অগ্রন্থিত রচনা

‘উত্সবে সম্পদ্ শোভে’

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০১৯, ২০:৫১

বাণিজ্যমেলায় বৈদ্যুতিন সরঞ্জামের বিপণিবিতানে চরছিলাম এক বেকার বিকেলে, বন্ধু পিটারকে নিয়ে—কিছু কিনতে নয়, কারো পিছু নিতে : সোজা কথায় হরিণীদের একটা জরিপ করতে। এটা অবশ্য মধ্যযৌবনের বিকার ছিল না, ছিল মধ্যজীবনের নেশা। শৌখিন জরিপটি হলো : হরিণীগণ রিকশা থেকে নেমে কী দেখেন আর গাড়ি থেকে নেমে কী কেনেন। অনুমানই প্রমাণ হচ্ছিল মোটামুটি—‘উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত’ হাতগুলি ক্রমানুসারেই পড়ছিল ‘উচ্চমূল্য-মধ্যমূল্য-নিম্নমূল্য’ পণ্যের উপরে। ব্যতিক্রমও ঘটছিল কম নয়। ঘটতেই বন্ধু বলছিল :

‘কেস, করাপশান।’

আমি বলছিলাম 

‘সেক্টর, ইনফর্মাল। মানে জানতে চাইলে, ফিজিক্সের মাস্টারকে কেবল এটুকই বললাম যে, এ-খাতে পকেট-চুরি থেকে দেহ-বিক্রি সবই থাকতে পারে।

অর্থবিদ্যার গোলকধাঁধায় ঢুকতে চায় না বিধায় কথার কোণ পাল্টাল পিটার :

‘এই জরিপ থেকে উদ্দেশ্য বহির্ভূত একটি উপাত্ত আমি পেয়েছি : পরিপাটি সাজগোজের বিচারে রিকশা-বাহিতাগণের অবস্থান সিডান-আনীতাগণের ওপরে।’

‘হ্যাঁ, কিউট বিউটির হার নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্তের দিকে নামতে থাকে—’

তাড়াতাড়ি সায় দিয়ে আমিও প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাইলাম :

‘—চল্, পান খাওয়া যাক।’

‘পান খাওয়া?’

পিটার আমার পান করার খবর রাখে, পান খাবার নয়। হালে যে করাটা ছেড়েছি, তাও জানে; জানে না কেবল খাওয়াটা ধরেছি কি না। তাই সে হয়রান হয়ে বলে উঠল :

‘তার মানে, পানের অভ্যেসটা তোর আর যাবেই না—’

‘কেন যাবে এমন ক্ল্যাসিক্যাল একটা অমর অভ্যাস? কালজয়ী বাগ্মী রোমান সিসেরো পর্যন্ত ছিলেন যার দাস?’

‘বলছিস কী? সিসেরো পান খেতেন?’

‘খেতেন না, করতেন। ‘পানিং’ এক অমোঘ হাতিয়ার বাক্পতিদের। রিমেম্বার শেক্সপিয়ার’স্ ক্যাসিয়াস ইন্ জুলিয়াস সিজার— Now it is Rome indeed, and room enough,/ When there is in it but one only man.’

‘পান করা থেকে পান খাওয়া, সেখান থেকে ইংরেজি pun। সে pun থেকে punning। শব্দ নিয়ে এই ভেলকিবাজিও বুঝি যাবে না তোর?’

‘কেন যাবে? সপ্তদশ শতকের অলঙ্কারশাস্ত্রী পণ্ডিতরাজ জগন্নাথ কাব্যের প্রাণ রমণীয়তাকে বললেও, একাদশ শতকের আলঙ্কারিক আচার্য কুন্তকের মতে ‘বক্রতা’ই কাব্যের প্রাণ। প্রমথ চৌধুরীর মতে, বাক্যেরও। নইলে তিনি লিখবেন কেন—‘নামজাদা লেখকেরও বই বাজারে কম কাটে, কাটে বেশি পোকায়।’ বন্ধু! মন দিয়ে শোনো : এইসব বক্রতা-কণ্টকতা-বিচিত্রতা-বন্ধুরতাই চাঙ্গা রাখে লেখক-পাঠক এবং বক্তা-শ্রোতার যুগলবন্দিগুলিকে। নইলে কণ্টকিত কন্ডমের অমন রগরগে বিজ্ঞাপন কেন? ওরকমটি জাগ্রত-যুগলেরও হর্ষবর্ধক বলেই।’

