ভাব ও অভাবের কবি শাহ আবদুল করিম

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২০:০৮

লালন-পরবর্তী সময়ে বাউলগানে শাহ আবদুল করিম এক কিংবদন্তির নাম। তাঁর হাত ধরে বাংলাভাষীর কাছে বাউলগানের যে অনন্য বিস্তার ঘটেছে, তা এককথায় অভাবনীয়। গ্রামীণ পরিমণ্ডল তো বটেই, শহুরে সংস্কৃতিতেও করিম এখন সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত এক নাম। তাঁর গান আর গানের দর্শন সব বয়সি মানুষের কাছে এখন পরম আশ্রয় হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। মূলত বাঙালির ভাবচর্চায় করিমের গানের নিজস্বতা বিশিষ্টতার দাবি রাখে।

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ধলআশ্রম নামের যে গ্রামে শাহ আবদুল করিমের জন্ম হয়েছিল, সেটা তখন তো বটেই, এখনো অনুন্নত এক জনপদ। ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এক দরিদ্র কৃষকের ঘরে তিনি জন্ম নিয়েছিলেন। ধলআশ্রম গ্রাম এবং এর আশপাশে তখনো আধুনিক সভ্যতার বিকাশ ঘটেনি। ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর করিমের মৃত্যুর আগপর্যন্ত ওই অঞ্চলে যে আধুনিকতার খুব বিকাশ ঘটেছিল, তা-ও কিন্তু নয়। অথচ এমন এক পরিবেশেই করিম বেড়ে উঠেছেন একজন আধুনিক মনস্ক, প্রগতিশীল ও মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে। অন্তত করিমের গণসংগীত পর্যায়ের গানগুলো সে প্রমাণই দেয়।

পর্যায়গত বিবেচনায় শাহ আবদুল করিম নানা আঙ্গিকের গান রচনা করেছেন। তাঁর রচিত বিচ্ছেদ, সারি, ধামাইল, আঞ্চলিক, গণসংগীত যেমন রয়েছে; তেমনি আছে নিগূঢ়তত্ত্ব, কামতত্ত্ব, পারঘাটাতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, সৃষ্টিতত্ত্ব, মনঃশিক্ষা ও পরমতত্ত্বের গানও। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা ও প্রখ্যাত শিল্পী মৌসুমী ভৌমিকের পর্যবেক্ষণ যথার্থই। মৌসুমীর মতে, ভাব ও অভাবের গান—দুটোতেই করিমের নিজস্ব দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন লক্ষণীয়। শাহ আবদুল করিম যে জনপদে বেড়ে উঠেছেন, সে ভূমিও কিন্তু ‘ভাব ও অভাব’-কে ধারণ করে রয়েছে। করিম কেবল সে ভূমির রস, সার আর নির্যাসটুকু তাঁর রচনায় সহজ-সরল-প্রাঞ্জল করে ঠাঁই দিয়েছেন। তাই তো তাঁর গান আর কেবল শিল্পীর কণ্ঠ এবং প্রকাশিত বইয়ের পৃষ্ঠায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, এসব গান বাঙালির নিজস্ব দর্শন-চর্চার উপাদান হিসেবেই এখন বিবেচিত হচ্ছে।

 

শাহ আবদুল করিমের অসংখ্য গানে চিরায়ত ভাবচর্চার দৃষ্টিভঙ্গি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেখা যায়। তাঁর তত্ত্বাশ্রিত গানগুলোতে মৃত্যুচিন্তা, জীবন ও জগত্-রহস্য এবং নিজেকে জানার যে নিরন্তর প্রচেষ্টা—সেটা ভালোভাবেই উপস্থাপিত হয়েছে। কখনো রূপকভাবে আবার কখনো সরাসরি তিনি নিগূঢ়তত্ত্বের বিষয়গুলো তাঁর গানে উল্লেখ করেছেন। মানবজীবনের চিরায়ত জন্ম ও মৃত্যুরহস্য কিংবা বাউল-মতবাদের গুহ্য বিষয়গুলোও তাঁর গানে এসেছে। করিম অনবরত নিজেকে জানতে চেয়েছেন, নিরন্তর জানতে চেষ্টা করেছেন সমাজের অপরাপর জনগোষ্ঠীর সুখ-দুঃখের কথাও। ব্যক্তির চেয়ে সমষ্টিই তাঁর গানে প্রাধান্য পেয়েছে বেশি। এরচেয়েও বড়ো বিষয়, বার বার তিনি মানুষের কথাই গানে বলতে চেয়েছেন। তাঁর লেখা গানে যেমন এর প্রমাণ মেলে, তেমনি করিমের কথাবার্তা থেকেও এর উদাহরণ অহরহ দেওয়া সম্ভব। এক সাক্ষাত্কারে করিমকে বলতে দেখা গেছে, ‘মানুষের মাঝেই ঈশ্বর বিরাজমান। মানুষের সেবা করা মানে ঈশ্বরের সেবা করা। এটাই সত্যি, এটাই বাস্তব কথা।’

