রুমুকে নিয়ে বিপদে পড়েছে ওর মা। স্কুল নেই। কোথাও যাওয়া হয় না। ঘরবন্দি মেয়েটি আর কত একা একা খেলবে। কাজের মেয়েটিকেও নিষেধ করে দিয়েছে ওর বাবা। এখন রুমুর বাবা অফিসে যান। আবার তাড়াতাড়ি চলে আসেন। মেয়েকে নিয়ে খেলেন। গল্প করেন। মাঝে মাঝে বই নিয়ে বসেন। সব পড়া যেন শেষ হয়ে গেছে। রুমু বাইরে যেতে চায়। পাশের ফ্ল্যাটের মনি ও মোনার সাথে খেলতে চায়। মা বারণ করেন—এখন কারো বাসায় যাওয়া যাবে না মা। রুমু জানতে চায়—কেন? আগে তো ওরা আমাদের বাসায় আসত। আমিও যেতাম। এখন কেন যাওয়া যাবে না আম্মু? আম্মু ক্লাস ওয়ানের ছোট মেয়েটিকে কী করে বোঝাবে যে, এখন সময়টা ভালো না। করোনকালের দুঃসময় চলছে। এ সময়ে কেউ কারো বাসায় যায় না। শুধু বলে—এখন মনিদের বাসায় গেলে জ্বর হবে। মনি আমাদের বাসায় এলে ওরও জ্বর হবে। তাই যাওয়া যাবে না। এবার ছোট্ট রুমু গো ধরে—তাহলে আম্মু, ছোট খালামনির বাসায় চলো যাই। আবির ভাইয়ার সাথে কম্পিউটারে গেম খেলবো। বিপদ বেড়ে যায় রুমুর মায়ের। —ওখানেও জ্বর হতে পারে। রুমু এবার বিরক্তিতে বলে ওঠে—ওখানে গেলে কিছু হবে না। খালু তো ডাক্তার, জ্বর হলে ওষুধ দিবে। কোনোভাবে মেয়েকে নিবৃত্ত করা যাচ্ছে না। তাই দেখে রুমুর আম্মা অন্যভাবে মেয়েকে সামলানোর চেষ্টা করেন।
বিকল্প হিসেবে বলেন—আম্মু, আজ রাতে তোমার বড় মামার সাথে আমরা অনলাইনে কথা বলবো। মামা যখন কানাডা থেকে আসবেন, তোমার জন্য কী আনবেন, বলে দিয়ো। কিছুটা শান্ত হয়ে আসে রুমু। আহ্লাদে বলে ওঠে—আজকে বড় মামার সাথে কথা না বললে আমি কিন্তু রাগ করবো। আম্মা তার কথায় সায় দিয়ে বলেন—রাগ করতে হবে না। অবশ্যই আজ কথা বলবো মা।
ভাদ্র মাস। বর্ষা শেষ হয়নি এখনো। আকাশে সাদা-কালো মেঘ। কখনো কখনো খুব অন্ধকার হয়ে আসে। এখন বৃষ্টি পড়ছে জোরেশোরে। রুমু বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। ঝড়ো বাতাসের দোলা গায়ে লাগে তার। মা আসে। তাকে ধরে নিয়ে যেতে চায় ঘরের ভেতর। আপত্তি জানায় সে। —না, আমি যাবো না। বৃষ্টি দেখবো। বৃষ্টি দেখতে ভালো লাগে আমার। তুমি যাও আম্মু, আমি যাবো না। মা’র ভয়, যদি বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে লাগে তার। তাহলে তো জ্বর আসবে। তাই মা’র মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। রুমুর গায়ে আলতো ছোঁয়ায় হাত দিয়ে বলেন—মা, চলো আমরা দুজনে বিছানায় বসে জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখবো। বৃষ্টির ছড়া বলবো। চলো মা। রুমু আর আপত্তি করে না। তার মন খুশিতে ভরে ওঠে। বিছানায় দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে ডান হাত বাড়িয়ে দেয় বাইরে। দু-একটা বৃষ্টির ফোঁটা তার হাতের তালুতে এসে পড়ে। মা রুমুর পাশে বসে সুরে সুরে বলতে থাকেন—‘মেঘের খেলা দেখে কত খেলা পড়ে মনে/ কত দিনের লুকোচুরি কত ঘরের কোণে!/ তারি সঙ্গে মনে পড়ে ছেলেবেলার গান—/বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদেয় এল বান।...’ রুমুর মন আনন্দে নেচে ওঠে। বৃষ্টি যেন মিষ্টি মধুর হয়ে ঝরতে থাকে।
