দেশে শিশুর প্রতি সহিংসতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। শিশু গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা ও অপহরণের পর হত্যার ঘটনা বেড়েই চলেছে। চলতি বছরের প্রথম ১০ দিনে ১৩ শিশু ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮ সালের ১১ মাসে প্রতিদিন গড়ে ১৩ জন শিশু নির্যাতন, ২ জন শিশু ধর্ষণ এবং ১ জন শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। আর ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে শিশু গণধর্ষণ বেড়েছে ৩৪ ভাগ, শিশুহত্যা বেড়েছে ২৩ ভাগ, অপহরণের পর হত্যা বেড়েছে ১৯ ভাগ, শিশু আত্মহত্যা বেড়েছে ৪০ ভাগ।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসময় ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিই এই অবস্থার জন্য মূলত দায়ী। সমাজে দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারলে এ ধরনের ঘটনা কমে আসত। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে অপরাধীরা অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে। অপরাধীদের কোনো অবস্থায় কোনো রাজনৈতিক দলের আশ্রয় দেওয়া যাবে না। শিশুদের সুরক্ষায় অনেক আইন আছে কিন্তু তার যথাযথ প্রয়োগ নেই এবং আইন থাকলেও অনেকাংশেই তা উপেক্ষিত। অপরাধ করার পরও অপরাধী আইনের আওতায় না আসা, অর্থের বিনিময়ে আপস করা, মামলার ধীরগতির কারণে শিশু সহিংসতার ঘটনা সমাজে বাড়ছে।
জানা গেছে, ২০১৮ সালে শিশুহত্যা হয়েছে ৪১৮টি, ২০১৭ সালে যা ছিল ৩৩৯টি। শিশু ধর্ষণ ২০১৮ সালে হয়েছে ৫৭১টি, ২০১৭ সালে যা ছিল কিছুটা বেশি ৫৯৩। গণধর্ষণের শিকার হয় ২০১৮ সালে ৯৪ শিশু, যা ২০১৭ সালে ছিল ৭০। অপহরণের পর হত্যা করা হয় ২০১৮ সালে ৩১ শিশুকে, যা ২০১৭ সালে ছিল ২৬ জন এবং ২০১৮ সালে আত্মহত্যা করে ২৯৮ শিশু, যা ২০১৭ সালে ছিল ২১৩। শিশুদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি ২৬৯টি উন্নয়ন সংস্থার মোর্চা সংগঠন ‘বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম’ (বিএসএএফ) ২০১৮ সালে জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এ পরিসংখ্যান তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আবদুছ সহিদ মাহমুদ ইত্তেফাককে বলেন, শিশুদের প্রতি বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন বাড়ছেই। কোনো একটা কারণে এটা বাড়ে না। এটা একটা সামাজিক সমস্যা এবং সেটা অনেকগুলো কারণের সমষ্টি। তিনি বলেন, সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ এখন প্রায় নাই বললেই চলে। আইন অনেক আছে কিন্তু আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে যে সময়ের মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া শেষ করলে ভালো হতো তা হয় না। শিশু নির্যাতন অধিকাংশ ক্ষেত্রে হয় দরিদ্র পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে। তারা অসচেতন, আর্থিকভাবে দুর্বল, ফলে তারা অনেক কিছু ভাগ্যের উপর সঁপে দেয়, আইনের আশ্রয় নেয় না। আর আইনের আশ্রয় নিলেও দীর্ঘ সময়ের কারণে তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। অন্যদিকে সমাজের পেশিশক্তি ও প্রভাবশালীদের কারণে ভিকটিমকে সুবিচার পাওয়া থেকে সরে আসতে হয়। আমাদের দেশে সাক্ষী সুরক্ষা দেওয়ার কোনো আইন নাই। এ ছাড়া রাষ্ট্রের দিক থেকে শিশু হত্যা, ধর্ষণ মামলাগুলো যদি দ্রুত নিষ্পত্তির দৃষ্টান্ত তৈরি হতো, তবে সমাজে সচেতনতা বাড়ত।
মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, দেশে শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের যথাযথ বিচার হচ্ছে না। বেশির ভাগ নির্যাতনের ঘটনা গোপন করার চেষ্টা করে পরিবারগুলো। ফলে অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে। আর এসব যারা করছে তারা কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থেকে এসব করছে। ফলে ন্যায়বিচার পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে এবং ততদিনে ভিকটিম বিচার পাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনে সরকার যতদিন জিরো টলারেন্স দেখাবে না, ততদিন এসব চলতেই থাকবে। এর জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে একসঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র-আসক এর নির্বাহী পরিচালক শিফা হাফিজ বলেন, দেশে শিশু ধর্ষণসংক্রান্ত নির্যাতন অনেক বেড়েছে। এসব সহিংসতার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান তিনি ।
