g সাদিকুল নিয়োগী পন্নী
‘ভাই, বাগানের লাল শাক বিক্রি করে আপনি তো লাল হয়ে যাবেন। তবে গাছগুলো একটু বেশি ঘন মনে হচ্ছে। আমি ফাঁকা করে দিই।’ এই বলেই সহকর্মী বেলাল সবজি বাগানে ঢুকে গেলেন। তারপর বাছাই করে বড় বড় শাকগুলো তুলে নিয়ে গেলেন। অবশ্যই এমন ছলেবলে কৌশলে তিনি আরও কয়েক দফা শাক নিয়েছেন।
পরের দিন বিকালে আরেক সহকর্মী আফজাল বললেন, ‘চাকরির পাশাপাশি আমরা চাষাবাদও করি। আপনার ভাবিকে বিষয়টা বুঝাতে চাই। তাই বাড়িতে যাওয়ার সময় কিছু শাক নিয়ে যেতে যাচ্ছি।’
‘ঠিক আছে ভাই। নিয়ে যায়েন।’
এরপর শক্তি বৃদ্ধি, রক্ত বৃদ্ধি, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হওয়া, পেটের ব্যারাম ভালো হওয়া, ডায়েবেটিকসের পথ্যসহ নানা কথা বলে অনেকে লাল শাক নিয়ে গেছে।
দুই.
বিশেষ ক্রেডিট নেওয়ার জন্য সবজি বাগান করেই ছবি পাঠিয়েছিলাম বউয়ের কাছে। সেটা পরে কাল হয়ে দাঁড়াল। বউ কোনোদিন আমাকে দেখার জন্য ভিডিও কল না দিলেও সবজি বাগান দেখতে প্রতিদিনই মেসেঞ্জারে কল দেয়।
‘এই শোন, শাক তো ভালোই বড় হয়েছে। এবার ঢাকায় আসার সময় অবশ্যই নিয়ে আসবা।’
‘ঠিক আছে।’
ট্রাভেলিং ব্যাগের সঙ্গে আলাদা একটা ব্যাগে কিছু লাল শাক নিয়ে চট্টগ্রাম রেল স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠলাম। ব্যাগ দুটো রাখলাম আমার সিটের ওপরের রেখিতে। ট্রেন চলতে শুরু করল। ফেনি স্টেশনে পৌঁছার একটু আগে চালক ব্রেক কষলেন। হঠাত্ ঝাঁকুনিতে উপরে রাখা শাকের ব্যাগটা পড়ল পাশের সিটে বসা একজনের মাথায়!
উনি উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। ‘এই মিয়া শাকের ব্যবস্যা করেন, আবার চড়েছেন এসি বগিতে। কমনসেন্স নাই?’
রাগে আমার মুখ লাল হয়ে গেলে। ইজ্জতের ভয়ে প্রতিবাদ করিনি। তারপর শাকের আঁটিগুলো ব্যাগে ঢুকিয়ে সিটের নিচে ফাঁকা জায়গায় রাখলাম।
আমার বিপরীত দিকের সিটে বসা একজন পুরো বিষয়টাই খেয়াল করলেন। তিনি নিজেকে সবজি বিক্রেতা পরিচয় দিয়ে বললেন, ‘এই টাটকা শাক কোথায় থেকে নিয়েছেন? লাভ ভালোই হবে আশা করি। ঠিকানাটা দিলে আমিও যেতাম।’
এই কয়েকটা শাক দেখে যিনি আমাকে ব্যবসায়ী মনে করেছেন তার সঙ্গে তর্কে যাওয়াটা বোকামি।
‘হালি শহরের বিশিষ্ট কৃষক আতাউয়ের কাছ থেকে কিনেছি। ওই এলাকায় গিয়ে খবর নিলেই তাকে পেয়ে যাবেন।’
তিন.
রাতে সাড়ে ৯টার দিকে ট্রেন পৌঁছাল এয়ারপোর্ট স্টেশনে। তাড়াহুড়া করে আমি শাকের ব্যাগ রেখেই নেমে গেলাম। যখন হুঁশ হলো তখন দৌড়ে ট্রেনে ওঠাও সম্ভব নয়। অন্যদিকে লাল শাক না নিয়ে বাসায় ফিরলে বউ আমার লাল বাতি জ্বালিয়ে দেবে। সময় নষ্ট না করে সিএনজি নিয়ে ট্রেনের পিছু নিলাম। কমলাপুরে গিয়ে ট্রেনের সাক্ষাত্। ভাগ্যগুণে সিটের নিচেই পেলাম শাকের ব্যাগ। তারপর আবার সিএনজি নিয়ে বাসায় ফিরলাম। পঞ্চাশ টাকার শাক আনতে সিএনপি ভাড়া পাঁচ শ টাকা খরচ হলো। বাসায় ফিরতে দেরি হওয়ার বউ প্রথমে রাগলেও পুরো ঘটনা শুনে চুপ হয়ে গেল। রাতে বেশ আয়োজন করে সে শাক রান্না করল। দুজন একসঙ্গে খেতে বসলাম।
‘শাক কেমন হয়েছে?’
‘অনেক ভালো হয়েছে। স্বাদ আর আবেগে দেখ না চোখে পানি চলে এসেছে।’
‘তাজা শাক। তাই ইচ্ছে করেই একটু ঝাল বেশি দিয়েছি।’
ততক্ষণে ঝালে আমার কথা বলার অবস্থা নেই। শুধু হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লাম।
খাবার শেষে বউ থালা বাটি ধুতে গেল। আমি রুমে থাকা সাদা, লাল সব রকমের চিনি মুখে দিলাম। কিন্তু তাতেও মুখের আগুন নিভছে না। অবশেষে ফ্রিজ থেকে কয়েক খণ্ড বরফ মুখে দিয়ে ঝাল নিবারণের চেষ্টা করলাম।
চার.
চট্টগ্রামে ফিরে আসতেই বান্ধবীর জন্মদিনের দাওয়াত পেলাম। তাকে চমকে দেওয়ার জন্য লাল শাক দিয়ে ফুলের তোড়া বানিয়ে রেস্টুরেন্টে হাজির হলাম।
‘হ্যাপি বার্থ যে টু ইউ’ বলে আমি শাকের তোড়াটা তার দিকে এগিয়ে দিলাম।
বান্ধবী তা হাতে নিয়েই বলল, ‘আমার সাথে ফাজলামি করতে এসেছিস। ভাবছিলাম তোর মনটা ভালো। তাই সেকেন্ড হ্যান্ড হলেও প্রেম করব।’
‘করতে তো মানা করিনি।’
বান্ধবী বলল, ‘বিয়ের পর পুরুষদের ব্রেন অর্ধেকটা নষ্ট হয়ে যায়। তোরটা দেখছি পুরোটা শেষ।’
‘দেখ তোকে সারপ্রাইজ দিতেই এমন করেছি।’
কথাটা করার আগেই বান্ধবী আমার মুখের ওপর শাকের আটিটা ছুড়ে মারল।
রাগ, লজ্জা ও ক্ষোভে আমার মুখ লাল হয়ে গেলে। দ্রুত সেখান থেকে বিদায় হলাম। অফিসের দিকে আসার সময় ভাবলাম লাল শাক আমার কত কিছুই লাল করে দিল। g
[ গত সংখ্যায় ঠাট্টায় প্রকাশিত ‘বিবাহসংগীত’ লেখাটির লেখক সাদিকুল নিয়োগী পন্নী নাম ভুলক্রমে প্রকাশ না হওয়ায় আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত ]
-বি.স
