প্রাণিসম্পদ ও টেকসই অর্থনীতি

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:২৪

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদ খাতের কলেবর অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশের মতো প্রাণিসম্পদ খাত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কৃষিসংশ্লিষ্ট মানুষজনের জীবন ব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মোট অভ্যন্তরীণ উত্পাদন বা জিডিপিতে এই খাতের অবদান প্রায় ১৪ দশমিক ২১ শতাংশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রাণিসম্পদ খাতের জিডিপির আকার ছিল ৩২ হাজার ৯১০ কোটি টাকা, যা এর আগের অর্থবছর অর্থাত্ ২০১৪-১৫ সময়কালের তুলনায় ৩ হাজার ২৩ কোটি টাকা বেশি। (সূত্র: বিবিএস ২০১৫-১৬)। এভাবে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, মুরগি, হাঁসের সংখ্যা প্রতিবছর জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধিতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়?সীমিত ভূখণ্ড, অত্যধিক জনসংখ্যা, দ্রুত বিকাশমান শিল্পখাত আর ব্যাপক নগরায়ন সত্ত্বেও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি পালন যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে, বাংলাদেশের জনগণ সে বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছে।

প্রাণিসম্পদ তথা পশুপালন মানবসভ্যতার আদিমতম পেশা হিসেবে বিবেচিত। আদিম মানুষ হিংস্র নেকড়ে ও কুকুরকে হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগিয়ে পশুপাখি শিকার করত। শিকার করা পশুপাখিই ছিল তাদের খাদ্য। উদ্বৃত্ত পশুপাখি খাদ্য হিসেবে প্রতিপালন করে মানুষ একসময় প্রাণিসম্পদকে বিনিময়ের কাজে ব্যবহার করে, যা মানবসভ্যতাকে নিমিষেই নতুন এক স্তরে পৌঁছে দেয়। আমাদের অঞ্চলেও কৃষি ও অকৃষি কাজে প্রাণিসম্পদের ব্যবহার প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই হয়ে আসছে। উর্বর সমতল ভূমির বাংলাদেশ অঞ্চল স্বভাবতই হাজার হাজার বছর আগে থেকেই কৃষিনির্ভর। এর পেছনে পশুসম্পদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এ অঞ্চলের মানুষের কাছে প্রাণিসম্পদ শুধু কৃষিকাজেই নয় জ্বালানি, জৈবসার ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। ডিম, দুধ, মাংসের চাহিদা পূরণ করে বর্তমানে প্রাণিসম্পদ বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশে দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টির অন্যতম পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আর এ কারণেই মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে ভিশন-২০২১-এ বাংলাদেশের ৮৫ শতাংশ লোকের জন্য পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবারের নিশ্চয়তার লক্ষ্য নির্ধারিত রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে মাথাপিছু ২৫০ গ্রাম দুধ, ১২০ গ্রাম মাংস এবং সপ্তাহে ২টি করে ডিমের চাহিদা নিশ্চিত করা হবে।

নদীবিধৌত বাংলাদেশের জলবায়ু পশুপাখি প্রজননের জন্য অনুকূল। ফলে প্রাণিসম্পদে বিনিয়োগ যে লাভজনক, তা হাঁস-মুরগি খামার শিল্পে অভূতপূর্ব উন্নয়নই প্রমাণ করে। কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে গত পাঁচ বছরে দুধ, মাংস ও ডিমের উত্পাদন যথাক্রমে ৩৪ দশমিক ৬০ লাখ মেট্রিক টন থেকে ৭২ দশমিক ৭৫ লাখ মেট্রিক টন, ২৩ দশমিক ৩০ লাখ মেট্রিক টন থেকে ৬১ দশমিক ৫২ লাখ মেট্রিক টন এবং ৭৩০ দশমিক ৩৮ কোটি থেকে ১ হাজার ১৯১ দশমিক ২৪ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধিতে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে ২০১৬ সালে দেশে কোরবানি যোগ্য গরু-মহিষের সংখ্যা ছিল ৪৪ লাখ ২০ হাজার এবং ছাগল ও ভেড়া ৭০ লাখ ৫০ হাজার, যা বাংলাদেশের জনগণের পশু কোরবানির চাহিদা শতভাগ পূরণে সক্ষম হয়েছে। রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপের কারণে পোল্ট্রি শিল্পে বাংলাদেশ বিপ্লব সাধন করেছে। বর্তমানে এই খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ২৫ হাজার কোটি টাকা। তৈরি পোশাক বা গার্মেন্টস শিল্পের পর পোল্ট্রি শিল্প কর্মসংস্থানের দিক দিয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত, যেখানে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৬০ লাখ লোক নিয়োজিত (সূত্র: বার্ষিক প্রতিবেদন-২০১৫-২০১৬, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর)।

অত্যন্ত অনুকূল জলবায়ু ও পরিবেশ-পরিস্থিতি বিরাজ করা সত্ত্বেও বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদের এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। ডিম ও দুধ উত্পাদন প্রতিবছর অনেকটা জ্যামিতিক হারে বেড়ে চললেও বর্তমানের চাহিদার তুলনায় তা যথেষ্ট নয়। ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার তথ্যমতে, ডিম ও দুধের আনুমানিক ঘাটতি যথাক্রমে ৫৭ ও ৩৩ শতাংশ। গবাদিপশুর গড় ওজন যথেষ্ট কম?গাভী ও ষাঁড় যথাক্রমে ১০০ ও ১৫০ কেজি, যা ভারতীয় গবাদিপশুর তুলনায় ২৫-৩০ শতাংশ কম। উল্লিখিত তথ্যে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, প্রাণিসম্পদ খাতের বিকাশে বাংলাদেশে ‘স্বর্ণসুযোগ’ তৈরি হলেও, এ খাতের জন্য বাংলাদেশকে দ্রুত বহুমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে।

ভিশন ২০২১ এবং ২০৪১ কে সামনে রেখে ডিম, দুধ ও মাংসের চাহিদা ও সরবরাহের অনুপাত সামঞ্জস্যপূর্ণ করা প্রয়োজন। এ জন্য বর্তমানে ডিম দুধ ও মাংস উত্পাদন বৃদ্ধির পথে যেসব প্রতিবন্ধকতা আছে যেমন স্থানীয় পর্যায়ে দুগ্ধখামারি ও কৃষকের অভাব, পশুপাখির খাবারে ভেজাল, প্রাণিসম্পদের সুষম খাদ্যের অভাব, পশুপাখির সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব, বর্জ্য অপসারণে অব্যবস্থাপনা, ওষুধের উচ্চমূল্য, উপযুক্ত বাজারজাতকরণের অভাবের মতো সমস্যাগুলো দূর করতে হবে। গ্রামীণ ক্ষুদ্র খামারি ও কৃষককে প্রাণিসম্পদ উত্পাদনে উদ্ধুদ্ধ করা প্রয়োজন। আর্থিক সেবায় খামারিদের অভিগম্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। খসড়া জাতীয় প্রাণিসম্পদ নীতিমালা ২০০৭ এবং খসড়া জাতীয় প্রাণিসম্পদ নীতিমালা ২০১৩ চূড়ান্ত  করা প্রয়োজন।

n লেখক:উন্নয়ন ও পরিবেশ গবেষক এবং সহযোগী সদস্য, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি