গুইসাপ ও তার বাবুটা

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২০, ১৯:৫৭

মা গুইসাপটা তার বাবুটাকে সাথে নিয়ে ডোবাটার পাড়ে বসে আছে। জায়গাটা একটা ছোট্ট ঝোপের মতো। মা ডোবা থেকে কিছুক্ষণ আগে একটা কাঁকড়া ধরেছিল। সেটা ছিঁড়ে ছিঁড়ে বাবুকে খেতে দিয়েছে। নিজে এখনো কিছু খায়নি। তাই ছেলেকে বলে : বাবু, তুমি এখনে একটু ঘুমিয়ে থাকো, আমি পানিতে নেমে কিছু পাই কি না দেখি। তোমার বিকেলের নাশতার জন্যও তো কিছু আনতে হবে—এই বলে মা নেমে যায় পানিতে। এদিক-ওদিক ঘোরে। কিন্তু তেমন কিছু পায় না। শেষমেশ কয়েক গোছা শেওলা আর জলজ ঘাস ছিঁড়ে খেল, কলমির নরম ডগাও খেল কয়েকটা। তারপর ঘুরতে থাকে ডোবার কিনারা-ঘেঁষে—ওখানেই কাঁকড়াদের বাড়ি মানে গর্ত। একটা বেরোলেই ধরবে ঠেসে।

এদিকে, মা ঘুমাতে বললেও বাবুটার ঘুম আসছে না। তাই ভাবে—আশপাশে একটু ঘুরি। সে ঘুরতে ঘুরতে ডোবার পশ্চিম পাশটায় চলে আসে। সামান্য দূরেই রাস্তা। ও দেখে তিন-চারটে ছেলে একটা ইঁদুরের বাচ্চার পায়ে দড়ি বেঁধে টানাটানি করছে, মজা করছে। তাদের একজনের হাতে একটা মোটা লাঠি। ইঁদুরটা যেই না একদিকে দৌড় দিতে যাচ্ছে, অমনি একজন দড়ি ধরে দিচ্ছে টান। তাতে ইঁদুরের বাচ্চাটা ছিটকে এসে পড়ছে ওদের কাছাকাছি। এতে ছেলেগুলো হেসে গড়িয়ে পড়ছে। এমন নিষ্ঠুর খেলা দেখে গুইসাপের বাচ্চাটার চোখ ফেটে পানি আসে। ফ্যাচফ্যাচ করে খানিকটা কাঁদেও। এভাবে কেমন করে যেন সে রাস্তার একেবারে কাছাকাছি এসে পড়ে। তখনই ছেলেদের একজন তাকে দেখে ফেলে। সে চোখ গোল গোল করে বলে—ওই দ্যাখ গুইসাপ!

—সাপ না, সাপ না; বাচ্চা গুইসাপ। চল ওকে মারি।

—যদি কামড়ে দেয়?

—ও এখনো কামড়াতে শেখেনি। দেখছিস না একেবারে গুদুবাবু? তাছাড়া লাঠি আছে না? ব্যাটার মাথা ছাতু করে দেবো!

ছেলেগুলো ইঁদুরখেলা ছেড়ে গুইসাপের বাচ্চার দিকে মনোযোগ দেয়। ছেলেদের ভাবগতিক দেখে বাবুটা ভয়ে কুঁকড়ে যায়। ভুলে যায় বাড়ির ঠিকানা। তাই পাগলের মতো দৌড় দেয় দক্ষিণ দিকে। সেদিকে ওয়াহিদদের বাড়ির সীমানার বেড়া। বেড়ার গায়ে বাঁধা নাইলনের সুতোর নেট। হাঁসমুরগি, বেড়াল যাতে সীমানার মধ্যে ঢুকতে না পারে সেজন্য এই ব্যবস্থা। গুইসাপের বাবুটা তো আর অতশত বোঝে না। সে বেড়া পেরিয়ে ওপাশে যাবে, তারপর যা হয় হবে। কিন্তু পারল না। গলা আটকে গেল জালে। ভয়ে ওর বুকের পানি শুকিয়ে যায়। কেঁদে কেঁদে বারবার মাকে ডাকতে থাকে। আর কী আশ্চর্য—মা গুইসাপটা তখনই দৌড়ে আসে সেখানে এবং লাফ দিয়ে ছেলেকে মুক্ত করতে চায় জাল থেকে। আর অমনি সেও আটকে যায় জালে। তারপর দুজনের সে কী কান্না আর চিত্কার!

ছেলেগুলো ততক্ষণে সেখানে এসে পড়েছে। বড়ো গুইসাপটি দেখে তারা একটু দূরে দাঁড়ায়। লাঠি দিয়ে পেটানোর সাহস আর পাচ্ছে না। তবে ইটের টুকরো, মাটির ঢেলা নিক্ষেপ চলছে সমানতালে; সেইসঙ্গে খুশির হৈহুল্লোড়। ইটের টুকরো আর ঢেলার আঘাতে মা-ছেলে বেশ কাহিল হয়ে পড়েছে। কিন্তু ছেলেরা থামছেই না। সমানে চলছে চেঁচামেচি আর ঢিলাঢিলি।

তাদের হৈচৈ শুনে বাড়ির ছোট্ট ছেলে ওয়াহিদ এগিয়ে আসে। ওদেরকে থামানোর চেষ্টা করে, কিন্তু ওরা থামে না। উলটো হো হো হাসিতে ফেটে পড়ে। ওয়াহিদ তখনই দৌড়ে যায় বাড়িতে। কাঁদো কাঁদো গলায় সব খুলে বলে দাদুকে। দাদু হৈহৈ করে তেড়ে আসতেই ছেলেগুলো সরে যায়। দাদু একটা লম্বা লগি দিয়ে খুঁচিয়ে জালের খানিকটা অংশ ছিঁড়ে দিলেন; আর অমনি গুইসাপদুটো মুক্ত হয়ে যায়। মুক্ত হয়েই ওরা ডান হাত উঁচু করে ওয়াহিদ ও দাদুর দিকে তাকায়। সে চাউনিতে একরাশ খুশি আর কৃতজ্ঞতা। তারপর আস্তে আস্তে ঢুকে যায় পাশের ঝোপে।

অলঙ্করণ :মেররেতে তাশকিনা হোসেন চিশ্তী, সপ্তম শ্রেণি, বাচা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, ঢাকা