ক্ষণেক অবাক থেকে, অনিশ্চিত টোনেই ফোঁড়ন কাটল পিটার :

‘তোর এই খবিস খাসলতটিও দেখছি আর যাবে না—’

‘গেলেও আরেকটু পরে—সময়মতো একটি দৃষ্টান্ত পেয়ে গেছি। পিটারের কবজি টিপে তড়িঘড়ি দাঁড়িয়ে গেলাম এবং অদূরে আমাদের সঙ্গে আড়াআড়িভাবে দাঁড়ানো, সঙ্গীটির মুখোমুখি, বাকবাকুম-যুবতীটির দিকে ইঙ্গিত করে বললাম :

‘মেয়েটির আপাদশির একটা লম্বরেখা টানলে দেখবি—রেখাটি থেকে বক্ষ যেদিকে ছত্রিশ ইঞ্চি বাড়তি, তার বিপরীত দিকে নিতম্বও বাড়তি ছত্রিশ ইঞ্চি, মধ্যখানে তম্বীর ক্ষীণ কটিখানি কিন্তু চব্বিশ ইঞ্চিতেই স্থির। প্রধানত এই বঙ্কিম বন্ধুরতার জন্যই তাঁকে সকলেরই চাই—মডেল হিসেবে, নায়িকা হিসেবে, কনে হিসেবে, শ্যালিকা হিসেবে—’ 

‘শ্যালিকা? শাকুর, য়্যু শক মি অ্যাট টাইমস!’

‘অনুপ্রাসটা কি আমাকে খোঁচানোর জন্য? “শ্যালিকা, শাকুর, শক্?”’

‘শব্দের ওপর সর্দারি করার শক্তি কি আমার আছে?’

‘আবারও? “শব্দ, সর্দারি, শক্তি?”’

‘তাই তো! হচ্ছেটা কী? আমি তো ইচ্ছে করে কিছুই করছি না।’

‘হ্যাঁ, এসব এমনিই আসে এবং এলে মজাও লাগে। না হয় রবীন্দ্রনাথ কেন লিখবেন—“গুরু গুরু মেঘ গুমরি গুমরি/ গরজে গগনে গগনে/ গরজে গগনে,—”’

‘রবীন্দ্রনাথের কি আরো কিছু মনে আছে?’

‘অজস্র : “চলচপলার চকিত চমকে/ করিছ চরণ বিচরণ/ কোথা চম্পক আভরণ”—“কেতকী কেশরে কেশপাশ করো সুরভী”—“দিনান্তে নিশান্তে পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়”—“ভীষণ রঙ্গে ভবতরঙ্গে ভাসাই ভেলা”—“কুলায় কাঁপিছে কাতর কপোত।”

‘শুনেছি আধুনিকতর কবিগণ অনুপ্রাস ব্যবহার করেন না।’

‘করেন, তবে তাঁরা তা জনেন না। জানতেন, যদি ইচ্ছে করে করতেন। আর ইচ্ছে করে করলে অনুপ্রাস হয়ে যায় অট্টহাস—বলেছেন অলঙ্কারশাস্ত্রী শ্যামাচরণ চক্রবর্তী।’

‘সত্যি করেন? দৃষ্টান্ত দিতে পারবি? ঠিক এ মুহূর্তে?’

‘কিছু তো পারবই। জীবনানন্দ দাশ : “চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা”। বুদ্ধদেব বসু : “এল এলোমেলো ব্যাকুল বাউল উতল বাও/ কঙ্কাবতী!”—“হাহাকার করে বেহায়া হাওয়ার বেহালাখানি,/ কঙ্কাবতী!” সুধীন্দ্রনাথ দত্ত : “অনাদি অমাকে আনে আমাদের গোচরে।” আবুল হাসান : “মানুষের মনীষার মঞ্জুষার, মুগ্ধতার মহিমার—/মৌনতাবাহক।” আল মাহমুদ : “বাঙালি কৌমের কেলি কল্লে­ালিত কর কলাবতী”। প্রেমেন্দ্র মিত্র : “আমি কবি ভাই কর্মের আর ঘর্মের”। বিষ্ণু দে : “কর্মিষ্ঠা যে তুমি শর্মিষ্ঠা যে।” শেষের দুটি দৃষ্টান্তকে বলে ছেকানুপ্রাস।’

‘একানুপ্রাস?’

