ছড়া সম্রাট সুকুমার রায়

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২০:০৬

সুকুমার রায়ের নাম শোনেননি—এমন বাঙালি খুব কমই মিলবে। ছড়াসাহিত্যের বরপুত্র ও পথিকৃত্ তিনি। তিনি মুকুটহীন সম্রাটও। বাবা বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। মা বিধুমতি। বাবা-মা দুজনেই ছিলেন সৃজনশীল। ছবি তোলা ও মুদ্রণকাজে এ পরিবারের ভূমিকা আজও উজ্জ্বল।

১৮৮৭ সালে সুকুমার রায় তদানীন্তন ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার মসুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পড়াশোনায় স্কুল ও কলেজের সীমানা অতিক্রম করেন কলকাতা থেকেই। পরবর্তী সময়ে রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানে ডাবল অনার্স নিয়ে বিএসসি পাশ করেন। পাশ করার পাঁচ বছরের মধ্যে ১৯১১ সালে মুদ্রণশিল্পে উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডনে যান।

শিবনাথ শাস্ত্রীর ‘মুকুল’ পত্রিকায় তাঁর প্রথম লেখা ছাপা হয়। লন্ডনে থাকাকালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ওপর একটি স্বরচিত প্রবন্ধ ‘দ্য স্পিরিট অব রবীন্দ্রনাথ’ পাঠ করে অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। হাস্যরসের সাহিত্যে তিনি এখনো অদ্বিতীয়। এমন হাস্যরসাত্মক রচনা তাঁর দুর্লভ গুণেরই পরিচয় বহন করে। তাঁর ছড়ায় আছে ‘গালভরা হাসিমুখে চালভাজা মুড়ি, ঝুরঝুরে পড়ো ঘরে থুরথুরে বুড়ি।’

সেই হাসিতে মানা আবার ‘রামগরুড়ের ছানা’ ছড়ায়। যেমন—

‘রামগরুড়ের ছানা         হাসতে তাদের মানা

           হাসির কথা শুনলে বলে,

           হাসব না-না, না-না!’

ছড়াসাহিত্যে ব্যঙ্গ ও রঙ্গরসে তাঁর অভিনবত্বের জুড়ি মেলা ভার। যেমন—তাঁর ‘সত্পাত্র’, ‘গোঁফচুরি’, ‘কাঠবুড়ো’, ‘গানের গুঁতো’, ‘ছায়াবাজি’, ‘হাতুড়ে’, ‘অবাক কাণ্ড’, ‘কিম্ভূত’, ‘কাঁদুনে’ এসব ছড়ার দিকে নজর দিলেই  তা স্পষ্ট হয়।

এ হাস্য ও ব্যঙ্গরস ছাড়াও তাঁর ছড়ায় বুদ্ধিদীপ্ত রসও কম নেই। তাঁর ‘নোট বই’ ছড়া—‘ভালো কথা শুনি যেই ছটফট লিখি তায়/ ফড়িংয়ের ক’টা ঠ্যাং, আরশোলা কি কি খায়।’ কিংবা ‘ভয় পেয়োনা’, ‘আড়ি’, ‘খাইখাই’, ‘পাকাপাকি’, ‘দাঁড়ের কবিতা’, ‘দাঁড়ে দাঁড়ে দ্রুম’, ‘একুশে আইন’, ‘বোম্বাগড়ের রাজা’, ‘শব্দকল্পদ্রুম’, ‘বুঝিয়ে বলা’, ‘খিচুড়ি’, ‘ন্যাড়া বেলতলায় যায় ক’বার’, ‘ভাল রে ভাল’ ইত্যাদি ছড়া পড়লেই বোঝা যায়।

‘বাবুরাম সাপুড়ে’ ছড়াটি পাঠ্যবইয়ের কল্যাণে সকলের কাছে পরিচিত। ‘বাবুরাম সাপুড়ে, কোথা যাস বাপুরে’—এ ছড়া এমন কোনো বাঙালি খুঁজে পাওয়া যাবে না যার মুখে মুখে ফেরেনি। তাঁর এমন শিশুপ্রিয় ছড়ার মধ্যে ‘সত্পাত্র’, ‘রামগরুড়ের ছানা’, ‘ভালরে ভাল’, ‘গল্প বলা’, ‘ভয় পেয়োনা’, ‘পাকাপাকি’, ‘শব্দকল্পদ্রুম’, ‘অবাক কাণ্ড’, ‘গোঁফচুরি’, ‘আবোল তাবোল’ এসব দিয়ে তো আবৃত্তিশিল্পীদের হাতেখড়ি হয়। তাঁর ‘খিচুড়ি’ ছড়ায় ‘মণ্ডুমাল’ শব্দের কসরত রয়েছে। যেমন : ‘হাঁস ছিল, সজারু, ব্যাকরণ মানিনা/ হয়ে গেল ‘হাঁসজারু’ কেমনে তা জানিনা।’ ‘বক কহে কচ্ছপে বাহ্বা কি ফূর্তি!/ অতি খাসা আমাদের বকচ্ছপ মূর্তি।’ এমন ধারণা বাংলা সাহিত্যে পূর্বেও যেমন ছিল না এখনো নেই বললেই চলে। রাজার প্রতি বিদ্রূপ সেই লোকছড়া থেকেই লক্ষ করা যায়। সুকুমার রায়ের তীক্ষ কলম তাতেও আঁচড় কেটেছে। যেমন—‘শিব ঠাকুরের আপন দেশে/ আইন কানুন সর্বনেশে।’ ‘বোম্বাগড়ের রাজা’ কিংবা ‘গন্ধবিচার’-এ খামখেয়ালি রাজার চরিত্র বর্ণনা রয়েছে।

‘খাই খাই’ নিয়ে রয়েছে মজার ছড়া। যেমন—

‘ব্যাঙ খায় ফরাসিরা (খেতে নয় মন্দ),/ বার্মার ‘ঙাম্পিতে’ বাপের কি গন্ধ!/ মাদ্রাজি ঝাল খেলে জ্বলে যায় কণ্ঠ/ জাপানেতে খায় নাকি ফড়িঙের ঘণ্ট!/ আরশুলা মুখে দিয়ে সুখে খায় চীনারা,/ কত কি যে খায় লোকে নাহি তার কিনারা’

তিনি শুধু ছড়াই নয়, মজার মজার গল্প, ‘অবাক জলপান’-এর মতো নাট্য একাঙ্কিকাও রচনা করে শিশুমন দীর্ঘদিন যাবত্ ভজিয়ে রেখেছেন।

বাবা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর পত্রিকা ‘সন্দেশ’ ১৯১৫ থেকে ১৯২৩—আমৃত্যু সম্পাদনা করেছেন। তাঁর হাত ধরে ছড়াসাহিত্য এবং শিশুসাহিত্য নতুন মাত্রা পেয়েছিল। ১৯২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুকে আঁচ করে শেষ মুহূর্তে তিনি ছড়ায় লিখেছিলেন—‘আদিম কালের চাঁদিম হিম/ তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম/ ঘনিয়ে এল ঘুমের ঘোর/ গানের পালা সাঙ্গ মোর।’

তবে তাঁর গানের পালা সাঙ্গ হলেও তিনি আজও অম্লান, অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছড়াসাহিত্য এবং শিশু মনোরাজ্যে।