সুমিত বণিক
পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে ডিঙিয়ে একজন নারীর পক্ষে তার প্রতিভা বিকশিত করা এখনো একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের সমাজে একজন নারী ও পুরুষ যে সব বদ্ধমূল ধারণা ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার মধ্য দিয়ে বড় হয়, সেটিই নারী-পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান স্বাস্থ্যগত সমস্যার পার্থক্যকে বড় করে তোলে। কিন্তু এটি তো হওয়ার কথা নয়। বিধাতা তো জন্মের ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য করেনি, তাহলে মানুষ বা সমাজসৃষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি কেন নারীকেই শুধু এই প্রতিকূল অবস্থার শিকার হতে হবে?
আধুনিক বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়ায় চাইলেই মানুষ নিয়মিত বিশ্বের সর্বাধুনিক তথ্য পাচ্ছে। কিন্তু নারীর মাসিকের মতো একটা প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক শরীরবৃত্তীয় বিষয় নিয়ে আমাদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও ট্যাবুগুলো যে কোনো বিবেকবান মানুষকে ব্যথিত করে। প্রত্যেকটি পরিবারেই এক বা একাধিক নারী রয়েছে, ঐ নারীর প্রজনন বা যৌন স্বাস্থ্যের কোনো সমস্যা হলে পুরুষ সদস্যটিকেই ছুটতে হয়। নারীর প্রজনন ও যৌন স্বাস্থ্যের বিষয়গুলোকে আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা লোকচক্ষুর অন্তরালে দেখতেই অভ্যস্ত। পুরুষের মতো নারীর স্বাস্থ্যের সমস্যাগুলো বলার মতো সহায়ক পরিবেশ তৈরি হয়নি এখনো। নারী কষ্ট আর যন্ত্রণার মধ্যে দিনগুলো পার করে। কখনো কখনো নীরবতা অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু পর্যন্ত ডেকে আনে। কিন্তু এই দৃশ্যপট কি আমাদের প্রত্যাশিত হওয়া উচিত? এই প্রশ্নের উত্তর সাধারণত আমরা খুঁজি না বা বিদ্যমান অবস্থার পরিবর্তনে স্রোতের বিপরীতে গিয়ে ভাবতে ইচ্ছুক নই। কিন্তু আমাদের এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। কারণ আবহমান কাল ধরে চলে আসা সংস্কৃতিগুলো আমাদের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতারই ফসল—এই সত্যটা আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। আমাদের আরো উপলব্ধি করতে হবে, এই সংস্কৃতিগুলো নারী প্রগতির ক্ষেত্রে চরম বাধা, নারীর সম্ভাবনা ও প্রতিভা বিকাশের পথে অন্যতম অন্তরায়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, রাঙ্গামাটি এবং খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত নাগরিক সুযোগ-সুবিধা এখনো অধরা। জরুরি প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্স কিংবা মাসিকের সময় ব্যবহূত একটা সামান্য স্যানিটারি প্যাড ক্রয় করাও অনেক ক্ষেত্রে দুঃসাধ্য ব্যাপার। প্রকৃতির সঙ্গে মিতালি করেই চলে এইসব ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ তথা কিশোরী ও নারীদের জীবন-জীবিকা। জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি তারা নিজস্ব সংস্কৃতি ও বিশ্বাসে পরিচালিত হলেও, সেই সামাজিক প্রথাগুলোর মধ্যেও নারীকে অবদমিত বা নিগৃহীত করার সংস্কৃতি লুকিয়ে আছে। যেগুলো দৃশ্যমান নয়। আর এই দৃষ্টিভঙ্গি, সামাজিক প্রথা যুগের পর যুগ নারীকে শৃঙ্খলমুক্ত হতে দেয়নি। ফলে নারীর প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন, নিপীড়ন চলছেই। আশার কথা হলো, নারীর এইসব বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে ২০১৯ সাল থেকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আর্থিক সহায়তায় সিমাভি নেদারল্যান্ডস ও বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের সহযোগিতায় স্থানীয় ১০টি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে ‘আমাদের জীবন, আমাদের স্বাস্থ্য, আমাদের ভবিষ্যত্’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে প্রকল্প এলাকার কিশোরী ও নারীদের জীবনে একটি স্থায়িত্বশীল ইতিবাচক পরিবর্তন আনা। যার মাধ্যমে তারা তাদের জীবনে সামাজিক কুসংস্কার ও সবরকম নেতিবাচক প্রভাবমুক্ত হয়ে একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করবে।
দীর্ঘদিনের ধ্যানধারণা বা কুসংস্কার পরিবর্তন করতে হলে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। শুধু একটি প্রকল্পের মাধ্যমে হয়তো এই চিরাচরিত অবস্থার সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়, তাই এই উদ্যোগকে সফল করতে প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সেবার বিনিময় ও সহযোগিতার সুসমন্বয়। আমরা বিশ্বাস করি, নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণে অর্জিত হবে আমাদের আগামীর স্বপ্ন। আর এটি বাস্তবায়নে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও গণমাধ্যমের সক্রিয় ভূমিকার বিকল্প নেই।
বান্দরবান
