অনুমতি গ্রহণে ইসলামের সৌন্দর্য

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২০:৩৭

অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা ও চিকিত্সার মতো মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের অন্যতম একটি হচ্ছে বাসস্থান। যেথায় মানুষ বিশ্রাম এবং নিরাপত্তার চাদরে আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে। সে বাসস্থানে কোনো ব্যক্তির আগমন ঘটা স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু আগন্তুকের জন্য ইসলাম সুনির্দিষ্ট কিছু নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। আমরা আজ ইসলামের দৃষ্টিতে কারো গৃহে প্রবেশের ক্ষেত্রে অনুমতি গ্রহণে ইসলামের সৌন্দর্য বিষয়ে জেনে নেব।

অনুমতি গ্রহণের মাধ্যম :কারো গৃহে বা চেম্বারে প্রবেশের ক্ষেত্রে কোরআন প্রধানত দুটি বিষয় নিশ্চিত করতে বলেছে। ১. অনুমতি চাওয়া ও ২. সালাম প্রদান করা। সালামের জবাব আসার পরে অনুমতি মিললে প্রবেশ করাই সৌন্দর্য। এরশাদ হয়েছে :হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্য গৃহে প্রবেশ করো না, যতক্ষণ না অনুমতি নাও এবং গৃহবাসীদের সালাম না করো। (সুরা আন-নুর :২৭)

১. নাম-পরিচয় উল্লেখ করা :আগন্তুকের সালাম ও অনুমতি চাওয়া আবশ্যক। কখনো কখনো আগন্তুকের কণ্ঠেই পরিচয় বুঝে তাকে অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু যদি আগন্তুককে গৃহবাসীর চিনতে অসুবিধা হয় তবে তাকে নাম, প্রয়োজনে পরিচয়ও প্রদান করতে হবে। তবে কে প্রশ্নে নাম প্রকাশ না করে ‘আমি’ ‘আমি’—এমন বলা অনুচিত। একদা উমর (রা) রাসুল (স)-এর কাছে এসে সালাম দিয়ে বললেন :উমর কি প্রবেশ করবে? (মুসনাদে আহমাদ:২৭৫৬)

২. কলিং বেল দেওয়া :বর্তমান সময়ে কোলাহলপূর্ণ জায়গায় বাসা-বাড়ি হলে সালামের আওয়াজ ঘরের ভেতরে না পৌঁছলে কলিং বেল দিতে হয়। তখন ভেতর থেকে পরিচয় জানতে চাইলে তা বলা আবশ্যক। সেই সঙ্গে দরজার সম্মুখ ভাগে না দাঁড়িয়ে পাশে দাঁড়ানো উচিত। আর জানালা বা দরোজা দিয়ে ভেতরে উঁকি দেওয়া ঘোর আপত্তিকর। কেননা ঘরের অধিবাসীদের অপ্রস্তুত অবস্থায় দেখাটা আগন্তুক ও গৃহবাসীর অপছন্দনীয়ও হতে পারে। একদা রাসুল (স)-এর হাতে একটি চিরুনি থাকা অবস্থায় এক লোক এসে দরজা দিয়ে উঁকি মারল। রাসুল (স) বললেন :আমি যদি জানতাম তুমি উঁকি মারবে, তাহলে এটা দিয়ে তোমার চোখে খোঁচা মারতাম। (বোখারি:৬২৪১)

