সৈয়দ শামসুল হক

‘আধুনিক অর্জুন’

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৯:৩১

পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন। প্রথমে কৃপাচার্য এবং পরে দ্রোণাচার্যের নিকট তিনি অস্ত্রবিদ্যা লাভ করেন। ধনুর্বিদ্যায় তিনি এতটাই পারদর্শী ছিলেন যে একসঙ্গে দুই হাতে নিপুণভাবে তীর নিক্ষেপ করে লক্ষ্যভেদ করতে পারতেন। এই জন্য তাঁকে সব্যসাচী বলা হয়। অর্জুনের মতো সৈয়দ শামসুল হক [২৭ ডিসেম্বর ১৯৩৫—২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬] ধনুর্বিদ্যা অর্জন করেননি কখনোই। একসঙ্গে দুই হাত চালানোর কোনো অভিজ্ঞতাও তাঁর ছিল না। তিনি সাহিত্যিক। তিনি কবি, নাট্যকার, কথাশিল্পী, সংগীত রচয়িতা, প্রাবন্ধিক, অনুবাদ শিল্পী, শিশুসাহিত্যিক, চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যকার, কাহিনিকার, গীতিনাট্য রচয়িতা এবং চিত্রশিল্পী। তিনিও সব্যসাচী অভিধা লাভ করেছেন। কারণ শিল্পের যে অঙ্গনে তিনি হাত দিয়েছেন, সেখানেই সোনা ফলিয়েছেন। ফলে ‘সব্যসাচী’ শব্দটি তার অর্থময়তার পরিধি অনেক বাড়িয়ে দিয়ে সৈয়দ শামসুল হকের শিল্পনৈপুণ্যের অভিধায় অভিষিক্ত হয়েছে। হুমায়ুন আজাদ এই জন্যই তাঁকে বলেছেন ‘আধুনিক অর্জুন’। এ বিষয়ে কবি টোকন ঠাকুরকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে সৈয়দ হক বলেছেন :

‘আমার কাজ তো হচ্ছে উপকরণের দিক থেকে ভাষা মাধ্যমে কাজ করা। ভাষার মাধ্যমে কাজ করতে গিয়ে ভাষার                 যতগুলো সৃজনশীল প্রকাশক্ষেত্র আছে—কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ—সবগুলোতেই আমি কাজ করেছি, কাজ করে যাচ্ছি। এটা এ রকম যে আমি আলাদা করে দেখি না কোনো একটি মাধ্যমকে।’

সৃষ্টিশীল জীবনচর্চার ভেতরগত এক তাড়া তিনি অনুভব করেছিলেন শৈশব থেকেই। এ হলো এমন এক বোধ, এমন এক তৃষ্ণা, অস্তিত্বের এমন এক স্বভাব, যাকে অস্বীকার করা মানে নিজেকে অস্বীকার করা। সৈয়দ হক তা করেননি। মেধাবী ছাত্র ছিলেন। পিতার ইচ্ছা অনুযায়ী ডাক্তার হতে পারতেন। কিন্তু স্টাবলিশমেন্টের শৃঙ্খল অতিক্রম করে তিনি তাঁর আত্মার আহ্বানে সাড়া দিয়ে যে জীবন বেছে নিয়েছিলেন সেই জীবন সর্বৈব লেখকজীবন, সৃষ্টিশীল মানুষের জীবন, দুর্দান্ত এক জীবন। নিজের সৃষ্টির কাছে আনুগত্য ছাড়া জীবন ও জগতের আর কারো কাছে তিনি অনুগত ছিলেন না। ছাপোষা মানুষের জীবন তিনি যাপন করেননি। অর্থ-ঐশ্বর্য ও ক্ষমতার বাইরে তিনি নিজের সাম্রাজ্য তৈরি করেছিলেন। সেই সাম্রাজ্য হলো তাঁর সৃষ্টির জগত্। সেই জগতে তিনি সিংহের মতো বেঁচে ছিলেন এবং প্রতিটি মাধ্যমেই তিনি ছিলেন নিপুণ কারিগর।