‘আসলে একানুপ্রাসও বলে,  ছেকানুপ্রাসকে— যেহেতু বর্ণগুলি মাত্র একবার আবৃত্ত হয়। অর্থাত্ দু’বার ধ্বনিত হয়, যথা : “এখনি অন্ধ বন্ধ করো না পাখা।”’

‘ছেকাটা কী রে ভাই?’

‘ছেকা নয়, ছেক; অর্থ বিদগ্ধ। এই অনুপ্রাসটি বিদগ্ধগণই বেশি ব্যবহার করেন। নামটি দিয়েছেন অলঙ্করাচার্য উদ্ভট। আর আলঙ্কারিক কুন্তক অনুপ্রাসকে বলেছেন বর্ণবিন্যাসের বক্রতা। প্রসঙ্গত বলা দরকার : বক্রতা এবং বক্রোক্তিবাদী অলঙ্কারশাস্ত্রী আচার্য কুন্তকের কাছে যাবতীয় অলঙ্কারই বক্রোক্তির অন্তর্ভুক্ত, যেটি তাঁর মতে ‘বৈদগ্ধ্যভঙ্গীভণিতি’, অথবা উক্তি-বৈচিত্র্য সংবলিত বাগ্ভঙ্গিবিশেষ। তাড়াতাড়ি বলে ফেলি, বক্রোক্তিবাদী আলঙ্কারিক কুন্তকের সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ সহমত—’

আমার কথা আটকে গেল—আচমকা ব্রেক কষে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে সমূহ বিপদ এড়ানোর মতো একটা ঘটনায়। সেই ‘বন্ধুর বনিতা’টি পাশ কেটে চলে গেল একেবারে গা ঘেঁষে, অপর পাশের বখাটে দলটি থেকে যথাসম্ভব গা বাঁচাতে গিয়ে। কাছে থেকে ঘনিষ্ঠ নজরে দেখে সংশোধনী উচ্চারণে বাধ্য হলাম :

‘বন্ধুরতা বলছিলাম দূর থেকে। কাছে থেকে দেখলাম আস্ত কারুকার্য। বস্তুত এই কারুকার্যটাই অলঙ্কার, যার কাজ হলো বশীকরণ—’

‘কোনো অলঙ্কার তো আমি দেখলাম না দোস্ত?’

‘দেখিসনি যেহেতু এঁর অলঙ্কার ছিল অঙ্গীভূত, যেটিকে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন—“বিনা ছন্দের ছন্দ”।’

‘ওটা কবির কথা। বাস্তবতা হলো, শোভন কিছু ভূষণে ওকে আরো সুন্দর দেখাত।’

‘তা ঠিক। কাব্যে বৈচিত্র্যসৃষ্টিকারী আরোপ্যমান অলঙ্কারের উপযোগিতার কথায় প্রবীণ অলঙ্কারাচার্যগণ মোটামুটি একমত। সংস্কৃত কাব্যতত্ত্বকে প্রায় অলঙ্কারতত্ত্বের তথা সৌন্দর্যতত্ত্বের সমার্থক রায় দিয়েছেন তাঁরা। এবং এও ঠিক যে অলঙ্কৃতি কিংবা অলংক্রিয়া বিষয়ে সংস্কৃত ভাষার মতো এত ব্যাপক-গভীর চিন্তাভাবনা-বিচার-বিবেচনা আর কোনো ভাষায় হয়নি—’

‘হয়নি হয়তো ও ভাষা কাব্যপ্রধান বলে। তোরই বা অলঙ্কারচর্চায় কাজ কী? তুই তো গদ্যের লোক—’

‘গদ্যের সঙ্গে গরমিলটা ছিল পদ্যের, কাব্যের নয়। শুদ্ধ কাব্যকে সুন্দর গদ্য হতেই হবে। তাই অলঙ্কারের উপযোগিতা কাব্যে থাকলে, গদ্যেও থাকবে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘সাহিত্যধর্ম’ প্রবন্ধে বলেন—“অলঙ্কৃত বাক্যই হচ্ছে রসাত্মক বাক্য।” কথাটা তিনি আরো বিস্তারিত বলেছেন তাঁর “সাহিত্যের তাত্পর্য” প্রবন্ধে—“হূদয়ের ভাব উদ্রেক করিতে সাজ-সরঞ্জাম অনেক লাগে। সাহিত্যও আপন চেষ্টাকে সফল করিবার জন্য অলঙ্কারের, রূপকের, ছন্দের, আভাসের, ইঙ্গিতের আশ্রয় গ্রহণ করে। উপমা-তুলনা-রূপকের দ্বারা ভাবগুলি প্রত্যক্ষ হইয়া উঠে।”’

‘দীর্ঘ উদ্ধৃতিটি মুখস্থ বললি কী করে?’

