বিচার, সমাজের নেতিবাচক মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা। প্রায় তিন দশকের অধিক সময় ধরে বাংলাদেশের নারী আন্দোলন ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সিডও সনদকে নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগানোর জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সিডও কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী বৈষম্যমূলক পারিবারিক আইন পরিবর্তন করে সব ধর্মের মানুষের জন্য অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়নে সরকারের উদ্যোগ জরুরি। কারণ, নারীর প্রতি বৈষম্য আর সহিংসতাকে সামাজিক বৈধতা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অনেকাংশে কাজ করে বৈষম্যমূলক পারিবারিক আইন। সিডও সনদের দুই এবং ১৬.১ এর গ ধারা থেকে সরকারের সংরক্ষণ প্রত্যাহার, অনুমোদিত ধারা সমূহের বাস্তবায়নসহ সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সম্ভব এ দেশের নারী ও কন্যার জীবন থেকে সব ধরনের বৈষম্যের অবসান।
বাংলাদেশ সরকার গত ১৪ এপ্রিল ২০১৫ তারিখে সিডও
কমিটির কাছে অষ্টম সাময়িক প্রতিবেদন পেশ করেছে। সিডও
কমিটি ২০১১ সালে বাংলাদেশ সরকারকে যে সমাপনী অভিমত
প্রদান করেছিল অষ্টম সাময়িক প্রতিবেদনে সেই অভিমত
সম্পর্কেই তথ্য দেওয়া হয়েছে। যেমন—
g সনদের দুটি ধারায় বাংলাদেশ সরকারের সংরক্ষণ বহাল রাখার বিষয়ে কমিটি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং এ ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য সুপারিশ করেছে।
g বৈষম্যমূলক ব্যক্তিগত আইন পর্যালোচনা ও সংশোধন করে বিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদ, ভরণপোষণ, সন্তানের অভিভাবকত্ব, দত্তক এবং উত্তরাধিকার বিষয়ে সমান অধিকার দিয়ে একটি সার্বজনীন পারিবারিক আইন প্রণয়নের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
g নারীর অগ্রগতির পথে সবচাইতে বড় প্রতিবন্ধকতা প্রচলিত গত্বাঁধা ধারণা ও নেতিবাচক চর্চা। এ বিষয়ে সিডও কমিটি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং এসব ধারণা ও চর্চা পরিবর্তনে আইন-নীতিমালা প্রণয়নসহ সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের সুপারিশ করেছে।
g রাজনীতি ও জনজীবনে নারীদের সীমিত অংশগ্রহণ বিষয়ে সিডও কমিটি অভিমত ব্যক্ত করেছে এবং জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের সুপারিশ করেছে।
g বেসরকারি ক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্যসহ নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণে রাষ্ট্রের দায়িত্ব বৃদ্ধির জন্য সিডও কমিটি সুপারিশ করেছে।
g কমিটি অনতিবিলম্বে দেশের আইনে সিডও সনদের ধারাসমূহ অন্তর্ভুক্ত করার জন্য জোর সুপারিশ করেছে।
g বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহসহ অন্যান্য সামাজিক রীতিনীতি যা নারী এবং কন্যাদের প্রতিনিয়ত পেছনে টেনে রাখে সেসব রীতিনীতি দূর করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
