পঠন

ব্যক্তিগত স্নানালয়

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২০:৪৩

কখনো কবিতাই উস্কে দেয় কবিতাকে; এক কবির কবিতা অপর কবিকে। প্রত্যেকেরই প্রিয় কিছু কবিতা থাকে। যাঁরা কবিতা লেখেন বা লিখতে চান কিংবা লেখার চর্চা করেন—তাঁদের তো থাকাই স্বাভাবিক। যখনই থেমে যায় অনুভূতি বা উপলব্ধির উত্সমুখ, তখন হয়তো ওই কবিতাগুলোর কাছেই কবিরা ফিরে ফিরে যান। আশ্রয়ের জন্য। আত্মনবায়নের জন্য। আর ফিরে আসেন নতুন বোধ নিয়ে। এ-ও যেন স্নানের মতো। শরীরের ময়লা ধুয়ে ফেলে আরেকটি দিনের যাত্রা শুরু করার মতো। তখন মনে হয় যেনবা নতুন দৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে পৃথিবীকে। সেই আশ্রয়, আত্মনবায়নের খেলা যেন এক উত্সমুখ। প্রেরণাজলের। ব্যক্তিগতভাবে আমার ভালোলাগা তিনটি কবিতাকে ঘিরেই ছোট্ট এই লেখা।

 

‘একই মাটিতে জলে আমি বানালাম বিশ্ব

তুমি ভিন্ন করে নাম দিলে ইরান, তাতার দেশ, জাঞ্জিবার;

মৃত্তিকার অণুকণা দিয়ে আমি বানালাম লৌহ

তুমি তাই দিয়ে তৈরী করেছ যত তরোয়াল, তির আর বন্দুক

বাগানের কাঠ কাটবার জন্যে তুমি বানালে কুড়োল,

আর যে পাখী গান করে তার জন্যে খাঁচা।’

(ঈশ্বর/মহাকবি ইকবাল/অনুবাদ :অমিয় চক্রবর্তী)

মানুষের অবিমৃশ্যকারিতা চিরকালই আমাকে স্তম্ভিত করে। অভিযোগের তর্জনী অপরের দিকে না উঠিয়ে নিজের দিকেই ফেরাতে শেখায়। মানুষ হিসেবে আসলে কী করেছি বা করছি কিংবা করব? যা-ই করি না কেন, তার বিরাট একটা অংশ জুড়ে থাকবে বিনাশের কর্মযজ্ঞ। এমনটা করেই মানুষ অভ্যস্ত। এভাবে পৃথিবীকে ভয়ানক কোনো অসুখের দিকে ঠেলে দিতে দিতে—আমরা নিজেরাই একদিন হয়ে দাঁড়াব নিজেদের ধ্বংসের কারণ। বিশ্ব জুড়ে চলমান কোভিড-১৯ অতিমারির জন্য মানুষের হঠকারী ক্রিয়াকলাপই কি দায়ী নয়! কত বছর আগেই তো মহাকবি ইকবাল এমনটি ভেবেছিলেন। তাঁর শরীরের হয়তো মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর ভাবনার রেশ। মানুষের মজ্জাগত অন্ধকারের দিকে ফিরে তাকানোর প্রেরণা পাবার জন্য, নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপনের সাহস সঞ্চার করার জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে এই কবিতাটির কাছে ঋণী।

 

‘এই মর্গে শুয়ে শুয়ে এই কালো মাদুদের গনা আমিই শুনেছি

এই রাতগুলি আর এই দিনগুলি সব আমিই শুনেছি।

আমাকে কবর থেকে তোলো, দেখ, লিখে আর

                                                                     কাটাকুটি করে

গায়ের কাফন আমি ভরেছি তারায়, শিশিরে।’

(উত্সর্গ/আবিদ আজাদ)

কবিতা চিরকালই আত্মদহনের এক খেলা। আত্মদহন ছাড়া কবিতাও হয় না। আমি অবশ্যই সুপারফিশিয়াল লেখার কথা বলছি না। শব্দের চমক বা বাক্যের পর বাক্য সাজিয়ে বোধহীন স্তবক রচনা করা মস্তিষ্কের ব্যায়ামমাত্র। ওগুলোর জন্য আত্মদহনের কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু প্রতিটি ‘কবিতা’য় কবির আত্মদহনের যে ভাষ্য চোরাস্রোতের মতো বইতে থাকে, সেই আর্তিই যেন ঝরতে থাকে আবিদ আজাদের এই কবিতায়। সেই সাথে একটা প্রস্তুতির কথাও যেন উহ্য রাখে কোথাও—সামান্য শিশির থেকে বিরাট তারায় নিজেকে দেবার জন্য লিখতে আর নিজেরই ব্যবচ্ছেদ করতে।

 

‘আচ্ছা, কী আশ্চর্য দ্যাখো, সমস্ত জীবন,

প্রায় প্রত্যেকটা দিন, সবচেয়ে বেশি ক’রে

যে জিনিসটা পুড়ল,— সেই কিনা

পুড়বে না তখন!

মন,

মন তো একটুও পুড়বে না—

স্ট্রেচারে, লোহার ট্রে-তে শুয়ে তুমি ঢুকে পড়বে

                                ফার্নেসে যখন!’

(দাহ্য/জয় গোস্বামী)

জয় গোস্বামীর এই কবিতাটি জাগতিক নশ্বরতার দিকে তাকাতে বাধ্য করে। সকলকেই করে বা করবে হয়তো। সঙ্গে ধরা পড়ে কবিতার আরেক চারিত্র্য—শব্দের আপাতবিরোধ থেকে আরেক অর্থ বের করে আনা এবং প্রচল, কিন্তু অজ্ঞাত কোনো সত্যের খোঁজ দেওয়া। হ্যাঁ, প্রতিদিনই তো বিভিন্ন কারণে মন পুড়ছে—মুদ্রা হারানোর বেদনা থেকে শুরু করে প্রিয় মানুষের শবদেহ পোড়ানোর বেদনায় পুড়ে পুড়ে যাচ্ছে মন। কিন্তু আমার শবদেহ যখন জ্বলবে চিতায় তখন আমার মন একটুও পুড়বে না কেননা মন তার আগেই উড়াল দেবে। মনহীন, প্রাণহীন সেই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ‘পোড়া’র সঙ্গে ইন্দ্রিয়ের অতীত ‘মন পোড়া’র একটা অর্থগত সংঘর্ষ বাঁধিয়ে কবিতাটি চলে যায় এক অমোঘ সত্যের দিকে—প্রচল, পরিচিত যে সত্য এতকাল লুকিয়ে রেখেছিল নিজেকে, অন্তত আমার কাছে। এই অর্থে, কবিতাও একপ্রকার উন্মোচন—পরিচিতের কিংবা অপরিচিতের।

 

জীবনানন্দ বলেছিলেন, কবিতা অনেক রকম।  কিন্তু উপহারের বাক্সের ভেতরে যদি কিছু না-ই থাকে তাহলে কেন বাক্স খুলতে যাবে লোকে; সেই লোক কবি বা পাঠক—যে কেউই হতে পারেন। শব্দ বা বাক্যের এলোমেলো অথবা গোছানো প্রবাহের ভেতর যদি কোনো চিন্তা, ভাবনা, বোধ বা সাধারণভাবে অর্থের উপস্থিতি না থাকে তাহলে ওই প্রবাহকে শূন্য বাক্সের মতো লাগা স্বাভাবিক। ওপরে ঝাঁ-চকচকে; ভেতরে শূন্যতা কেবল। আর এখানেই ভাবনার বা অর্থের উপস্থিতি কাম্য হয়ে ওঠে কবিতায়। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে চাক পালান্যিকের একটি কথা—পাথর ভাঙে। কাঠ পচে যায়। মানুষও মৃত্যুর দিকে হাঁটে। কিন্তু, খুব সামান্য কিছু, সাধারণ কিছু—যেমন কোনো স্বাধীন চিন্তা বা স্বপ্ন বা কিংবদন্তি বেঁচে থাকে এবং বাঁচতেই থাকে।

 

কবিতা বেঁচে থাকুক।