১৯৩৫ থেকে ২০১৬ ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে তাত্পর্যময় সময়। পাকিস্তান আন্দোলন, দেশ বিভাগ, ভাষা অন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলন, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা, ১৯৭৫-এ স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা, একাত্তরের পরাজিত শক্তির ক্ষমতা লাভ, সবদিক থেকে দেশের পশ্চাদপসারণ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, আওয়ামী লীগের ক্ষমতা অর্জন ইত্যাকার বিপুল এক সময়ের সকল আলোড়ন-বিলোড়নের ভেতর দিয়ে সৈয়দ শামসুল হকের এক জীবন। ফলে একজন পোড়খাওয়া মানুষের যন্ত্রণা ও রক্তক্ষরণে তাঁর সৃষ্টির জগত্ মহিমামণ্ডিত। রুশ কথাসাহিত্যিকদের যে রক্তাক্ত মহাকাব্যিক জীবনালেখ্যের সঙ্গে আমাদের পরিচয় আছে, সৈয়দ শামসুল হক তাঁর সকল সৃষ্টির মধ্যে সেই তীব্র-তীক্ষ জীবনবোধের পরিচয় রেখে গেছেন। ফলে অনিবার্যভাবেই তাঁর সকল সৃষ্টি শিল্পশুদ্ধতায় মহিমামণ্ডিত হয়ে উঠেছে।

সৈয়দ শামসুল হকের অনেক পরিচয়। কিন্তু সব পরিচয়ের মধ্যে তাঁর যে পরিচয়টি মুখ্য তা হলো তিনি কবি। তাঁর সকল পরিচয়ের মধ্যে কাব্যপ্রতিভার স্ফুরণ, কাব্যপ্রতিভার রূপ-রঙ-রেখা ও গন্ধ-বর্ণ-স্পর্শ বিচিত্র মাত্রায় অফুরন্ত হয়ে আছে। এই জন্যই কবি আল মাহমুদ বলেছেন, ‘আমি সৈয়দ শামসুল হককে মূলত একজন কবিই বলব। কবিতাতেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।’ আল মাহমুদের এই বক্তব্যের সত্যতা আছে। সৈয়দ শামসুল হক যে মাধ্যমেই কাজ করুন না কেন, তিনি একান্তই কবি। সৈয়দ হক বলেছেন, ‘কবিতাই হচ্ছে ভাষার সর্বোত্তম সর্বোচ্চ এবং সবচেয়ে সাংকেতিক ব্যবহার। সেটি আমি যখন করি বা সেটি যখন কেউ খুব সফলভাবে করেন যিনি অন্য মাধ্যমে কাজ করছেন তিনিও মূলত কবি, প্রধানত একজন কবি। তার সেই কবিসত্তা থেকেই উত্সারিত হয় সবগুলো মাধ্যমের দিক।’

নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভেতর দিয়ে তিনি কবিতার যে জগত্ তৈরি করেছেন তা মুহূর্তের কোনো আবেগপ্রসূত বিষয় নয়। বরং জীবনাবসানের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি নিজেকে সৃষ্টির মধ্যে ব্যাপৃত রেখেছেন। এবং সেই সৃষ্টি যেন তাঁর অস্তিত্বের উপস্থিতি মূর্তমান করে তোলে সেই প্রেরণা তাঁকে নিরন্তর তাড়িত করেছে। একই সাক্ষাত্কারে টোকন ঠাকুরকে কবি বলেছেন : ‘আমি কাজ করে যাচ্ছি। সেই জীবনের প্রথম যে কাজ শুরু করেছিলাম, লেখার কাজ, এ কাজ তো কেউ আমাকে দেয়নি, আমিই আমার নিজেকে দিয়েছি এবং আমার কারো কাছে অবসর নেওয়ারও নেই। কারণ কাজটা আমিই আমাকে দিয়েছি এবং সেই কাজটা করে যাওয়ার চেষ্টা করছি। কাজটা কী? কাজটা হচ্ছে লেখার ভেতর দিয়ে আমার জীবনের অনুভবকে প্রকাশ করা।’