করিমের প্রগতিশীলতা, মুক্তবুদ্ধিচিন্তা আর অসাম্প্রদায়িক চেতনা কিন্তু মার্কস-লেলিন পাঠ করে তৈরি হয়নি। তিনি তাঁর আশপাশ, পরিবেশ আর প্রতিবেশ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাকে নিজের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে জমা করে দিনে দিনে তৈরি হয়েছেন, তাঁর চিন্তা ও চেতনার পরিধিকে করেছেন বিস্তৃত। জীবনের রঙ্গমঞ্চে নানা অভিজ্ঞতার সঞ্চয়ের নির্যাস থেকেই উচ্চারণ করেছেন—‘সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদ সামন্তবাদ মিলে/ দেশের সম্পদ লুটে নিল তিন ডাকাতের দলে’ কিংবা—‘বড় শয়তান সাম্রাজ্যবাদ নতুন নতুন ফন্দি আঁটে/ মধ্যম শয়তান পুঁজিবাদ বসে বসে মজা লোটে/ সামন্তবাদ জালিম বটে, দয়া নাই তাহার মনে’ এ রকম সমাজ-বিষয়ক চিন্তাচেতনার পাশাপাশি নিগূঢ় ও তত্ত্বাশ্রিত অসংখ্য পদও করিম রচনা করেছেন। রূপকের আশ্রয়ে মানবজীবনের চিরায়ত সত্যবাণী বলেছেন এভাবে—‘কোন মেস্তরি নাও বানাইল, কেমন দেখা যায়/ ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খি নায়/ চন্দ্র সূর্য বান্ধা আছে নায়েরই আগায়/ দুরবিনে দেখিয়া পথ মাঝি-মাল্লায় বায়/ রঙ-বেরঙের কত নৌকা ভবের তলায় আয়/ রঙ-বেরঙের সারি গাইয়া ভাটি বাইয়া যায়/ হারা-জিতার ছুবের বেলা কার পানে কে চায়/ মদন মাঝি বড় পাজি কত নাও ডুবায়/ বাউল আবদুল করিম বলে বুঝে উঠা দায়/ কোথা হতে আসে নৌকা কোথায় চলে যায়’

 

বাউল ও ফকিরি মতবাদ বৃহত্তর সিলেটসহ হাওরাঞ্চলে এককাতারে সযত্নে লালিত হয়েছে সাধক-শিষ্য-অনুসারীদের পরম্পরায়। হজরত শাহজালাল (রহ.) আর শ্রীচৈতন্য অনুসারীরা এখানে সুফি আর সহজিয়া চেতনার বিকাশ ঘটিয়েছেন। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, অসাম্প্রদায়িকতা আর অধ্যাত্মবোধ এ মাটির চিরায়ত বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশের অপরাপর অঞ্চলের চেয়ে এখানকার মানুষ একটু বেশিই ভাবুক আর চিন্তক। গান এ মাটিতে জন্মায় আপন শক্তিতে, ভাবের পরম্পরায়। সে পরম্পরা আর দর্শনের সার্থক উত্তরসূরি ছিলেন প্রয়াত সাধক শাহ আবদুল করিম। তাঁর গান, তাঁর চেতনা আর তাঁর পথচলা বাঙালির ভাবচর্চার বিকাশকেই সমৃদ্ধ করেছে, দিয়েছে নতুন মাত্রা।