আদিবাসী গারোরা তাদের সাংসারেক ধর্মমতে নতুন ফসল ঘরে তোলার পর ওয়ান্নার মাধ্যমে শস্যদেবতা মিসি সালজং ও আ.নি আফিলফা’কে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। গারোরা তাদের নিজস্ব ভাষায় মান্দি বলে পরিচয় দেন। মান্দি মানে মানুষ। মান্দিদের ধর্মের নাম সাংসারেক। মধুপুরের দোখলার চুনিয়া গ্রামে প্রতি বছর পূর্বপুরুষদের মতো করে সম্পূর্ণ সাংসারেক নিয়মে উদ্যাপিত হয় ওয়ান্না—যাকে শহুরে মানুষরা ওয়ানগালা বলে থাকেন। এই আয়োজনের মূল জনিক নকরেক, যার বয়স শতবর্ষ অতিক্রম করেছে।
এর আগে ঢাকার বনানীতে ওয়ানগালা, মধুপুরের পঁচিশ মাইল ও শেরপুরের ঝিনাইগাতিতে ১০০দামা ওয়ানগালা দেখেছি। সেগুলো কিছুটা মিক্সড, আর দূষণীয়। একারণে দূষণীয়, যদি আমরা গারো বা মান্দিদের অনুষ্ঠান বলি, তাহলে মান্দি নিয়মেই হওয়া উচিত। মান্দি অনুষ্ঠান খ্রিস্টান নিয়মে করার মানে মান্দিদের নিজস্ব সংস্কৃতিটাকে পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাওয়া। আমার মনে হয় গারোদের যারা খ্রিস্টান হয়েছেন, তাঁরা এই অনুষ্ঠানটার ভিন্ন একটা নাম দিতে পারেন। এতে করে ভবিষ্যত্ মান্দি প্রজন্ম বিভ্রান্তি থেকে মুক্তি পাবে। সাংসারেক নিয়মের ওয়ান্নাতে এই প্রথম অংশগ্রহণ আমার। বিটিভি’র হেড অব নিউজ নাসির আহমেদ আছেন সঙ্গে, এছাড়া ক্যামেরা ক্রু বন্ধু শিল্পী জাহিদ হোসেন মিলে পাঁচ জন।
এইতো জনিক নকরেকের বাড়ি। সারা বাড়িতে মানুষ গিজগিজ করছে। উঠান জোড়া সামিয়ানা টানানো, তার নিচে চারপাশে রাখা আছে লম্বা লম্বা বেঞ্চি। শতবর্ষী জনিক নকরেক বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ছেন, দামার তালে তালে পরাগ রিছিল নেচে যাচ্ছেন, একপাশে রান্না হচ্ছে অন্যপাশে চুয়ের আসর। বাচ্চারা আনন্দে হৈ-হুল্লুড় করছে। ঢাকা থেকে আগত আমরা সহ অন্যান্য অতিথিরা ব্যস্ত ছবি তোলায়, চু খাওয়ায়। এর মধ্যে সমকালের প্রিয় রাজীব নূর ভাই আছেন, আছেন চট্টগ্রামের আসমা বিথী, সঞ্জয় নাথ আর শিক্ষক তিথি। গ্রামের আচ্চু-আম্বিরাও (দাদা-দাদী) ব্যস্ত চু খাওয়ায়, রেরে গাওয়ায়, কেউ আবার খোশগল্পে মশগুল। সামিয়ানার নিচে, ঠিক উঠানের মাঝে রাখা আছে বড় বড় মাটির হাঁড়িতে চু, অবিরত পান চলছে। কেউ চ পান না করলে বাড়ির মালিক অপমানিত বোধ করেন। উঠানের এক পাশে উঁচু করে বনের গাছের বড় আকারের পাতা রাখা আছে বান্ডিল বেঁধে। জানা গেল পরের দিন যে বিশাল আয়োজন হবে সেই আয়োজনের খাবার দেয়ার প্লেট হিসেবে এই পাতা ব্যবহার করা হবে। বাড়ির চৌহদ্দির বাইরে গাছের সঙ্গে বাঁধা আছে এক মস্ত শুকর। সে গাছের চারপাশে ঘুরছে আর সারাক্ষণ গোঁত্, গোঁত্ শব্দ করছে। কালকে এই শুকর মারা হবে। ১৮ হাজার টাকায় কেনা হয়েছে শুকর। ঘরের দাওয়ায় বসেছেন নারী ও শিশুরা। নারীরা তান ধরেছেন রেরে’র। সমতলের পালাগানের মতো নিজেদের ভাষায় ছড়ায়-ছন্দে বাহাস করা হলো রেরে।
কবি পরাগ রিছিল কিছু রেরে বাংলা করে দিয়েছিলেন রেরে বোঝার জন্য তা এখানে দেওয়া হলো—
ও...ও...ও...