৩. অনুমতি না পেলে ফিরে যাওয়া :কারো ঘরের সামনে এসে প্রথমে সালাম ও অনুমতি প্রার্থনা করবে। সাড়া না পেলে অপেক্ষা করে দ্বিতীয়বার, এরপর তৃতীয়বার অনুমতি চেয়েও ভেতর থেকে সাড়া না মিললে ফিরে যাবে। কারণ, ভেতরে অবস্থানরত ব্যক্তি নামাজ, গোসল, অসুস্থ কিংবা এমন কোনো অবস্থায় থাকতে পারেন, যেখানে কারো প্রবেশ তিনি সমীচীন মনে করেন না। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে:তোমরা যদি তাতে (ঘরে) কাউকে না পাও তবে যতক্ষণ না তোমাদেরকে অনুমতি দেয়া হয়, তত ক্ষণ তোমরা প্রবেশ করো না। আর যদি তোমাদেরকে বলা হয় যে, ফিরে যাও, তবে ফিরে যাও। এটিই তোমাদের জন্য উত্কৃষ্ট পন্থা। (২৪:২৮) তবে মনে রাখতে হবে যে, সাক্ষাত্প্রার্থীরও আপনার ওপর অধিকার রয়েছে। (বোখারি: ১৯৭৫)

৫. তিন সময়ে অনুমতি বাধ্যতামূলক :মাহরাম (যাদের পারস্পরিক বিবাহ হারাম) আত্মীয়দের সঙ্গে পর্দার বিধান না থাকলেও তাদের সতর পর্দার অন্তর্ভুক্ত। প্রতিটি মানুষের নিজস্ব কিছু অবস্থা বা সময় থাকে। তাই ঘরের বড় সদস্যদের জন্য আবশ্যক তো বটেই তবু শিশুদেরকেও তিন সময়ে অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করতে হবে। ১. ফজরের পূর্ব মুহূর্তে ২. দুপুর বেলা যখন (স্বামী-স্ত্রী) হালকা পোশাকে থাকে এবং ৩. এশার নামাজের পরে। এটিই কোরআনের বিধান। আল কোরআনে বিধৃত হয়েছে :হে মুমিনগণ! তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসিরা এবং তোমাদের মধ্যে নাবালক শিশুরা যেন তিনটি সময়ে অনুমতি গ্রহণ করে। ফজরের নামাজের আগে, দুপুরে যখন তোমরা পোশাক খুলে রাখো এবং এশার নামজের পর। এ তিনটি তোমাদের গোপনীয়তা অবলম্বনের সময়। এ তিন সময় ছাড়া অন্য সময়ে তোমাদের ও তাদের মাঝে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।(২৪:৫৮)

৪. সার্বজনীন জায়গা হলে :মসজিদ-মন্দির, হাসপাতাল, বিমানবন্দর, বাস বা রেল স্টেশন, পার্ক কিংবা শপিং মলে প্রবেশের ক্ষেত্রে অনুমতির আবেদন প্রয়োজন হয় না। কেননা এগুলো সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে। তবে এসব স্থানে বিশেষ করে, ব্রেস্ট ফিডিংরুম, ওয়াশরুম, ড্রেস ট্রায়ালরুমে প্রবেশের ক্ষেত্রে অবশ্যই ভেতরের অবস্থা নিশ্চিত হয়ে প্রবেশ করতে হবে। আর বিপণিবিতানের কর্তৃপক্ষকেও হীন উদ্দেশ্যে এসব স্থানে গোপন ক্যামেরার ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। উল্লিখিত জায়গা ব্যতীত অন্যত্র অনুমতির প্রয়োজন নেই। এরশাদ হয়েছে:যে ঘরে কেউ বাস করে না এবং তাতে তোমাদের উপকার গ্রহণের অধিকার আছে, তাতে তোমাদের প্রবেশে কোনো গুনাহ নেই (২৪:২৯)। ব্যক্তিত্ব অর্জন করার ক্ষেত্রে ইসলাম সর্বশ্রেষ্ঠ আইকন। তাই প্রত্যেক পিতা-মাতার কর্তব্য হচ্ছে সন্তানদের বাল্যকালেই এ আদর্শগুলো শিক্ষার মাধ্যমে মানবিক ও ব্যক্তিত্ব গঠনের অনুশীলনে অভ্যস্ত করা।

lলেখক :এম ফিল গবেষক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়