‘করেছি বলে। করেছি, আমার সাহিত্যের বিরুদ্ধে অলঙ্কারের অভিযোগ ওঠে বলে।’

‘আবেগতাড়িতদের কথা তো অনেক শুনলাম, যুক্তিশাসিতগণ কী বলেন? যেমন অ্যারিস্টট্ল?’

‘ও, র্যাশনাল অ্যারিস্টটল? তিনি তো নিজেই একটি অলঙ্কারের কমন উদাহরণ—’

‘সে কেমন?’

‘রেটরিকের পাঠ্যপুস্তকগুলিতে “সার্কাজম” বা পরীবাদ-নামক অলঙ্কারের সাধারণ দৃষ্টান্তটি একটু হেরফেরসহ এরকম : Certainly God has not created man and left it to Aristotle to make him rational। পরীবাদের বাংলা নমুনাস্বরূপ মনে পড়ছে এক অভাগিনী মাতার উক্তি : “থাকতে দিলি না ভাত-কাপড়,/ মরলে করবি দান-সাগর।”’

‘কথাগুলি শুনতে ভালো লাগছে। তবে অলঙ্কারটা কোথায় তা তো দেখতে পাচ্ছি না।’

‘অলঙ্কৃত বলেই ভালো লাগছে। বক্রাঘাত বা আয়রনির মতো প্রশংসার ছলে না করে পুত্রকে নিন্দা এতে সোজাসুজিই করা হয়েছে, তবে বিচিত্র ভঙ্গিতে। এই বিচিত্র ভঙ্গিটাই অলঙ্কার। অ্যারিস্টট্লও তাই অলঙ্কারকে বলেছেন “স্ট্রেন্জ এক্সপ্রেশন”। বিস্ময়কর যে প্রতীচ্যগুরুর সংজ্ঞাটা প্রাচ্যের আচার্যদের সঙ্গে মিলে যায়, যাঁরা “বিচিত্র অভিব্যক্তিকেই” অলঙ্কার জ্ঞান করেন—’

হঠাত্ পিটার পিঠের ওপর টোকা মেরে একটা মুখ্য

অলঙ্কারের প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল:

‘একেই কি বলে মরাল গ্রীবা?’

দেখে বিভ্রান্তই বোধ করলাম—একি বাণিজ্যমেলা, না কি সৌন্দর্যমেলা। বললাম :

‘হ্যাঁ এবং মৃণাল ভুজও ওঁর বাহুকেই বলে—’

‘পটোলচেরা চোখ কিন্তু ওঁর নয়, ওটা ওঁর হাতে-ধরা বান্ধবীর।’

পিটারের এই মোটা দাগের পরিবর্তনে কিছু খটকা লাগল—পরিহাস করছে না তো আমার দীর্ঘসূত্রী অলঙ্কারস্তুতিকে! অন্যথায় শুধুমাত্র শাড়ি-ওয়াচার, রীতিমতো উম্যান-ওয়াচার হয়ে উঠবে কেন—তাও আবার  আরব্যানওয়্যার-স্পোর্টসওয়্যার-ইভনিংওয়্যার-পরিহিতাদের পেশাদার ইভ্-ওয়াচার। বললাম :

‘হঠাত্ উপমা নিয়ে পড়লি কেন?’

