চুলের নানা বাঁধন...

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৯:২৬

চুলের ঢং নাকি চেহারাকে অনেকটাই বদলে দেয়। তবে সবার চুলের আকার, ঘনত্ব আর ধরন তো এক নয়। অনেকে আবার চুল কাটতেও চান না। তাতে কী আসে-যায়! বয়স, রুচি, ব্যক্তিত্ব, কোথায় যাওয়া হচ্ছে এবং কেমন পোশাক পরা হচ্ছে, তার সঙ্গে মিল রেখে চুলের আদলটা সহজেই বদলে ফেলতে পারেন। তা হলে হয়তো নিজেকে সবার চেয়ে আলাদা করে উপস্থাপন করা যাবে। এ নিয়ে লিখেছেন লোপা চৌধুরী

অলস দুপুরে কিংবা রাতে ঘুমানোর আগে রূপকথারা শৈশবে যে কল্পরাজ্য গড়ে দিত তাতে রাজকন্যা মানেই ছিল রূপবতী। আর রূপবতী মানেই কেশবরণ কন্যা। রূপবতী হতে গেলে কেশবতী হতে হবেই। এ ধারণা গড়ে উঠেছিল সেই শৈশবের রূপকথা থেকেই। এই তো কিছুদিন আগেও মেয়ে দেখার সময় হবু কনেকে চুল খুলে দেখাতে হতো দেখতে আসা পাত্রপক্ষকে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সে চুলের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ পরখ করে তবেই পাত্রপক্ষ সিদ্ধান্তে আসত মেয়ে রূপসী কি না। আজ আর পাত্রী দেখতে এসে মেয়ের চুল খুলে দেখার চল নেই। তবে কেশ সৌন্দর্যকে গুরুত্ব দেওয়ার মনোভাবটির তেমন কোনো হেরফের ঘটেনি। সময় যেমন বদলেছে, বদলেছে তেমনই কেশ চর্চার ধরন-ধারণা। এখন আর চুলে পরিচর্যার উপকরণ তেল, বিনুনি, দড়ি বা কাঁধের কাঁকুইতে সীমাবদ্ধ নেই। এসেছে লোশন, জেল শ্যাম্পু কন্ডিশনার। কালো চুলের ধারণা ভেঙে নানা রঙে চুল রং করা, হাইলাইটস করা ইত্যাদি এখন জনপ্রিয়। সে যাই হোক, এখন হেয়ার স্টাইল গুরুত্ব পায় বেশি। গুরুত্ব পায় চুলের স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা আর যত্ন। আর এ যত্ন পুরোটা নির্ভর করে আপনার চুলের ধরনের (তৈলাক্ত, শুষ্ক ও স্বাভাবিক) ওপর। চুল তৈলাক্ত হওয়ার অর্থ ত্বকের ওপর আপনার চুল অর্থাত্ স্ক্যাল্পের সেবা শিয়াস গ্রন্থির অতিরিক্ত সেবাম নিঃসরণের ফলে আপনার চুল তৈলাক্ত হয়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি চুলের গোড়া পরিষ্কার রাখা। সময় করে হার্বাল শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে নিন। খেয়াল রাখবেন শ্যাম্পু যেন কন্ডিশনার ছাড়া হয়। আলাদা কন্ডিশনার ব্যবহার করুন শ্যাম্পুর পরে। ভেজা চুল আঁচড়াবেন না। টাওয়েল দিয়ে ভেজা চুল ঘষে মুছলে চুলের ক্ষতি হয়। এ ধরনের চুলে তেল ব্যবহার করার বেশি দরকার হয় না। ভেজা থাকাকালীন চুল বাঁধবেন না। বাড়িতে নিজেই তৈরি করে নিতে পারেন আপনার শ্যাম্পু। দীর্ঘদিন ধরে চুলের একই রকম কাট দেখতে দেখতে একটু কি একঘেঁয়ে লাগছে নিজেকে? তাহলে দেরি না করে হাল ফ্যাশনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চুলে একটি কাট নিয়েই ফেলুন। চুল লম্বা বা ছোট যা-ই হোক না কেন, মানানসই কাট কিন্তু বদলে দিতে পারে আপনার পুরো চেহারাকেই। চুলের ধরন ও ব্যক্তিত্ব বিবেচনায় রেখে আপনার নিজের জন্য কোন হেয়ার কাটটি প্রযোজ্য তা বেছে নিন। এ রকম কয়েকটি জনপ্রিয় হেয়ার কাটের কথা এখানে তুলে ধরা হলো—