এই অনন্য শব্দভাবনা, চিত্র ও চিত্রকল্পেরে ভাবনা, উপমার জগত্, আর তুলনা-প্রতিতুলনার ভেতর দিয়ে গড়ে উঠেছে সৈয়দ শামসুল হকের কবিতার বিস্ময়কর এক জগত্। এবং সেই জগতের বৈচিত্র্য অসামান্য। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত ‘বৈশাখে রচিত পঙিক্তমালা’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোর সঙ্গে কেউ যদি ১৯৮০ সালে প্রকাশিত ‘পরাণের গহীন ভিতর’ শীর্ষক কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোর তুলনা করেন তাহলে অনুধাবন করা যাবে সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যপ্রতিভার আর্কেটাইপ। ‘বৈশাখে রচিত পঙিক্তমালা’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো ঋতুনির্ভর নয় নিশ্চয়ই। যে বোধের ভেতর দিয়ে একজন কবি মনুষ্য-সমাজের অন্তর্গত ক্ষতগুলো, যন্ত্রণার রক্তাক্ত অধ্যায়গুলো এবং ভেতরগত শক্তি ও সম্ভাবনাগুলো কালনিরপেক্ষভাবে অনুভব করতে পারেন এবং কবিতার দেহসৌষ্ঠবে মূর্তমান করে তুলতে পারেন ‘বৈশাখে রচিত পঙিক্তমালা’ কাব্যগ্রন্থে তার সকল পরত অনুভব করা যায়। এখানেও জীবনের সহজিয়া রূপ আছে; আছে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির ভাঙা-গড়ার রূপ-রূপান্তর। প্রেমও আছে—মানব-মানবীর প্রেম। আছে প্রবলভাবে প্রত্যাখ্যানের প্রণয়সুখ। আছে রক্তচক্ষু কোকিলের গান। আর দম। ‘বৈশাখে রচিত পঙিক্তমালা’ শীর্ষক দীর্ঘ কবিতা লেখার দম খুব কম কবিরই আছে। এমনকি তিনি নিজেও যে খুব বেশি লিখেছেন তা নয়। একটিমাত্র কবিতার ভেতর দিয়ে তাঁর ভাবনার যে মহাকাব্য রচিত হয়েছে তার কি খুব বেশি তুলনা আছে? যেমন, ‘তারপর পরিবার, যারা রোজ বলে,/ ‘কবিতার সরোবরে ফোটে অনাহার,/ ছেঁড়া চটি, সস্তা মদ, আসক্তি বেশ্যায়’;/ তারপর বাংলাদেশ, এশিয়া, আফ্রিকা;/ ফর্মায় ফর্মায় ক্রমে বেড়ে উঠে হবে/ কবিতার সংকলন খদ্দরে বাঁধানো,/ যে কোনো ঋতুতে আর যে কোনো উত্সবে।’ কিংবা ‘আমারও সংসার হবে— /শিল্পের সংসার। চন্দ্রাবতী হবে বোন,/ কালিঘাটে আত্মীয় আমার। আমি জানি/ মনসার ক্রোধ মানে মানুষের জয়,’। এবং এই অন্তর্গূঢ় অনুভব ও বিপুল বিপর্যয়ের ভেতর থেকে মানুষের জয়ের যে ভাষা তিনি সৃষ্টি করেছেন তার গড়ন ‘পরাণের গহীন ভিতর’ শীর্ষক কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোর সঙ্গে কিছুতেই যায় না। ‘আমি কার কাছে গিয়া জিগামু সে দুঃখ দ্যায় ক্যান,/ ক্যান এত তপ্ত কথা কয়, ক্যান পাশ ফিরা শোয়,/ ঘরের বিছান নিয়া ক্যান অন্য ধানখ্যাত রোয়?’ কিংবা ‘তোমারে যে ভালোবাসে এর থিকা আরো পাঁচগুণ/ আল্লার কসম আমি দিমু তারে এই জামাখান,/ আমার কলম আমি দিমু তারে, শরীলের খুন/ দোয়াত ভরায়া দিমু, অনুরোধ খালি একখান—/ সে য্যান আমার থিকা আরো ভালো পদ্য লেখে আর/ যাদুমন্ত্রে রূপার শিকল হাতে দিতে পারে তার।’ দশক ভেদে দুই কাব্যগ্রন্থ থেকে এই উদাহরণ। নিরীক্ষার জায়গাটা স্পষ্ট। একটি অঞ্চলের ভাষাকে সর্বজনীন প্রেমের ভাষা করার চ্যালেঞ্জটা তিনি নিয়েছিলেন। এবং এখন আমরা জানি কী বিস্ময়কর সাফল্যের সঙ্গে কবি ওই চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেছেন। পকেটের মাপে মুদ্রিত এই কাব্যগ্রন্থটি আমি কারো কারো পকেটে রাখতে দেখেছি। আর বিষয়ের ভিন্নতায় কীভাবে পালটে যায় ছন্দ, সুর, স্বর, ধ্বনি, চিত্র, চিত্রকল্প, উপমা, উেপ্রক্ষা, গল্প, আখ্যান, এবং রং ও আলো-আঁধারের ব্যবহার—তারও পরিচয় আছে কবির নিরীক্ষার জগতে। স্পর্শের অনুভূতি, স্বাদের অনুভূতি ও গন্ধের অনুভূতির যে জগত্ সৃষ্টি করেছেন কবিসার্বভৌম জীবনানন্দ দাশ—তাঁর থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অনুভবপুঞ্জের জগত্ তৈরি করেছেন সৈয়দ শামসুল হক। কিন্তু তাঁর যে নিজস্ব স্বর, নিজস্ব কণ্ঠ, তা কিন্তু ফল্গুধারার মতো কবির বিপুল সৃষ্টির জগতে বহমান। আর এখানেই সৈয়দ শামসুল হকের অনন্যতা, শ্রেষ্ঠত্ব।

সৈয়দ শামসুল হক, ২৭ ডিসেম্বর ১৯৩৫—২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