‘তোর বকবকটা আজ অলঙ্কারের ওপর চলছে যখন, ভাবলাম উপমাগুলি একটু বুঝেই নিই—আমাদের দৌড় তো উপমা পর্যন্তই।’

‘উপমা তো ছোট ব্যাপার নয়, সাহিত্যেও ওটাই আদি অলঙ্কার। সেকালে কাব্যরসিকদের মুখে মুখে ফিরত “উপমা কালিদাসস্য”। একালে সাহিত্যতাত্ত্বিকগণকে বলতে হয় “উপমা শ্রীরবীন্দ্রস্য”। তবে পাঠককে টানে বেশি অর্থালঙ্কারের চেয়ে শব্দালঙ্কারই—যার কারুকাজ সাহিত্যের সারাটা আকাশ জুড়েই ঝিলমিল করে, নক্ষত্রের মতো। তার মধ্যে অলঙ্কারশাস্ত্রে শ্রেষ্ঠতম বিবেচিত হয় কিন্তু অনুপ্রাসই। ওই দ্যাখ, দ্যাখ—পানের একটা মূর্ত উদাহরণই আসছে মনে হয়।’

পিটার বেশ অভিনিবেশ সহকারেই দেখল এবং বলল :

‘আমি তো দুটি ছেলে ছাড়া আর কিছুই দেখছি না।’

হঠাত্ হাঁটতে হাঁটতেই বাম-জনকে ডান-জনের ঘাড়ে মাথা পেতে দিতে দেখেই আমি নিশ্চিত হয়ে বললাম :

‘না হে, দুটিই ছেলে নয়; একটি মেয়ে।’

ইউনিসেক্স ড্রেস-পরা নারী-নর আমাদের পাশ কাটিয়ে চলে যাবার পর পিটারকে বললাম :

‘দেখলি তো, ড্রেস অভিন্ন; কিন্তু সেক্স ভিন্ন। অর্থাত্ Pun একেবারে যুগলমূর্তিরূপেই দ্রষ্টব্য।’

‘একটু বুঝিয়ে দে তো আমাকে—বস্তুত “পান্ বস্তুটি” আমি বুঝিই না ভালো করে।’

‘বুঝিস না? তবে পান্ দিয়ে সেবার কার জানটা বাঁচালাম? পিটারের পিতার হাত থেকে?’

‘বলে ফ্যাল না বাবা, আমি এখন আরেক রসের বশে আছি। বুঝতে পারছি না—প্রদর্শনীটি কি আধুনিক পণ্যের, না আধুনিকা কন্যের।’

‘সেই-যে একদিন মদ্যপান সম্পর্কে অসতর্ক গল্প করছিলাম তোদের বৈঠকখানায়। তোকে ডাকতে এসে হইহল্ল­ার মধ্যে কতক্ষণ পেছনে দাঁড়িয়েছিলেন জানি না—শেষে পাশে পেয়ে আমাকে হাতে ধরে একপাশে ডেকে নিয়ে তোর পিতার উদ্বিগ্ন প্রশ্ন : পিটার কি ইদানীং পানাসক্ত? উত্তর দিয়েছিলাম : এমনি মোটেই না, তবে ভালো জর্দা পেলে খেয়েই ফেলে কখনো এক খিলি।’

‘তা তো মনে আছে। কিন্তু ওটা-যে তাম্বুল নিয়ে pun, সেটা তো বলিসনি—’

‘সেটা কি আমিই জানতাম তখন? আলিয়ঁস ফ্রঁসে ফরাসি ফিল্মের ডাবিঙে দুটি সংলাপ পড়ে তো দুজনেই হেসে উঠেছিলাম। কিন্তু তখন কি জানতাম যে আমাদের হাসিয়েছিল ‘পাণি’ শব্দটি নিয়ে, মানে হ্যান্ড-শব্দটি নিয়ে, পান্।’

‘এটা তো মনে পড়ছে না—’

‘নায়ক সবিনয়ে নায়িকার পিতাকে বলেছিল : “মহাশয়, আমি আপনার কন্যার পাণিগ্রহণ করতে চাই।” হবু শ্বশুরের উত্তরটি ছিল : “তাতে আর কী আপত্তি থাকতে পারে—বাকি সব গ্রহণ করে ফেলেছেন যখন।”

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, এখন মনে পড়ছে—যুবক পাণিগ্রহণ বলেছিল বাগ্ধারার, মানে বিয়ে করার, অর্থে। আর প্রৌঢ় উত্তর দিয়েছিল—পাণি শব্দটির হস্ত অর্থ করে, একটি অঙ্গ গ্রহণ আর বাকি থাকবে কেন (মানে বাকি সব অঙ্গ কাবার হয়েছে যখন)। তার মানে অলঙ্কারতত্ত্ব না জেনেই ভাষার রকমারি অলঙ্কার আমরা নিয়তই উপভোগ করছি।’