শ্যাগ

ষাটের দশকে তুমুল জনপ্রিয় ছিল এই হেয়ার স্টাইলটি। বহু বছর পর সেই ফ্যাশনটিই আবার ফিরে এসেছে নতুন ঢঙে। বর্তমানে শ্যাগে অনেক বেশি লেয়ার করে কাটা হচ্ছে চুল। যাতে চুলের ভলিউম বেশি দেখায়। এ স্টাইলের চুল কমপক্ষে কাঁধ পর্যন্ত থাকবে। চাইলে এর থেকে বেশিও রাখতে পারেন।

ফরোয়ার্ড গ্র্যাজুয়েশন লেয়ার

এই ফ্যাশনটি ওয়েভি ও স্ট্রেইট চুলের জন্য। নিচ থেকে চুলের আগা পর্যন্ত সামনের দিকে লেয়ার করে কাটা হয় এ স্টাইলে। এতে লেয়ারটি গ্র্যাজুয়েলি থাকে। লম্বা চুলের জন্য এ কাটটি মানানসই। যাদের গলা ছোট ও উচ্চতা কম, তারা এ স্টাইল করবেন না।

ডিসকানেকটেড লেয়ারস

বর্তমানে তরুণীদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় কাট ডিসকানেকটেড লেয়ারস। স্ট্রেইট চুলে ভালো মানায়। এই কাটে চুলের ভলিউম বেশি মনে হয়।

ইমো : টিনএজারদের কাছে হেয়ার কাটের একেবারে নতুন ট্রেন্ড হচ্ছে ইমো কাট। এর জন্য মাঝারি লম্বা চুল থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে অনেকটা শ্যাগ স্টাইলে চুল কাটা হয়। কিন্তু সামনে চুল এক সাইডে বড়-ছোট মিলিয়ে ব্যাঙস রাখা হয়। সামনের এবং কানের পাশের চুলগুলো মুখের ওপর প্রায় ছড়িয়ে থাকে। এটিকে ইমো সুইপ বলে।

চিককাট : চুলের ধরন হতে হবে স্ট্রেইট। সাধারণত চৌকোনা মুখের মেয়েদের এ কাটটি ভালো দেখায়। চেহারার সঙ্গে যেন সুন্দরভাবে খাপ খায় সেদিকে লক্ষ্য রাখা জরুরি।

ফেদার কাট :চোখা চোখা অনেক লেয়ার থাকে এ স্টাইলে। সব ধরনের পোশাকের সঙ্গেই মানিয়ে যায় এ কাটটি। ওয়েভি ও স্ট্রেইট চুলের জন্য প্রযোজ্য এটি।

শ্যাভেজ :অগোছালোভাবে অসংখ্য লেয়ার করা হয়। যাদের চুল পাতলা তাদের জন্য উপযুক্ত এ স্টাইল। কারণ এটিতে চুল ঘন দেখায়।

সোজা চুল পেতে

যাদের চুল কিছুটা কোঁকড়া, তারা অনায়াসেই রিবন্ড করিয়ে নিতে পারেন। তবে যারা স্থায়ীভাবে রিবন্ড না করে কিছু সময়ের জন্য চান চুলটা সোজা হোক, তারা চুলের জন্য উপযোগী আয়রন দিয়ে তা সোজা করে নিতে পারেন। প্রথমে চুল ভালোভাবে শ্যাম্পু করে কন্ডিশনার ব্যবহার করতে হবে। এরপর আয়রন দিয়ে অনায়াসেই চুল নিজের মনমতো সোজা করে নেওয়া যায়।

