করোনা মহামারিতে বর্তমান বিশ্বের সবকিছুই খুব দ্রুত পালটে যাচ্ছে। সবাই এই দ্রুত পরিবর্তন সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। আমাদের দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় অনলাইন ক্লাসই এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা কার্যক্ষম চালিয়ে নেওয়ার একমাত্র ভরসা। অনলাইন ক্লাস থেকে শিক্ষার্থীরা আসলে কতটুকু শিখতে পারছে, করোনায় তাদের শিক্ষাজীবনে এর প্রভাব কতটুকু পড়তে যাচ্ছে কিংবা প্রিয় ক্যাম্পাসকে তারা কতটা মিস করছে? জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন— তোফায়েল পাঠান শান্ত
অংকন বিশ্বাস
ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ
অনলাইন ক্লাস কখনই সাধারণ ক্লাসের বিকল্প হতে পারে না। তাই আউটপুট অনলাইন ক্লাসের মতো না হলেও শেখার অনেক কিছুই আছে। তাছাড়া আমাদের পড়াশোনার সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখছে অনলাইন ক্লাস যেটা অনেক দিন ক্লাস না থাকার ফলে বন্ধ ছিল।
শিক্ষাজীবনে করোনার মতো করে অন্য কিছু প্রভাব ফেলেছে কিনা, মনে পড়ছে না। সাধারণ শিক্ষাজীবন থেমে গেছে। অনলাইন ক্লাস নিউ নরমাল হয়ে যাচ্ছে। ঢাকার বাইরের ছাত্ররা অনলাইন মেটারিয়াল-নির্ভর পড়াশোনা চালাচ্ছে। তাছাড়া জীবন, পরিবার, বন্ধুবান্ধব কতটা মূল্যবান—সেটা করোনা নতুন করে শিখিয়ে দিচ্ছে। প্রিয় ক্যাম্পাসের কোন জিনিসগুলো মিস করছি—বলতে গেলে একদম সবকিছুই। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সময় কাটানো, টিএসসির চা, বাহাদুরশাহ পার্কের আড্ডা এমনকি ক্লাস করাও মিস করছি।
নাবীউল হাসান
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
অনলাইন ক্লাসে থিওরিটিক্যাল কোর্সগুলোতে তেমন একটা সমস্যা না হলেও প্রাক্টিক্যাল কোর্সগুলো একটু সমস্যা হচ্ছে। যখন আমাদের শিক্ষকরা খুব ভালো পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে আমাদের ক্লাস করাচ্ছেন, তখন ভালো আউটপুট পাওয়া যাচ্ছে।
করোনা আমাদের শিক্ষাজীবনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, আমরা অনলাইনে ক্লাস করছি স্রেফ ক্লাস করার তাগিদে। যেহেতু আমাদের পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ থাকছে না, সেহেতু আমাদের একাডেমিক পড়ার আগ্রহ ও কমে গিয়েছে। তবে একটা ভালো দিক হচ্ছে—শিক্ষার্থীরা প্রচুর বাইরের বই পড়ছে, যেটা প্রয়োজনীয়। আর যদি বলতে হয় ক্যাম্পাসের যে জিনিসগুলো মিস করছি তা হলে বলবো—আমার ক্লাসরুমটাকেই সবচেয়ে বেশি মিস করছি, যেখানে বসে সহপাঠীর সঙ্গে ক্লাসে ফাঁকে আড্ডা কিংবা শিক্ষকদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করতাম।
তাসনিয়া হোসাইন পূর্ণা
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
সত্যি কথা ক্লাসে বসে একজন টিচার যেভাবে পড়ান অনলাইনে সেভাবে ক্লাস নেওয়া সম্ভব হয় না। তাই আগে আমরা কোনো বিষয় যেভাবে শিখতে বা বুঝতে পারতাম, অনলাইন ক্লাসে তা হচ্ছে না। তাছাড়া আমার অনেক বন্ধুই প্রয়োজনীয় ডিভাইস বা ইন্টারনেট সুবিধার অভাবে ক্লাস অনলাইন ক্লাস থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছে না। তারা এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে পড়েছে। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই করোনা আমাদের শিক্ষাজীবনে অনেক ক্ষতিকর প্রভাবই নিয়ে এসেছে। প্রথমত, অর্থনৈতিকভাবে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্লাস করার ব্যাপারটি নিয়ে মারাত্মক বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ক্লাসপরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়ার কারণে সেশনজটের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