‘অবশ্যি। সাহিত্যে অলঙ্কার উড়ে এসে জুড়ে বসে না, লেখক-কথকের স্বভাবেই তার জন্ম। অলঙ্কার বলতে সোনারূপা ছাড়া কিছু বোঝে না তেমন নিরক্ষরগণও, এমনকি উপভাষাতেও, তাঁদের কথাকে অলঙ্কৃত করেই যাচ্ছেন সর্বদা—“চাঁদপানা পোলা আমার”, “সাতরাজার ধন মানিক আমার”, “মুখটা শুকায়া আমচুর অয়া গেছে”, “এত তার থাকতে ক্যামনে বেতারযন্ত্র কয়”, “রসিক শীতেও মরে, ভাতেও মরে”—’

‘শেষেরটা তো বুঝলাম না।’

‘রসিক শীতে কষ্ট পেলেও তার সুন্দর জামাটি অসুন্দর চাদরে ঢাকবে না, ওদিকে ভাতে কষ্ট পেলেও বেজায় দামি জামাটিও না-কিনে ছাড়বে না। নোয়াখালীর গভীর পল্ল­ীর শৈশবস্মৃতি বলতে আমার যত আঞ্চলিক কথাবার্তা মনে পড়ে, সবই কোনো-না-কোনো অলঙ্কারে উজ্জ্বল। যেমন—“কইতে বখ্শ আলী, লেইখতে হাডাহাডি” মানে ফাটাফাটি—মানে বলা সোজা, করা কঠিন। “হোলার মুতে আছাড় খাইও না”, অর্থাত্ ছেলে ছেলেই, এমনকি নবী হলেও। কৈশোরে ঢাকার গ্রামের বিয়েবাড়ির স্মৃতি—“দুলাভাইরে খাওয়াইতেও মজা—বসে সবটির আগে, খায় কদম দিয়া, ওডে সবটির পরে—ভালো কইরা দম নিয়া”। পেটুক ভগ্নিপতির ভোজন বর্ণনায় এর চেয়ে সুভাষণ, মানে ইউফিমিজম, আর কী হতে পারে। কিন্তু টিপসইসর্বস্ব শ্যালিকাটি কি মঞ্জুভাষণ-নামক অলঙ্কারটি জেনেশুনে করেছিল?’

‘যা-ই বলিস এসব বক্রোক্তির মধ্যে চমত্কৃতি একেবারে লক্ষ্যভেদী।’

‘তা নইলে কি রবীন্দ্রনাথ লিখতেন—“কাগজ দিয়ে নৌকা বানায় বেকার যত ছেলেপিলে,/কর্ণ ধরে পার করবেন দু-এক পয়সা খেয়া দিলে”—মানে নৌকার হাল ধরে, বা যাত্রীর কান ধরে। “বাজে পূরবীর ছন্দে রবির শেষ রাগিণীর বীণ”, যেখানে পূরবীর দুটি অর্থ—পূরবী-নামক সান্ধ্যরাগ আর কবির জীবনসায়াহ্নে প্রকাশিত পূরবী-নামক কাব্যগ্রন্থ; আবার রবিরও অর্থ দুটি—সূর্য এবং রবীন্দ্রনাথ।’

‘শেষের উদাহরণটি ভারি চমত্কার রে!’

‘কিন্তু শেক্সপিয়ারের হেনরি দ্য ফিফথের এই উদাহরণটি তেমন চমত্কার কী? To England will I steal, and there I will steal? আসলে “ব্যাড পান্”-এর এক বিরাট ভাণ্ডারীই ছিলেন ইংরেজদের শ্রেষ্ঠতম এই লেখকটি। তাঁর ব্যবহারের কারণেই “বাজে পান্”কেও সরাসারি নাকচ করা মুশকিল, বলেছে এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা। বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম বিশ্বকোষটি বলে, উচ্চমানের সাহিত্যিক নিরিখে না টিকলেও, খারাপ পানের সাংস্কৃতিক গুরুত্ব এবং শ্রেণীনির্বিশেষে এর জনপ্রিয়তার তাত্পর্য রয়েছে অপরিসীম। তাত্পর্যটা হলো—সকল শ্রেণীর অংশভাক্ হওয়া—একটা মচ্ছবে, একটা মাজমায়, একটা জযবায়। তাঁর মতো একজন মহান শিল্পী কেন এটা করেন তার কারণ দর্শাতে গিয়ে শেক্সপিয়ার নিজেও এই groundling-দের কথাই বলেন—সাধারণ্যের ভোজ্যের কথা, তথা গণজিয়াফতের কথা।’

‘মহান শিল্পীর “ব্যাড পান্” আসে কীভাবে বল্ তো?’ 

