ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপনে হাইকোর্টের নির্দেশনা

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:৩৯

  রুমানা ফারাহ্

 

ওয়ার্ল্ড এলায়েন্স ফর ব্রেস্ট ফিডিং অ্যাকশনের উদ্যোগে এবং ইউনিসেফের সহযোগিতায় ১৯৯২ সাল থেকে প্রতি বছর ১ থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত পালিত হয় বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ। বাংলাদেশেও প্রতি বছর এ দিবস ও সপ্তাহ বেশ গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে। মায়ের দুধের গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিতে বিশ্ব জুড়ে পালিত হয় ‘মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ’। এ বছর বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ-২০২০-এর প্রতিপাদ্য ছিল ‘স্বাস্থ্যকর ধরিত্রীর জন্য মায়ের দুধকে সমর্থন করুন’। শিশুর বেঁচে থাকা তথা বেড়ে ওঠা এবং সঠিক পুষ্টির জন্য মায়ের দুধই সর্বোত্তম ভূমিকা রাখে। অথচ আমাদের দেশের মায়েরা দুধ পান করা শিশুদের নিয়ে জনসমাগমের স্থলে প্রায়ই বিড়ম্বনার মধ্যে পড়েন। এ প্রসঙ্গে একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার গল্প জেনে আসা যাক।

আয়েশা আক্তার (ছদ্মনাম) তার সাত মাসের শিশু সন্তানকে নিয়ে ঢাকা-সিলেটগামী জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ট্রেনের জন্য সকাল ৮টা থেকে রেল স্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন। ৯টার দিকে স্টেশন কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দেয় যে, ট্রেনটি তিন ঘণ্টা লেটে ছাড়বে। এরই মধ্যে হঠাত্ করে শিশুটি কান্না শুরু করে। শিশুটিকে অন্য খাবার দিয়ে ও খেলনা দেখিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করা হলেও কোনো লাভ হচ্ছিল না। কিছুক্ষণ নানাভাবে শান্ত করার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে অসহায় মা একটু নিরিবিলি জায়গা খুঁজছিলেন। কিন্তু শিশুটিকে আড়ালে নিয়ে দুধ পান করানোর মতো একটু জায়গাও তিনি খুঁজে পাননি। শিশুটি কাঁদতে কাঁদতে এক সময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। আমাদের দেশে কত মাকেই না জানি এই বিড়ম্বনার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তার হিসাব নেই। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের যাতায়াত বেশি হয় সেইসব জায়গায় যেমন—রেল স্টেশন, বাস স্টেশন, শপিংমল ইত্যাদি পাবলিক প্লেসে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নারের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। যার ফলে মায়েরা বাধ্য হচ্ছেন শিশুদের দুধ পান করানো থেকে বিরত থাকতে। ৯ মাসের একটি শিশুকে নিয়ে এই ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতার শিকার হয়ে শিশুটির মা ২৪.১০.২০১৯ তারিখে মহামান্য হাইকোর্টে জনস্বার্থে একটি রিট দায়ের করেন। ব্রেস্ট ফিডিং রুম ও বেবি কেয়ার কর্নার স্থাপনে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চেয়ে রিটটি করা হয়। সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন ধারণের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। মায়ের দুধপান শিশুর মৌলিক অধিকার। এছাড়া জনসমাগমের স্থলে স্মোকিং জোন থাকলেও ব্রেস্ট ফিডিং ও বেবি কেয়ার কর্নার নেই। এ সব যুক্তিসমূহ রিটের পক্ষে উপস্থাপন করা হয়। উক্ত রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২৭.১০.২০১৯ তারিখে হাইকোর্ট থেকে একটি রুল জারি করা হয়। উক্ত জারিকৃত রুলে কর্মস্থল, এয়ারপোর্ট, বাসস্ট্যান্ড, রেলওয়ে স্টেশন, শপিংমলের মতো জনসমাগমস্থলে এবং সরকার নিয়ন্ত্রিত, পরিচালিত ও ব্যবস্থাপনায় বিধিবদ্ধ, স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্রেস্ট ফিডিং ও বেবি কেয়ার কর্নার প্রতিষ্ঠায় বিবাদীদের ব্যর্থতা কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। এছাড়া বেসরকারি শপিংমল এবং অন্যান্য জনসমাগমস্থলে ব্রেস্ট ফিডিং ও বেবি কেয়ার কর্নার প্রতিষ্ঠার জন্য একটা প্রস্তাবনা তৈরি করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে তা-ও জানতে চাওয়া হয়। রুল জারির পর রেলওয়ে স্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, বিমানবন্দরে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপনের কাজ শুরু হলেও গার্মেন্টসসহ দেশের কলকারখানাগুলোতে তেমন একটা অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়নি। অথচ গার্মেন্টস সেক্টরে কর্মজীবী নারীদের বেশির ভাগেরই শিশু সন্তান রয়েছে। গার্মেন্টস ও অন্যান্য কলকারখানায় ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার ও বেবি কেয়ার স্থাপনের বিষয়ে নীতিমালা ও আইনি বাধ্যবাধকতা থাকার পরও বিষয়টিকে কখনোই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়নি। ২৪.১০.২০১৯ তারিখে করা রিট আবেদনের সঙ্গে গার্মেন্টস ও কলকারখানায় ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার ও বেবি কেয়ার স্থাপনের নির্দেশনা চেয়ে ১৮.০২.২০২০ তারিখে মহামান্য হাইকোর্টের কাছে একটি সম্পূরক আবেদন করা হয়। বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬-এর শিশুকক্ষ সংক্রান্ত ৯৪(৭) নং ধারা উল্লেখ করে সম্পূরক আবেদনটি করা হয়। উক্ত ধারায় বলা হয়েছে—

‘উক্তরূপ কোনো কক্ষ যথেষ্ট আসবাবপত্র দ্বারা সজ্জিত থাকবে এবং বিশেষ করে প্রত্যেক শিশুর জন্য বিছানাসহ একটি খাট বা দোলনা থাকবে এবং প্রত্যেক মা যখন শিশুকে দুধপান করাবেন বা পরিচর্যা করবেন তখন তার ব্যবহারের জন্য অন্তত একটি চেয়ার বা এই প্রকারের কোনো আসন থাকতে হবে এবং তুলনামূলকভাবে বয়স্ক শিশুদের জন্য যথেষ্ট ও উপযুক্ত খেলনার ব্যবস্থা থাকতে হবে।’

উক্ত সম্পূরক আবেদনের শুনানি শেষে হাইকোর্ট গার্মেন্টসসহ দেশের সব কলকারখানায় দুই মাসের মধ্যে ব্রেস্ট ফিডিং ও বেবি কেয়ার কর্নার স্থাপনের নির্দেশ দেন এবং এ আদেশ বাস্তবায়ন করে শ্রমসচিব ও শ্রম অধিদপ্তরের পরিচালককে ৬০ দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেন।

উপরোক্ত নির্দেশনা প্রদানের অল্প কয়েকদিন পর থেকেই বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের মানবজাতির জীবনধারার স্বাভাবিক নিয়মে আমূল পরিবর্তন আসে। বিশ্বের প্রায় সব দেশে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যকে সামনে রেখে জরুরি নয় এমন সব ধরনের যোগাযোগ ও সমাবেশ বেশ কিছুদিন বন্ধ রাখতে হয়। যার ফলে দেশের সব উন্নয়নমূলক কার্যক্রম মারাত্মক ব্যাহত ও বাধাগ্রস্ত হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলমান সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটলে আদালতের সব নির্দেশনাবলির পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব হবে বলেই আমাদের আগামীর প্রত্যাশা।