না’থক রিমনা রি’য়াঙ্গো
মাংসা মা’ন্না কুচ্চিয়া
মাংসা মান্না কুচ্চিয়া
য়্যা সংনি ফান্থিদে
জা’চক মাংসা চচ্চিয়া। হা-রে-রে, হা-রে-রে...
বাংলা—
কুচে (মাছ) পেয়েছি
মাছ ধরতে গিয়েছিলাম যখন
এই গ্রামের যুবকের
এক পা তো চিকন! হা-রে-রে...
চলছে ওয়ান্নার আনুষ্ঠানিকতা—
পরিপাটি সাজানো-গোছানো বাড়িঘর। প্রথম দিন রুগালা বা বিধাতাকে তুষ্ট করার দিন। নকমা গৃহে রুগালা’য় ভোরে শস্যদাতা সালজং দেবতার পূজা হয়। দুপুরবেলায় সমবেত সকলকে নিয়ে শস্যভাণ্ডার দেবী কিরি রক্ষিমের পূজা হয় শস্য, শাক-সবজি, কৃষি যন্ত্রপাতি ও বাদ্যযন্ত্রে চু ঢেলে তা উত্সর্গ করা হয়। অনুষ্ঠান শুরুর প্রথমে বিকালে রাক্কাসি আমুয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় উত্সব। নকমা বা রাজা বা গোত্রপ্রধানের বাড়িতে রুগালার পর গ্রামের বাড়ি বাড়ি রুগালা হয়। রুগালা হচ্ছে বাড়ির উঠানে আগতরা গোল হয়ে বসবে। মাঝখানে খালি থাকবে, সেখানে চু, দ্যু এবং অন্যান্য খাবার জিনিস রাখা হবে। সকলে খাবে আর গান করবে। প্রতি বাড়ির মানুষ উঠানে বেঞ্চ, ধানের খের, চু সাজিয়ে বসে থাকে রুগালা দলকে স্বাগত জানানোর জন্য। বাড়ির কর্তা রুগালা দলকে স্বাগত জানান। এভাবে সারারাত ব্যাপী চলে দোখলা গ্রামের প্রতি বাড়িতে রুগালা। অবশ্য রাতের স্থায়িত্ব ও সময়ের কারণে গ্রামের অর্ধেক বাড়ি ঘোরা সম্ভব হয় না। যদি সারারাতের মধ্যে গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে রুগালা শেষ করা সম্ভব হয় তাহলে ভোরের দিকে কারো বাড়িতে দেলাং থাকলে তা সুয়া করা হতো আগের দিনে।
দ্বিতীয় দিন ‘জল আন্না’, ভোর থেকে অনুষ্ঠান শুরু। সকাল সকাল একদিকে চলে শুকর মারা, অন্যদিকে শিশু-কিশোররা চালের গুঁড়া পানিতে মিশিয়ে বানানো রং আর গাছের ডালের শিরা দিয়ে ওয়ান্নায় আগত সকলের কপালে ওয়ানচি থক্কা চিহ্ন দেয়ার মাধ্যমে বরণ করে নেয়। বাড়ির এক পাশে বাঁশ দিয়ে তৈরি রাক্কাসি বা দেবতাকে তুষ্ট করার কাজ চলে। রাক্কাসির পায়ের কাছে আগরবাতি জালানো হয় আর মাথায় একটা মাটির পাত্রে ধূপ জ্বালিয়ে রাখা হয় রাক্কাসির মাথায়। মোরগের গলা হাতে মুচড়ে ভেঙে তার রক্ত উত্সর্গ করা হয় রাক্কাসিকে। মোরগের নাড়ি বা ভুঁড়িটা বের করে টানিয়ে দেয়া হয় রাক্কাসির মাথা থেকে। একজন খামাল বা পুরোহিত উত্সর্গের কাজটি সম্পন্ন করেন। সাসাত্ সওয়া’য় সালজং দেবতার জন্য ধূপ নৈবেদ্য হবে ঘরে ঘরে ওয়ান্থি থক্কা হবে, গৃহ-প্রাঙ্গণে নৃত্য-গীত হবে নকমা, খামালসহ সবার তাতে অংশগ্রহণ থাকবে, আনন্দ ও ভোজন হবে, চু’র আপ্যায়ন থাকবে। দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠানমালার একটি বিশেষ অংশ ‘গুরে ওয়াত্তা’। এই অনুষ্ঠানে মাটির এককোণে রাখা হয় নতুন শস্য কচু, আদা, কুমড়া, আলু, ধানসহ নানা রকমের ফসল। খেজুর পাতার বেড়ার মধ্যে আবৃত করা হয় শস্যকে। আদিবাসী গারোদের বাদ্যযন্ত্র দামা বা ঢোল, আদুরি বা শিংগা, রাং বা কারা, রাংপর বা কাশি, ছানাই বা সানাই। এসব বাদ্যযন্ত্রের তাল ও সুরে নাচন লাগে সারা পাহাড়ে। আবাল, বৃদ্ধ, বনিতা সকলে অংশ নেয় সেই নাচে। তালের ঢঙে প্রকৃতির মাঝেও নাচন ধরে। এর ফাঁকে নৈবেদ্য দেয়া হয় দামাগুলোকে, একটা দামার সঙ্গে অন্য একটা দামাকে বিয়ে দেয়া হয় শাস্ত্রমতে। তাদের বাচ্চাও হয়, এখানেও মোরগের রক্ত দিয়ে দামাকে তুষ্ট করা হয়।
অনুষ্ঠানের আঙিনায় নানা রঙের কাপড়ের সামিয়ানা টাঙানো। গ্রামের অধিবাসীরা সারিবদ্ধভাবে বসে পড়ে চারিধারে রাখা বেঞ্চ ও মাদুরে। অন্যদিকে চলে শুকরের মাংস আর নতুন চালে রান্নার কাজ। সে এক কাহিনি, বিশাল শুকর ছেড়ে দেয়া হয়। সেটাকে সবাই মিলে বধ করে। তারপর আগুনে পুড়িয়ে পশম ছাড়িয়ে নেয়া হয়। পশম ছাড়িয়ে ধুয়ে নেয়া হয়। খাওয়ার উপযোগী করে ছোট ছোট অংশে কেটে রান্না করা হয়। রান্নার সময় কাঁচা মরিচ, কয়েক রকমের পাতা ও লতা দিয়ে আগুনে রান্না করা হয়। শেষের দিকে স্থানীয় একটি ধানের চাল ঢেলে দেয়া হয় সেখানে। চালগুলো কালো বলে রান্না করা তরকারির রঙ একসময় কালো রঙ ধারণ করে। সারাদিন বিভিন্ন পাহাড় থেকে আগতদের আনাগোনায় মুখরিত হয় জনিক নকরেকের বাড়ি। শুরু হয় মধ্যাহ্নভোজের কাজ। আগে থেকে সংগৃহীত গাছের বড় পাতায় দেয়া হয় খাবার। আমাদের জন্য অবশ্য মুরগির মাংস রান্না করা হয়েছিল। খাওয়া শেষ করে শুরু হয় রেরে-র সঙ্গে বিশেষ রকমের নাচ। পরনে থাকা সাধারণ কাপড়ের সঙ্গে একটা নতুন কাপড় পেছন দিক থেকে গলায় পেঁচিয়ে নেয়া হয়। ঘরে জল আন্নাতে নতুন ধানের চাল রান্না করে দেবতাদের উদ্দেশে উত্সর্গ করা হয়। ‘গুরি রুওয়া’ মধ্য দিয়ে শেষ হয় দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠান।
তৃতীয় দিন ‘বিসিরি ওয়াত্তা’, আগামী বছরের জন্য দেবতাদের কাছে বর চেয়ে তাদের বিদায় জানানো হয়। দেবতাদের বিদায়ের পর শুরু হয় গ্রিকা। সব শেষে কাটিগালাতে সকল বাদ্যযন্ত্র বাজানোর পর কাঠিগুলো দেবতাদের উদ্দেশে বিসর্জন দেওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয় ওয়ান্নার সব আনুষ্ঠানিকতা। দামা গগাতা বা রুস্রতা’য় শেষবারের মতো চু ও ধূপ নৈবেদ্য দেয়া হয়, বিকেল নাগাদ বাদ্য-বাজনা সম্পূর্ণ হলে খামালের নৈবেদ্যর মাধ্যমে শেষ হয় প্রার্থনা। বিদায়জ্ঞাপন, শ্রদ্ধা, ভক্তি ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ওয়ানগালা শেষ হয়। একটা বিষয় লক্ষণীয়, অন্যান্য ধর্মে যেখানে প্রকৃতিকে নির্মল ও পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়, সাংসারেক ধর্মমতে প্রকৃতি অপবিত্র। এই নৈবেদ্য দানের মাধ্যমে তারা প্রকৃতিকে পবিত্র করে নেন। সাংসারেক খামাল জনিক নকরেক, খামাল দীনেশ নকরেক এমনটাই জানালেন।
বাংলাদেশে জীবিত সাংসারেক ধর্মগুরুদের মধ্যে জনিক নকরেককেই পাওয়া যাবে। যিনি সাংসারেক ধর্ম আঁকড়ে ধরে আছেন। বর্ণিল এক জীবন তাঁর। খামাল জনিক নকরেক-এর জন্ম বাংলা ১৩১৭ সনের ১ চৈত্র ত্রিপুরার দিশামনিজলায়। তাঁর পূর্বপুরুষেরা একসময় হাবিমা থেকে ত্রিপুরা গিয়ে বসত শুরু করলেও পরবর্তীকালে আবার হাবিমাতে ফিরে আসেন; তখন জনিক নকরেক কৈশোর পেরিয়ে কেবল যৌবনে পা দিয়েছেন। ১৯৫০ সালে হাবিমাতে যখন হাবাহুয়া (জুম চাষ) বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয় তখন থেকেই একে একে হারাতে থাকে মান্দি দাকবেওয়ালের একেকটি আধার। আর খ্রিস্টান মিশনারিদের দাপটে সেই আধারগুলো নেই হয়ে যেতে থাকে একে একে। হাবাহুয়া, সাংসারেক বিশ্বাসবিহীন মান্দিসমাজ থেকে মুছে যেতে থাকে রংচুগালা, ওয়ান্না, গালমাকদু.আ, রকমারাংআ, দেনমারাংআ...আরো কত কত কৃত্যাদি! কিন্তু চারদিকে প্রতাপশালী খ্রিস্ট বিশ্বাস আর রাষ্ট্রীয় প্রবল জাত্যান্ধ দাপটের বিপরীতেও কেউ কেউ মনের দারুণ গভীরে লালন করে চলেন আপন সাংসারেক ধর্মীয় বিশ্বাসকে, নিজের সাধ্যমতো পালন করে চলেন আপন ধর্মের—আপন সংস্কৃতির নানান অনুষঙ্গ অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে।
ওয়ানগালা প্রচলন নিয়ে নানা কাহিনি প্রচলিত আছে। তেমন একটি কাহিনি—
পৃথিবীর মানুষ ওয়ানগালা কী ও ওয়ানগালা কেমন করে পালন করতে হয়, তা জানত না। পাতালপুরীতে মিনমা দ্রংমাই সর্বপ্রথম ওয়ানগালা উত্সব করেছিলেন। একদিন মিনমা দ্রংমা স্থল ও পাতালের যাবতীয় প্রাণীকে নিমন্ত্রণ করলেন। কিন্তু মানবজাতির কোনো প্রতিনিধি সে দাওয়াতে উপস্থিত হলো না। যদিওবা স্থলজ প্রাণিকুলের মধ্যে মানবজাতিই প্রধান ও শ্রেষ্ঠ। পাতালরাজ্যের ওয়ানগালা দেখে এসে মুনেপা জলের রাজা সানেপাকে বিস্তারিত জানান—দসিসি পাখি তার পুচ্ছ নেড়ে নেচেছিল, বাঁশের চটা দিয়ে বাদ্য বাজানো হয়েছিল, রেরুমা হাততালি দিয়েছিল বলে বর্ণনা দেন। সেখান থেকেই নাচ, বাদ্য ও হাতের তালি গারোদের নৃত্যের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে।
আরো একটি প্রচলিত কাহিনি—
