চুরি-দুর্নীতি ও অন্যায়-অনিয়ম পৃথিবীর কোন দেশে নাই—এমন প্রশ্নের জওয়াব দেওয়া সহজ নহে। আমাদের দেশে কোন খাতে এইরূপ চৌর্যবৃত্তি নাই তাহা প্রমাণ করা আরো কঠিন। এই চুরি ও অনিয়ম আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পৌঁছাইয়া গিয়াছে। একশ্রেণির মানুষের ইহাই যেন মজ্জাগত হইয়া গিয়াছে। করোনা মহামারির শুরুতে সরকার গরিব-দুঃখী ও অসহায় মানুষের জন্য ত্রাণসামগ্রী বিতরণের উদ্যোগ নেয়। এই সামান্য ত্রাণ লইয়া যেই সকল কাণ্ডকারখানা ঘটিয়াছে, তাহা এখনো মানুষের মুখে মুখে ফিরিতেছে। এই সময় করোনাকে ছাপাইয়া ‘চাউলচোর’ আলোচনার পাদপীঠে চলিয়া আসে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ত্রাণের চাউল চুরির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলেন। মাঠে নামে মোবাইল কোর্ট, পুলিশ ও র্যাব। এই সময় সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় ভিজিএফ-ভিজিডি, ওএমএস, ১০ টাকার চাউল এবং হতদরিদ্র মানুষের জন্য ত্রাণসহায়তা—এই তিনটি ক্ষেত্রেই অনিয়ম ও চুরির অভিযোগ উঠে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযানের মাধ্যমে হাজার হাজার বস্তা চাউল উদ্ধার করে। এই জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে দায়ী করা হয় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা তথা চেয়ারম্যান-মেম্বারদের; কিন্তু সরকারি প্রশাসনের কর্মকর্তাগণও যে ইহার সহিত জড়িত থাকেন বা থাকিতে পারেন, তাহা তেমন আলোচনায় আসে না। এইবার এই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এমন একটি অভিনব চাউল চুরির ঘটনা ঘটিয়াছে, যাহাতে আমাদের চক্ষু চড়কগাছ হইবার জোগাড় হইয়াছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারি গুদাম হইতে চাউল চুরির একটি ভিডিও ফুটেজ ভাইরাল হইয়াছে। তাহাতে দেখা গিয়াছে, বরগুনার আমতলী খাদ্যগুদামের বস্তা হইতে ভারপ্রাপ্ত খাদ্যগুদাম কর্মকর্তা ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের লইয়া পাইপ দিয়া চাউল চুরি করিতেছেন। প্রতি বস্তা হইতে তিন-চার কেজি চাউল সরাইয়া লইতেছেন তাহারা। এই অভিযোগ উঠিবার পর খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সেই গুদাম পরিদর্শন করিয়া তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করিয়াছেন। অবশ্য অভিযুক্ত ব্যক্তি বলিবার চেষ্টা করিতেছেন যে, ভাইরাল হওয়া ভিডিও ফুটেজ তাহার গুদামের নহে। তাহাকে ফাঁসানোর জন্য একটি চক্র এমন অভিযোগ দায়ের করিয়াছে। অভিযোগ ও পালটা অভিযোগ—যাহাই থাকুক না কেন, প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে এই প্রকারের ঘটনা অহরহই ঘটিতেছে। দেশের জেলা-উপজেলায় সরকারি খাদ্যগুদামের দায়িত্বে যাহারা রহিয়াছেন, তাহাদের সকলের সম্পর্কে ঢালাওভাবে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন নহে। তবে তাহাদের ভাবমূর্তি খুব উজ্জ্বল—এমনটি বলিবার অবকাশ নাই। আবার সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি, বিভিন্ন ব্যাংক জালিয়াতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা চুরি বা বিদেশে অর্থপাচারের যেই সকল ঘটনা ঘটিয়াছে, সেই তুলনায় এই চাউল চুরির ঘটনা তুচ্ছ বলিলে অত্যুক্তি হয় না।
দুর্নীতির ব্যাপকতা সবচাইতে অধিক—এমন দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তানের পরই রহিয়াছে বাংলাদেশের অবস্থান। এমতাবস্থায় যেইভাবে আমাদের সমাজে চৌর্যবৃত্তি প্রতিষ্ঠিত হইয়া যাইতেছে, তাহাতে আমরা আতঙ্কিত না হইয়া পারি না। ফরাসি দার্শনিক আলথুসার বলিয়াছেন, একটি রাষ্ট্রে রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বৃত্তায়ন একে অপরের সহিত সম্পর্কিত। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্তরে ও মাত্রায় যে দুর্বৃত্তায়ন আমরা দেখি তাহাও পরস্পরের সহিত সম্পর্কিত। বাংলাদেশে প্রতি পরতে পরতে বিরাজমান এই চুরি বন্ধ হইবে কীভাবে এবং কোন ঔষধে? আমাদের সামাজিক ও মানসিক চিন্তাভাবনার পরিবর্তন ছাড়া এই মহামারি কি দূর করা সম্ভব?