আমরা প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা মাত্র আড়াই মাস ক্যাম্পাসে ক্লাস করতে পেরেছি। এর মধ্যে নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় ও বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। মূলত তাদের খুবই মিস করি। তাছাড়া রেগুলার ক্লাস করা, ক্যাম্পাসে আড্ডা দেওয়া কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়া সবকিছুর কথাই অনেক মনে পড়ে।
মুসাররাত তাসমিয়া রহীম
ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ
আমাদের ডিপার্টমেন্টে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম সুবিধা নেই। তাই শিক্ষকরা কেবলই মৌখিক লেকচার দিতেন এবং আমরা নোট করতাম। কিন্তু বর্তমানে অনলাইন ক্লাসের সুবাদে, আমাদের শিক্ষকগণ বিভিন্ন ডকুমেন্টারি, স্লাইড শেয়ার ইত্যাদির মাধ্যমে অনেক প্রাণবন্ত ক্লাস নেন। তাছাড়া ক্লাস রের্কডেড থাকায় কেউ মিস করলে পরবর্তী সময়ে তা দেখে নিতে পারছে।
করোনার প্রভাবে আমাদের শিক্ষাজীবনে একাডেমিক ক্ষতি অপূরণীয়। এছাড়া বর্তমানে সকলে পড়াশোনা করে চাকরির জন্য। চাকরির নিয়োগ বন্ধ থাকায় পড়াশোনার আগ্রহ অনেকেই হারিয়ে ফেলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামের স্টেজ আর ক্যাম্পাসের বাস খুব মিস করছি। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন, ক্লাসের মধ্যে খুনশুটি, বাসের আড্ডা, চিত্কার করে গানগাইতে গাইতে বাড়ি ফেরা এগুলো খুবই মিস করছি।
ইকবাল হাসান
ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ
অনলাইন ক্লাস থেকে আমাদের যতটুকু শেখার কথা বা আউটপুট পাওয়ার কথা দুর্বল নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা এবং ডিভাইসের অপর্যাপ্ততা কারণে তা পাওয়া যাচ্ছে না। সবকিছু মিলিয়ে শিক্ষার্থীরা অনলাইনে ক্লাসে সেভাবে মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না। কিন্তু একদম পড়াশোনা থেকে দূরে থাকার চেয়ে বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে অনলাইন ক্লাস অবশ্যই ভালো।
এদিকে আমাদের সেশনজট বাড়ছে। আমাদের কোর্সের মেয়াদ বাড়ছে। যেসময় শেষ হয়ে যাওয়ার কথা তার থেকে অনেক বেশি সময় লেগে যাবে যা পরবর্তী জীবনে আমাদেরকে অনেকভাবে প্রভাবিত করবে। প্রিয় ক্যাম্পাসের কোন জিনিস গুলো মিস করছি এইটা বলতে গেলে অবশ্যই বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা, দেখাসাক্ষাত্, আর অন ক্যাম্পাস ক্লাসগুলোও খুব মিস করছি।
সানজিদা আদিবা
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
যে কয়েক দিন ধরে অনলাইন ক্লাস করছি তাতেই বোঝা যাচ্ছে— এটি কখনো ক্যাম্পাসের ক্লাসের পরিপূরক হতে পারে না। কারণ অনলাইন ক্লাসে পুরাটা সময় একাগ্রতা ধরে রাখাটা খুবই কঠিন। তবে অনলাইন ক্লাস থেকেও অনেক কিছু শেখার আছে। অনলাইন থেকে আমাদের যতটুকু আউটপুট নেওয়া সম্ভব আমরা তা নিতে পারছি। ফলে অন্ততপক্ষে পিছিয়ে পড়া থেকে কিছুটা হলেও রেহায় মিলছে আমাদের। আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি করোনা আমাদের শিক্ষাজীবনের গতিকে একদম থামিয়ে দিয়েছে। যত দ্রুত পারা যায় আমাদের শিক্ষাজীবনের গতি ফিরিয়ে আনতে হবে। গত চার-পাঁচ মাস ধরে স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি বন্ধ। যার কারণে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে যাচ্ছে এবং তৈরি হচ্ছে সেশনজট।
দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় প্রতিদিন লাল বাসে চড়ে ক্যাম্পাসে যাওয়া থেকে শুরু করে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা সবকিছু খুব মিস করছি। এছাড়া ক্যাম্পাসে ক্লাস করা, ঘুরে বেড়ানো, টিএসসিতে খাওয়া সবকিছুই বেশ মনে পড়ে।
