বাড়াতে হবে

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২০, ২০:৫০

 রেজাউল করিম খোকন

 

স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশক সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক দূর এগিয়েছে। অর্থনীতির সার্বিক অবস্থা স্থিতিশীলতায় আসার পর এখন শুরু হয়েছে মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং সামাজিক রূপান্তর আজ গোটা বিশ্বে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। স্বাধীনতার ৪৭ বছর  বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে এসেছে। ২০১৮ সালে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকার ওপরে স্থান দিয়েছে। জাতিসংঘের এই মর্যাদা ঘোষণার ফলে উন্নয়নশীল দেশের পথে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মতো মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এ তিনটি সূচকেই উত্তরণ ঘটিয়ে এগিয়ে আসতে পারেনি অনেক দেশ। বাংলাদেশের অগ্রগতি এখন যেভাবে অব্যাহত রয়েছে, তার কোনো বড় ধরনের ব্যত্যয় না ঘটলে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পৌঁছাবে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে বলা যায়। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়বে। বিদেশি বিনিয়োগের বৃদ্ধি ঘটবে।

জাতীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করার অন্যতম পথ অর্থনীতির প্রতিটি খাতের কর্মকাণ্ডে উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি করা। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতিক প্রেক্ষাপটে বলা যায়, অর্থনৈতিক উন্নয়নে শিল্পায়নের যেমন কোনো বিকল্প নেই একইভাবে সুষ্ঠু শিল্পায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উত্পাদনশীলতা উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। শিল্প বিকাশের জন্য যেমন নতুন শিল্পকারখানা সৃষ্টির প্রয়োজন তেমনিভাবে এ সকল কারখানায় দক্ষতা ও মুনাফা বৃদ্ধি করে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের জন্য উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধিও একান্তভাবে অপরিহার্য।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এক সময় পুরোপুরি কৃষিনির্ভর ছিল। কিন্তু এখন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে তৈরি পোশাকশিল্প। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে উজ্জ্বল অবস্থানে পৌঁছে গেছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রতিবছর বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের আগের রেকর্ড অতিক্রম করে চলেছে। এছাড়াও আমাদের রপ্তানি পণ্য তালিকায় নতুন নতুন আইটেম যুক্ত হচ্ছে। আজকাল বাংলাদেশে প্রস্তুত বিভিন্ন শিল্পজাতসামগ্রী, ইলেকট্রনিক্স পণ্য, ওষুধ পৃথিবীর অনেক দেশে যাচ্ছে। এগুলোর বেশ ভালো চাহিদা রয়েছে। প্রযুক্তির নানা বিকাশ, শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির রাজত্ব গোটা বিশ্বের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক কাঠামোয় এনেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। এখন বিশ্বব্যাপী কারিগরি জ্ঞানের কদর খুব সহজেই চোখে পড়ে। বিদেশে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ১ কোটিরও বেশি মানুষ বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। জনশক্তি রপ্তানি খাত থেকে বর্তমানে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে তা আরো কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব। এজন্য আমাদের এখানে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা প্রয়োজন দেশের কলকারখানায়, শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানে, কৃষি খামারে, কৃষি জমিতে উত্পাদনশীলতা বাড়াতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনশক্তির বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও অধিক উত্পাদনশীলতা নিশ্চিত করতে দক্ষ, কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন অভিজ্ঞ জনশক্তির বিপুল চাহিদা রয়েছে। এ কারণে বিদেশে দক্ষ, কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন অভিজ্ঞ জনশক্তি রপ্তানির তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। এজন্য সরকার দেশব্যাপী কারিগরি শিক্ষালাভের জন্য অনেক ইনস্টিটিউট, ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছে। উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে অধিক উত্পাদনশীলতা নিশ্চিত করতে সঠিক, সময়োপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ, লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী কর্মপন্থা নির্ধারণ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদকে সর্বোচ্চ ব্যবহারে জোর দিচ্ছেন বর্তমান সরকার। সকল পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দক্ষ, অধিক কর্মক্ষম, অভিজ্ঞ জনশক্তি মূল ভূমিকা পালন করে। একারণেই দেশে কারিগরি ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার যথাযথ প্রসার ঘটাতে হবে। অবশ্য বর্তমান সরকার এ বিষয়ে গভীরভাবে সচেতন। এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যে বাস্তবমুখী নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। যা ইতিমধ্যে সুফলও দিতে শুরু করেছে।

এরই মধ্যে অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাস হানা দিয়েছে দুনিয়াজুড়ে। করোনার ভয়াবহ প্রকোপে গোটা বিশ্বে এক ধরনের অচলাবস্থা, স্থবিরতা নেমে এসেছে। গোটা বিশ্ব চরম এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। করোনার কারণে বাংলাদেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখানেও শিল্প কলকারখানার উত্পাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য বেশ কিছুদিন বন্ধ থাকলেও আবার সব সচল হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকার বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যে উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে এর মধ্যেই। এক্ষেত্রে কোনোভাবেই পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই আমাদের। উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির কার্যক্রমকে জোরদার করতে হবে সম্মিলিত এবং সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে।