মারজুকা রায়না
দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখন সবচেয়ে প্রকট ও মারাত্মক সমস্যার মধ্যে অন্যতম। সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে পরিবেশ এখন মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। যদি বলি প্রকৃতিকে প্রতিনিয়ত গলা টিপে হত্যা করা হচ্ছে এখন দম আটকে গেছে শ্বাস ফেলতে পারছে না তবে ভুল হবে কি? প্রকৃতি এখন তার সহ্যক্ষমতা হারিয়ে তার জবাব সময়মতো দিচ্ছে আর তা গোটা জাতি ও দেশ শুধু চেয়ে দেখছে। মানুষকে তার কর্মের ফল ভোগ করতেই হচ্ছে, দেওয়ালে পিঠ আটকে গেছে আমাদের। এখনো যদি আমরা সচেতন না হই তবে ভবিষ্যত্ প্রজন্ম শ্বাস ফেলে বাঁচতে পারবে না। বর্জ্য এবং বিশেষত শহরাঞ্চলীয় শিল্পবর্জ্য ঠিকমত ব্যবস্থাপনার অভাবে যেসব সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে সেগুলোর মধ্যে—পানিদূষণ, বায়ুদূষণ, ম্যালেরিয়া, শ্বাসকষ্ট, এলার্জি, শিশুমৃত্যু ও বিবিধ পানিবাহিত রোগের বিস্তার প্রধান। তাছাড়া প্রকট দুর্গন্ধে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ও শিশুদের মানসিক বিকাশে মারাত্মকভাবে প্রভাব বিস্তার করছে।
জৈব রাসায়নিক বর্জ্য বা হাসপাতালের বর্জ্য বাংলাদেশের জন্য খুবই বিপজ্জনক। জৈব রাসায়নিক বর্জ্যের মধ্যে ২০% বর্জ্য অতিমাত্রায় সংক্রামক এবং এগুলো সরাসরি পয়ঃনিষ্কাশন প্রণালী বা নালায় অবমুক্ত করা হয়। এ ধরনের দুর্বল ব্যবস্থাপনা এলাকাবাসীর স্বাস্থ্যে সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করে। অধিকাংশ শিশুমৃত্যুর জন্য এই সংক্রমণই দায়ী। কঠিন বর্জ্যসমূহ নিষ্কাশন নালার পথরোধ করে এবং সড়কে জলাবদ্ধতা সৃষ্টির অন্যতম কারণ এটি। এছাড়া পথেঘাটে আবর্জনার স্তূপ হতে দুর্গন্ধ ছড়ায় যা পরিবেশ ও বায়ুদূষণ ঘটায় আর মশার বংশবিস্তার ও প্রাদুর্ভাবের অন্যতম কারণ এই ময়লার স্তূপ।
যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলার ব্যাপারটা আমাদের বদঅভ্যাসে পরিণত হয়েছে। রাস্তার পাশেই ময়লা ফেলার ডাস্টবিন কিন্তু আমরা সবাই ময়লাগুলো ডাস্টবিনে না ফেলে এর আশপাশেই ফেলি। এর ফলে এক দিকে যেমন পরিবেশ দূষিত হচ্ছে অন্য দিকে রোগজীবাণুর আক্রমণে স্বাস্থ্যও হুমকির মুখে পড়ছে।
খালি মাঠে, রাস্তার পাশে, অলিগলিতে সব জায়গাজমি ময়লা-আবর্জনার ডিপো। মশা, মাছি, কুকুর, কাকের আস্তানা। দুর্গন্ধে রাস্তার পাশ দিয়ে চলাচল করা যাচ্ছে না। নাকে রুমাল চেপেও হাঁটা যাচ্ছে না। দিনদিন পরিবেশ আরো নাজেহাল হয়ে পড়ছে। কেন এই অবস্থা? পৌরসভাভিত্তিক শহরগুলোতে আমাদের দেশে এ ব্যাপারে কোনো তাগিদ এবং কাজ করছে না বললেই চলে। একটি পরিবার থেকে প্রতিদিন গড়ে তিন/চার কেজি সবজির খোসা ও অন্যান্য ময়লা তৈরি হয় কিন্তু পৌরসভা এ ময়লা সংগ্রহ করার কোনো ব্যবস্থাই করছে না যার ফলে ময়লাগুলো পলিথিনে মোড়াই করে আশপাশে খালি মাঠ, রাস্তার আশপাশ, যেখানে সেখানে ফেলা হচ্ছে। ফলে শহরের রাস্তা ও অলিগলি এখন ময়লার ডিপো।
সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা যত দ্রুত সম্ভব এ ব্যাপারে উদ্যমী না হলে পরিবেশ দূষণ ও রোগজীবাণুতে নাজেহাল অবস্থার সৃষ্টি হবে। এখনই নাজেহাল হয়ে পড়েছে। বিভাগীয় শহর তো বটেই, জেলাশহর, উপশহরের রাস্তাঘাট অলিগলি কোথায় নেই ময়লার ডিপো?
সিটি করপোরেশন আর পৌরসভা উদ্যমী না হলে জনগণ কতটা সচেতন হবে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। উদাহরণ হিসেবে জাপান, চীন, সিঙ্গাপুর এই দেশগুলো যেভাবে ময়লা-আবর্জনা নিষ্কাশন করে সেভাবে যদি আমাদের দেশের সিটি করপোরেশন আর পৌরসভাগুলো কার্যক্রম চালায় তবে অনেকটা সুস্থ পরিবেশ আমরা পেতে পারি। সুস্থ পরিবেশ স্বাস্থ্য আর মন দুটিই সুস্থ রাখতে পারে, শুধু তাই না ইতিবাচক মনমানসিকতাও গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। কেন আমরা একটু সচেতন নই? এখন দিন বদলে গেছে। উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরাও এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদেরও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা শিখতে হবে। আমরা নিজেরা একটু সচেতন হলে বাসাবাড়ি, আশপাশ থেকে রাস্তাঘাট পর্যন্ত সবকিছু পরিষ্কার রাখতে পারি। শুধু নিজের জন্য নয় নিজের পরিবারের জন্য হলেও পরিষ্কার পরিছন্ন থাকাটা খুবই জরুরি। কারণ পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