‘মিসি চিপিনপা তার ছোট ভাইয়ের বাড়ি বেড়াতে এসে উপযুক্ত সম্মান ও যত্ন-আত্তি না পেয়ে ছোট ভাইকে অভিশাপ দিয়ে পৃথিবীতে চলে আসেন। তিনি যে স্থানটিতে আবির্ভূত হয়েছিলেন সেখানে ছিল একজন বিধবা ও তার পিতৃহীন কন্যার কুঁড়েঘর। যিনি ছিলেন খুব গরিব, দুই বেলা খাবার জুটত না। শুকনো কলাপাতার ছাউনি এবং আমবুসরু নামের বুনো লতা-পাতায় বেড়া দেয়া ছোট্ট কুঁড়েঘরে তারা কোনোরকমে বাস করত। গরিব হলেও এরা ছিল সহজ-সরল। মা-মেয়ে মিলে যখন পাহাড়ি শাক রান্না করছিল, দেবতা সেখানে উপস্থিত হয়ে আশ্রিত হওয়ার বাসনার কথা জানাল। দেবতা বিধবার আর্থিক অবস্থা জেনেও থাকতে চাইলেন এবং বললেন, আমার জন্য কিছুই করা লাগবে না। তুমি শুধু গাছের কষ সংগ্রহ করে, গাছের গুঁড়ো দিয়ে ধূপ জ্বালিয়ে আমার জন্য সুগন্ধি দিও, তাতেই চলবে।’ বিধবা দেবতাকে রাতে থাকতে দিলেন এবং ধূপ জ্বালিয়ে ধূপ-সুগন্ধি উত্সর্গ করলেন। দেবতা খুশি হয়ে বললেন, ‘তুমি যা করেছ, এতেই আমি খুব খুশি হয়েছি।’ এরপর তিনি বিধবাকে পাহাড়ে ফলবে—এমন ধানের বীজ দিয়ে বললেন, ‘আমি প্রতি বছর আম গাছের মুকুল আসার সময় এখানে আসব। সে সময় তোমরা আমার জন্য ধূপ-ধুনা পুড়িয়ে সুগন্ধি উত্সর্গ করে পানাহার করবে।’ এভাবেই ওয়ানগালায় ‘সাসাত্ সওয়া’ বা ধূপ-সুগন্ধি পোড়ানো অনুষ্ঠান যুক্ত হয়।
অন্য কাহিনি—
গারোরা প্রাচীনকালে ভাত খেত না। কারণ ‘ভাত’ বস্তুটির অস্তিত্বই ছিল না। একজন মানুষের সঙ্গে পরিচয় ও বন্ধুত্বের চিহ্নস্বরূপ দেবতা ধানের বীজ দেন এবং তা কীভাবে বপন করতে এবং ফলাতে হবে, সে কায়দা-কৌশল শিখিয়ে দেন। দেবতা বলেন, ‘আমি আমার আবাসস্থলে ফিরে তোমার জন্য ধানের বীজ পাঠাব। ধান যখন সোনালি রঙ ধারণ করে পেকে যাবে, তোমার সুদিন আসবে, তখন আমাকে ভুলে তোমরা খেয়ো না, পানাহার করো না, আমাকে স্মরণ করবে, সম্মান করবে।’ নির্দেশ অনুসারে আ.নি আ.ফিলফা নামের সেই প্রাচীন পাহাড়ি পূর্বপুরুষ মূল ঘরের মধ্যখানের খুঁটির গোড়ায় ধূপ-ধুনা ও চু উত্সর্গ করে দেবতার প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মংরে পাহাড়ে নৈবেদ্য উত্সর্গ করেন। গারোদের ইতিহাসে এটিই প্রথম ওয়ানগালা।
আরো একটি কাহিনি—
একদিন পাতালের রানি পাতালপুরীতে সূর্যহীন অন্ধকারে নেচে-গেয়ে আমোদ-ফূর্তি করছিল। সে-সময় তাকে দেখে এসে চেংসা নকমা চৌরাস্তায় সে মুদ্রাগুলো অনুশীলন করছিল। দুচেংপা ও কামচেংপা নামে দুই ভাই তা দেখে বাড়িতে এসে দামা-খ্রাম তৈরির চেষ্টা করে। এতে ব্যর্থ হয়ে তারা চামড়া দিয়ে দামা ও মাসানচি গাছ দিয়ে খ্রাম তৈরি করে। নিজেদের সাফল্যে খুশি হয়ে তারা বাদ্য বাজিয়ে নাচ-গান জুড়ে দেয়। এভাবে রুগালা, চা.সাত সোওয়ার পাশাপাশি দামা-খ্রাম ও ওয়ানগালার প্রচলন হয়।
