নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা অ্যাপারেলসকে গত কয়েক বছর ধরেই ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে ক্রয়াদেশ দিত ফ্রান্সের একটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান। এবার ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ডিসেম্বরে ক্রয়াদেশ দেয়নি। ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে ফতুল্লা অ্যাপারেলসের মালিক এবং তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সহ-সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জানান, সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন ঘিরে কোনো সহিংসতা হয় কিনা— এমন অনিশ্চয়তা থেকে ওই সময় ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়নি। তবে নির্বাচনের পর দেশে স্বাভাবিক পরিস্থিতি থাকায় ওই প্রতিষ্ঠান আমাদের সঙ্গে আলোচনা করছে। আশা করছি, শিগগিরই এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক ক্রয়াদেশ পাব।
শুধু ফতুল্লা অ্যাপারেলসই নয়, এমন আরও বেশকিছু রপ্তানিকারকের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, নির্বাচনের পর বিদেশি ক্রেতারা ক্রয়াদেশ বাড়ানোর বিষয়ে তাদের ইতিবাচক মনোভাবের কথা জানিয়েছে। দেশব্যাপী তেমন কোনো সংঘাত-সহিংসতা না হওয়া ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করায় ক্রেতাদের আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়নি।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের আগে ও পরে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন ও টানা সহিংসতায় জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ওই সময় দেশের রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়। ওই অভিজ্ঞতার কারণে এবার নির্বাচনের আগে কিছুটা সতর্ক অবস্থানে ছিলেন বিদেশি ক্রেতারা।
ক্রেতাদের অনিশ্চয়তার বিষয়টি গত ডিসেম্বরের রপ্তানির চিত্রেও দেখা যায়। সে সময় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রপ্তানি কমে ১২ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার বা প্রায় সাড়ে তিন শতাংশের মতো। এর আগের পাঁচ মাস জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল সোয়া ১৭ শতাংশ। ডিসেম্বরে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ২ দশমিক ১৮ শতাংশে।
ফজলে শামীম এহসান বলেন, নির্বাচন ঘিরে ক্রেতাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ছিল। সেটি এখন কেটে গেছে বলে মনে হচ্ছে। ইতোমধ্যে ক্রেতাদের সাড়া পাচ্ছি। আগামীতে রপ্তানি বাড়বে বলেই আমাদের প্রত্যাশা ।
বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপ করেও এমন আভাস পাওয়া যাচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুক্তরাজ্যের নামকরা একটি ব্র্যান্ডের ঢাকা অফিসের প্রধান ইত্তেফাককে বলেন, বাংলাদেশে আমাদের ব্যবসা বাড়ছে। আগামীতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে। অন্য ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলেছি। ব্যবসা বাড়ানোর বিষয়ে তারাও ইতিবাচক।
অর্থনীতিবিদরাও মনে করছেন, স্বস্তির পরিবেশ বিরাজ করলে আমদানি, রপ্তানি, বিনিয়োগ তথা সার্বিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোও আগামীতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির বিষয়ে ইতিবাচক ধারণা দিচ্ছে। গত সোমবার প্রকাশিত যুক্তরাজ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক পরামর্শ কেন্দ্র সেন্টার ফর ইকোনমিক্স অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক লিগ টেবিল (ডব্লিওইএলটি)’ এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গতবারের চাইতে এবার বৃহত্ অর্থনীতির দেশের তালিকায় বাংলাদেশ দুই ধাপ এগিয়ে ৪১-এ উঠে এসেছে। ২০৩৩ সাল নাগাদ বাংলাদেশ বিশ্বের ২৫তম বৃহত্ অর্থনীতির দেশ হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়। তৈরি পোশাক রপ্তানি, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, দেশীয় ও সরকারি ব্যয়ে বাংলাদেশ ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সিনিয়র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, নির্বাচন ঘিরে ক্রেতাদের মধ্যে শঙ্কা ছিল। যেহেতু পুরনো সরকারই দায়িত্বে এসেছে— ফলে স্বস্তির ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। অবশ্য সম্প্রতি গার্মেন্টস খাতের অস্থিরতায় দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাপারেল ফেডারেশনের পক্ষ থেকে তাদের উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ইত্তেফাককে বলেন, নির্বাচন পরবর্তীতে বিদেশি ক্রেতাদের অনিশ্চয়তা কেটে গেছে। কিন্তু শ্রমিকদের আন্দোলন রপ্তানি খাত তথা অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
