নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণে আরো ৩জনের মৃত্যু, তদন্ত কমিটির সময় বাড়লো

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০১:৫০

ফতুল্লার পশ্চিম তল্লার বায়তুস সালাত জামে মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় দগ্ধ আরো ৩ জনের মৃত্যু ঘটেছে। এরা হলেন আব্দুস সাত্তার (৪০), শেখ ফরিদ (২১) ও নজরুল ইসলাম (৫০)। এ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ালো ৩১ জনে।

এদিকে জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলে সাত দিন সময় চেয়েছে। বৃহস্পতিবার চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার কথা ছিল। তবে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে সাতদিনের সময় চেয়েছে কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খাদিজা তাহেরা ববি। তিতাসের তদন্ত কমিটির সময়ও বাড়ানো হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটি অচিরেই রিপোর্ট দিবে বলে জানা গেছে। তিতাসের পক্ষ থেকে এখনো বলা হচ্ছে মসজিদের বর্ধিত করণের সময় তিতাস লাইন সরাতে গিয়ে এই লিকেজের সৃষ্টি হয়। মসজিদের বর্ধিত অংশের এমনকি মসজিদেরও কোন সংস্থার অনুমোদন ছিল না।

গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সর্বমোট আরো ৩ জনের মৃত্যুর খবর পেয়ে স্বজনদের মধ্যে আহাজারির পাশাপাশি এলাকায় শোকে ছায়া বিরাজ করছে। গতকাল সন্ধ্যার পর ঢাকা থেকে সিআইডির একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে।

এদিকে তিতাসের তদন্ত কমিটির প্রধান মহাব্যবস্থাপক (জিএম) পরিকল্পনা আবদুল ওহাব জানান, মসজিদের উত্তর পাশে বর্ধিত করা হয়েছে। সেখানে ফাউন্ডেশন দেওয়ার সময়ে মসজিদের চার নাম্বার কলাম স্থাপনের সময়ে নিচে আমাদের পাইপ লাইন ছিল। ফাউন্ডেশনের কলাম বসাতে গিয়ে পাইপ লাইনের র‌্যাপিং নষ্ট করে ফেলে মসজিদ কর্তৃপক্ষ। এ র‌্যাপিং নষ্ট করার কারণে গ্যাসের পাইন মাটির সঙ্গে সংস্পর্শে এসে ছিদ্র হয়েছে। ওই একটি কলামের ফাউন্ডেশনের নিচেই লিকেজগুলো পাওয়া গেছে। সে স্থানে লিকেজ ছিল তা বন্ধ করার পরে আর মসজিদের ভেতরে কোন গ্যাস পাওয়া যায়নি। এতেই প্রতীয়মান হয় একটি কলাম বাড়ানোর সময়ে ফাউন্ডেশন দিতে গিয়ে নিচে থাকা গ্যাসের পাইপের র‌্যাপিং নষ্ট করে ফেলে।

বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন বলেছে, বিদ্যুতের কোন ধরনের সমস্যা এখানে ছিল না। অতএব এই দুর্ঘটনার জন্য অন্য বিভাগ দায়ী। ফায়ার সার্ভিস অবশ্য শুরু থেকেই গ্যাস লিকেজের বিষয়টিকে জোর দিয়েছে। এলাকাবাসীর মতে বিদ্যুৎ বিভাগেরও কিছুটা দায় রয়েছে। আজকাল সব মসজিদেই এসি লাগানো হয়। একাধিক লাইন রাখা হয়। একটি লাইনের বিদ্যুৎ চলে গেলে মুয়াজ্জিন বা অন্য কেউ দৌড়ে গিয়ে লাইনটি পরিবর্তন করে দেন। ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটি সূত্রে জানা গেছে, মসজিদের ফ্লোরের নিচ দিয়ে গ্যাসের লাইন গেছে এবং আগুন নেভানোর জন্য পানি দেয়ার পর ওই পানিতে গ্যাসের বুদবুদ দেখা গেছে।

তারা আরো বলেন, যেহেতু এসির কারণে মসজিদের দরজা ও জানালা সব সময় বন্ধ রাখা হয়, সেহেতু বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের কারণে আগুন লাগার পর জমে থাকা গ্যাস বিস্ফোরণকে ত্বরান্বিত ও তীব্রতর করেছে। বিষয়টির প্রমাণ পাওয়া যায় বিদ্যুৎ আসার সঙ্গে সঙ্গে মুহূতের্র মধ্যে ৬টি এসির সবই ভস্মীভূত হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। গ্যাস, এসি বা বিদ্যুৎ- যে ইউটিলিটি কর্তৃপক্ষই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী হোক, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। মসজিদ কমিটির অবহেলা ছিল কিনা, তাও খতিয়ে দেখতে হবে। ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে, সূত্রপাত যেভাবেই ঘটুক, তিতাস গ্যাসের সঞ্চালন লাইনে লিকেজের কারণেই ভয়াবহ এই বিস্ফোরণ ঘটেছে। ইতোমধ্যেই জানা গেছে বায়তুস সালাত জামে মসজিদের পাশেই তিতাসের গ্যাস সঞ্চালন লাইনে একাধিক লিকেজ ছিল। গতকালও মসজিদের আশেপাশে তিতাস খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চালিয়েছে।

এ বিষয়ে অধিকতর তদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি আরও সাত দিনের সময় চেয়েছে। বিস্ফোরণের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো থেকে তথ্য নিতে আরও কিছু সময় লাগবে বলে জানিয়েছে তদন্ত কমিটির সদস্যরা। তবে যত দ্রুত সম্ভব তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। গত ৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাতে এশার নামাজের সময় বায়তুস সালাত জামে মসজিদের ভেতর ঘটে ভয়াবহ এক বিস্ফোরণ। মুহুর্তেই মৃত্যুকুপে পরিণত হয় মসজিদটি। ঘটনাস্থলে আহত হন অর্ধশতাধিক জন। গুরুতর দগ্ধ ৩৭ জনকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে ৩১জন ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধিন বাকি ৫ জনের অবস্থাও সংকটাপন্ন। বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে উৎসারিত আগুন এবং লিকেজ থেকে জমা হওয়া গ্যাসের কারণে এ বিস্ফোরণ ঘটেছে ধারণা করা হচ্ছে।

ইত্তেফাক/আরকেজি