মারুফ রহমান
বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে অন্যতম প্রায় ৪ শত বছর পুরোনো ইসলামি স্থাপত্য আতিয়া জামে মসজিদ। চুন সুরকির দ্বারা নির্মিত ৪ কোণে ৪টি অষ্টকোণাকৃতির মিনার বিশিষ্ট এই মসজিদটি সুলতানি ও মোগল স্থাপত্যরীতির সুস্পষ্ট নিদর্শন। মসজিদটি আকারে বেশ ছোট, তবে এর মনোমুগ্ধকর কারুকার্য হার মানায় তার আয়তনকে। ৫টি প্রবেশদ্বার সম্বলিত মসজিদটির সামনের অংশে পোড়ামাটির বিভিন্ন নকশা আঁকা ৩টি দেওয়াল রয়েছে। মসজিদটির কার্নিশে শিল্পকর্মের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে তত্কালীন বাংলার বেশকিছু রূপ। এছাড়া পোড়ামাটির তৈরি অসংখ্য ফুলের নকশা থাকার কারণে আতিয়া মসজিদটি বেশ দৃষ্টিনন্দন।
জানা যায়, টাঙ্গাইল জেলার জায়গীরদার আলী শাহান বাবা আদম কাশ্মিরি (র.) ইসলাম ধর্ম প্রচারের প্রয়াসে আফগান নিবাসী কররানি শাসক সোলাইমানের কাছ থেকে বর্তমান টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারের এই জায়গাটি দান হিসেবে পেয়েছিলেন। আর তিনি এই অঞ্চলের নামকরণ করেন ‘আতিয়া’, যার অর্থ ‘দানকৃত’। পরবর্তিতে বাবা কাশ্মিরি তার প্রিয় ভক্ত করটিয়ার জমিদার সাঈদ খান পন্নীকে আতিয়া পরগনার শাসনভার অর্পণ করেছিলেন। গুরুর সম্মানার্থে সাঈদ খান পন্নী ১৬০৮ সালে আতিয়া জামে মসজিদটি নির্মাণ করেন। ১৬১৩ সালে বাবা কাশ্মিরি মৃত্যুবরণ করলে তাকে এই মসজিদের বিপরীতে সমাহিত করা হয়। মসজিদটি নির্মাণ ও কারুকার্যের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন তত্কালীন প্রখ্যাত স্থপতি মুহাম্মদ খাঁ। ১৮০০ সালের প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্পে মসজিদটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে ১৮৩৭ সালে রওশন খাতুন চৌধুরানি ও ১৯০৯ সালে আবুল আহমেদ খান গজনবী মসজিদটি সংস্কার করেছিলেন।
ষোড়শ শতাব্দিতে নির্মিত এই মসজিদটি বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের পুরাতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। তবে এখনো মসজিদটিতে নিয়মিত ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হয়। মসজিদের মাইকে আজানের ধ্বনি উচ্চারিত হলেই এটি মুসুল্লিদের ভিড়ে মুখরিত হয় অতীতের ন্যায় এবং ফিরে পায় তার পূর্ণরূপ। মানুষের হাতের কারুকার্য কতটা নিখুঁত আর সুন্দর হতে পারে এই মসজিদটিই তার উদাহারণ। অসংখ্য নকশাখচিত মসজিদটির গায়ে খোদাই করা আরবি হরফগুলোতে হাত বুলালে মনে হয় ৪ শত বছর পুরোনো সেই সময়টিতে চলে গেছি। মসজিদটিকে নিয়ে অনেকের মাঝে রয়েছে নানা কৌতুহল ও বেশকিছু ভ্রান্ত ধারণা। যেমন অনেকের ধারণা মসজিদের বিপরীতে থাকা মাজার সমাধিটি একটি গোপন সুরঙ্গ। যা পরবর্তীতে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আবার অনেকের ধারণা মাজারটিতে শুধু একটি সমাধি নয়, বরং রয়েছে একাধিক সমাধি। কিন্তু দেখা যায়, মাজারটি আসলে কোনো সুরঙ্গ বা একাধিক লোকের সমাধি নয়। সেটি হচ্ছে শুধুমাত্র বাবা আদম কাশ্মিরির মাজার সমাধি। তবে দেশের অন্যান্য মাজারের মতো এই মাজার জাঁকজমকপূর্ণ নয়, কেননা মাজারের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে নানা শিল্পকর্মে অলঙ্কৃত এই মসজিদ। তাই অনেকটা পরিত্যক্ত হয়েই পড়ে আছে মাজারটি। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা আসেন দৃষ্টিনন্দন মসজিদটি এক নজর দেখতে। মসজিদটিতে দোয়া বা মানত করলে তা পূরণ হয়—এমন কথা শোনা যায় দর্শনার্থী ও স্থানীয়দের মুখে। তাই বিভিন্ন ধর্মের মতাদর্শের অনেকেই এখানে আসেন নিজের মনের বাসনা পূরণের জন্য মানত করতে। মুসলমান ধর্মাবলম্বীরা মসজিদটিতে নফল নামাজ আদায় করে সৃষ্টিকর্তার কাছে মোনাজাত করেন। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, রোগমুক্তির জন্য মসজিদের দেয়ালের পোড়ামাটি নিজের গায়ে মাখা ও সেগুলো খাওয়ার গল্পটি শোনা যায় অনেক দর্শনার্থীর মুখে। আর তাদের এসব কার্যকলাপে মসজিদটির সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। ১৯৯৬-১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার মুদ্রিত ১০ টাকার নোটে স্থান পায় বিখ্যাত এই মসজিদের ছবি।
নব্বই দশকের লাল রঙয়ের সেই ১০ টাকার নোটটি হারিয়ে গেছে কালের স্রোতে, কিন্তু আতিয়া মসজিদটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে স্বগর্বে। টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ারের আতিয়া গ্রামে মসজিদটির অবস্থান। জেলা শহর থেকে যার দূরত্ব ৮ কিলোমিটার।