‘পান্-ব্যাপারটাই হলো স্বতঃস্ফূর্ত। শেক্সপিয়ার তাঁর নাম Will-এর ওপর পান্ করে দুটি সনেটও লিখেছেন। কখনো এটা দিয়ে ওয়ার্ড-গেমও খেলা হয়। জোনাথন সুইফট আর টমাস শেরিডনের মধ্যে দীর্ঘ “পানিং-বাউট” চলত (নাট্যকার রিচার্ড শেরিডনের স্বজন নয়)। সুইফ্ট পানিং নিয়ে একটি রচনাও লিখেছেন—A Modest Defense of Punning। আর শেরিডন লিখেছেন পানের ওপর আস্ত একটি বই—Ars punica। বইটিতে তিনি পানের বহু প্রাচীন ভক্তও এনে জড়ো করেছেন, যেমন গ্রিক গণিতজ্ঞ এবং দার্শনিক পিথাগরাস। তিনি নাকি তাঁর সাগরেদদের যত্রতত্র শিম বুনতে বলতেন, কারণ শিমের গ্রিক প্রতিশব্দ হলো Punnoi। পিথাগরাস পান্-শিল্পের জন্য চৌত্রিশটি বিধিও নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। বত্রিশ নম্বর রুলটি ছিল : “অন্য পানস্টারের সুখ্যাতি কক্ষনো করবে না।” কী আশ্চর্য! এই বিধিটি আজো পর্যন্ত অমর হয়ে আছে সাধারণ রীতি হিসেবে।’

‘তুইও তো ওয়াজটা শুরু করেছিলি আজ প্রাচীনকাল থেকেই। কিন্তু চিচেরোর পরে তো আর এগোলি না।’

‘নামটা ইটালিয়ান নয়, সুতরাং উচ্চারণ চিচেরো নয়। নামটা ল্যাটিন এবং উচ্চারণ কিকেরো—কারণ, ও-ভাষায় K ছিল না। K-র কাজ করত C। আর C-র কাজ তো S দিয়েই চালাতেন ল্যাটিন ভাষাভাষী।’

‘তুই প্রসঙ্গ এড়াচ্ছিস।’

‘হ্যাঁ এড়াচ্ছি। ভাবছি, না-জানি তোর ধর্মীয় অনুভূতি ক্ষুণ্ন হয়!’

‘হোক, তবু এই ব্যতিক্রমী সন্ধ্যাটির অলঙ্কৃতি অক্ষুণ্ন থাকুক।’

‘তাহলে তোদের বাইবেলের প্রথম অংশ থেকে আসি, মানে “ওল্ড টেস্টামেন্ট” থেকে। ইহুদিদের নীতিগ্রন্থ “তালমুদে” এবং অন্যান্য হিব্রু লেখনীতে পানের ব্যবহার আছে অনেক। এরপর বাইবেলের দ্বিতীয়াংশে, মানে “নিউ টেস্টামেন্টে” পৌঁছলেই আমরা দেখব—যিশুর কাছে গ্যালিলীয় ধীবর অ্যান্ড্রু তাঁর ভাই সাইমনকে নিয়ে এসেছেন। যিশু তাঁকে গ্রহণ করে নতুন নামে ডাকলেন পিটার এবং বললেন : “এই পেট্রসটির উপরই আমি আমার চার্চ গড়ে তুলব” (পিটার-নামটা গ্রিক ভাষায় পেট্রস, যার অর্থ প্রস্তর)। অতঃপর এ তো ইতিহাস যে, পিটার বা পেট্রসই খ্রিস্টীয় আদি চার্চের প্রতিষ্ঠাতা এবং “সেন্ট-পিটার”রূপে ভ্যাটিকানে আজো তিনি “পেট্রিফায়েড” বা প্রস্তরীভূত হয়ে আছেন।’