ব্লো ড্রাই স্পাইরাল

ভলিউম লেয়ার কাট কিংবা লেয়ার স্টেপ কাট চুলের জন্য ব্লো ড্রাই স্পাইরাল খুব মানায়। এ ক্ষেত্রে চুলের ওপর থেকে কাঁধ পর্যন্ত হেয়ার ড্রায়ারের সাহায্যে ব্লো ড্রাই করে নিতে হবে। তবে অনেকেই আয়রন মেশিন ব্যবহার করতে চান। কিন্তু ব্লো ড্রাই করলে চুল স্বাভাবিকভাবে বেশ সুন্দর দেখায়। এরপর কাঁধ থেকে নিচের বাকিটা চুল কিছুটা আঁচড়ে বা চিরুনি দিয়ে বাঁকিয়ে তাতে হেয়ার স্প্রে দিন। এভাবে এই স্টাইল অনেক সময় ধরে রাখা যায়। এতে নিচের চুল যেমন ঢেউ খেলানো দেখায়, তেমনি কৃত্রিম ভাবটাও থাকে অনুপস্থিত।

টুইস্ট

সামনের চুল একটু পেঁচিয়ে রোল বা টুইস্ট করে নিয়ে ছোট ছোট ক্লিপ দিয়ে আটকে দিতে হবে। তারপর পেছনের চুল ছেড়ে রাখা যায়। চাইলে কাঁধ থেকে নিচ পর্যন্ত ব্লো ড্রাই কিংবা আয়রন করেও ছেড়ে রাখা যায়। শাড়ি কিংবা পশ্চিমা ধাঁচের পোশাকের সঙ্গে টুইস্ট ফ্যাশন খুব ভালো মানায়।

কোঁকড়া চুল

আজকাল অনেকই চুল রিবন্ড করার দিকে ঝুঁকলেও, কেউ কেউ আবার পছন্দ করেন কোঁকড়া কিংবা কিছুটা ঢেউ খেলানো চুল। চুল যদি পাতলা হয়, সে ক্ষেত্রে আগে মুজ দিয়ে চুলের ঘনত্ব বাড়িয়ে নিতে হবে। চুলের ঘনত্ব বাড়লে পাতলা-সোজা চুল কোঁকড়া করতে সুবিধা হয়। কোঁকড়া করার জন্য ইলেকট্রিক কার্লিং রোলারে চুল ১০ মিনিট পেঁচিয়ে রাখলে কোঁকড়া হয়ে যায়। এ অবস্থায় দীর্ঘ সময় রাখতে চাইলে চুলে স্প্রে ব্যবহার করা ভালো।

এই শরতে কিছু টিপস

নতুন ঋতুর আগমন আর চুলের নানা ধরনের সমস্যা শুরু হওয়া একই কথা। ঋতু পরিবর্তন হলে আমাদের দৈনন্দিন কেশ চর্চা ও বিন্যাসে পরিবর্তন আনতে আমরা বাধ্য হই। চুল ঝরে যাওয়া এর মধ্যে অন্যতম। এ ছাড়াও আছে চুল রুক্ষ হয়ে যাওয়া। এই সম্পর্কিত কিছু পরামর্শ মাথায় রাখলে উপকৃত হবেন। যেমন—

l শরতের শুরুতেই খুব লম্বা চুল যাদের তাদের চুল কিছুটা কেটে ছোট করে নেওয়া যেতে পারে।

l হেয়ার স্টাইল করার জন্য চুলে খুব বেশি আয়নিং, ব্লো-ড্রাই, টক ব্যবহার করবেন না। খুব বেশি হেয়ার মুভ ব্যবহার না করাই ভালো।

l প্রতি মাসে অন্তত দু’বার ডিপ কন্ডিশনিং হেয়ার ট্রিটমেন্ট করালে ভালো হয়।

l মাসে যতবার চুলে শ্যাম্পু করবেন ঠিক ততবারই সঠিক নিয়মে কন্ডিশনিং করবেন।