সামনের দিনগুলো প্রবাসীদের জন্য কঠিন হবে!

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:৪১

মো. নুরুল আবছার

পৃথিবীর মানচিত্রে ছোট্ট একটি দেশ হলো বাংলাদেশ। আয়তনে ছোট হলেও বর্তমান বছরগুলোয় অর্থনৈতিক বিভিন্ন সূচকে অভাবনীয় সাফল্য অর্জনের মাধ্যমে তাক লাগিয়ে দিয়েছে বিশ্ববাসীকে। দেশের এই বিপুল সম্ভাবনাময় অর্থনীতির অগ্রযাত্রা যে কয়টি খাতের ওপর নির্ভরশীল, তার মধ্যে অন্যতম রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। বাংলাদেশের বিপুল জনসমষ্টি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তারা উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠায়। আর এই প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির স্থবির চাকার গতি বাড়িয়েছে অনেকখানি, সচল রেখেছে আর্থসামাজিক উন্নয়নের চাকা। দেশের মোট জিডিপিতে রেমিট্যান্সের অবদান ১২ শতাংশের মতো। যা টাকার হিসাবে বিশাল একটি অ্যামাউন্ট। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ফলে বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৯ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রিজার্ভ। বর্তমানে ১৭৪টি দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বসবাস। মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি প্রবাসীদের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখেরও বেশি। মধ্যপ্রাচ্য ও সৌদি আরবে রয়েছে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি, তাদের সংখ্যা প্রায় এক দশমিক দুই মিলিয়ন। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুসারে, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ছয়-সাত লাখ মানুষ বিভিন্ন দেশে যায়। এসব প্রবাসী বছরে ১৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠায়, স্থানীয় মুদ্রায় যা ১ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা এবং দেশের মোট রপ্তানি আয়ের অর্ধেকের বেশি। এই বিপুলসংখ্যক লোক দিনরাত পরিশ্রম করে শুধু পরিবারে অন্নের সুব্যবস্থাই করেনি, গতিশীল রেখেছে দেশের অর্থনীতিকেও। করোনার এই দুঃসময়েও সদ্য সমাপ্ত ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবাসীরা রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠায়, যার পরিমাণ ১ হাজার ৮২০ কোটি ৩০ লাখ (১৮ দশমিক ২০ বিলিয়ন) ডলার। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বছরে আহরিত সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স। আমাদের এই দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রবাসীদের পাঠানো এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সমৃদ্ধশালী করছে দেশের অর্থনীতিকে। জীবনযাত্রার মান, কাঠামোগত ক্ষেত্র, নির্মাণ, আবাসন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিত্সা, ব্যাংকসহ বিভিন্ন খাতের উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখে রেমিট্যান্স। আমাদের দেশের বিপুলসংখ্যক প্রবাসী তাদের পরিবারের জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিত্সার জন্য পর্যাপ্ত টাকা পাঠায়। ফলে সরকারের এই বিপুলসংখ্যক পরিবারের জন্য দায়ভার নিতে হয় না। প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে কেমন অবদান রাখে, তা প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা ও অন্য এলাকার উন্নয়ন এবং জীবনযাত্রার মান তুলনা করে দেখলেই বোঝা যায়। সারা বিশ্বে করোনা মহামারি ছড়িয়ে পড়ায় গত মার্চ মাস হতে বাংলাদেশ থেকে নতুন করে জনশক্তি রপ্তানি বা বিদেশে কর্মী পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়। এরপর পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও জনশক্তি রপ্তানি শুরু হয়নি। প্রতি বছর দেশ থেকে প্রায় ১০ লাখের মতো নতুন জনশক্তি রপ্তানি হলেও চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে মাত্র পৌনে ২ লাখের বেশি কর্মী বিদেশে গিয়েছেন এবং করোনা পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপ হওয়ার দরুন আর এক জন কর্মীও বিদেশ যেতে পারেননি। শুধু তাই নয়, একই কারণে দুই লাখের মতো প্রবাসী দেশে এসে আটকা পড়েছেন। প্রবাসীরা তাদের কর্ম ক্ষেত্রে নিশ্চিত হতে পারছেন না যে, তারা কি ওখানে থাকতে পারবেন! এ অনিশ্চয়তার কারণে তাদের যে জমানো টাকা বা পুঁজি আছে তা পাঠিয়ে দিচ্ছেন দেশে। কারণ তাদের চলে আসতে হলে ঐ সময় নগদ টাকা কতটা নিয়ে আসতে পারবেন তার নিশ্চয়তা নেই।’ তাছাড়া করোনায় রেমিট্যান্স আহরণের দেশগুলোর অচল অবস্থায় বেকার হয়ে পড়েছেন অনেক প্রবাসী। স্থায়ীভাবে চাকরি হারিয়েছেন অনেকেই। যার ফলে সামনের দিনগুলো প্রবাসীদের জন্য কঠিন হওয়ার পাশাপাশি রেমিট্যান্সের ধারাও থাকবে নিম্নমুখী, যা হবে বেশ দীর্ঘমেয়াদি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ থাকায় এবং দেশে-বিদেশে প্রবাসীরা আটকে পড়া ও সব পুঁজি নিয়ে দেশে স্থায়ীভাবে ফিরে আসার কারণে দীর্ঘ মেয়াদে প্রভাব পড়বে রেমিট্যান্সে। যার রেশ হতে পারে খুবই ভয়াবহ।

n লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ,

 ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।