হিরু দ্য পরামর্শদাতা

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০১৯, ১৯:৪৩

সাইফুল ইসলাম জুয়েল-এর

‘যুবক তার প্রেমিকার জন্য বইয়ের সাথে গোলাপ পাঠিয়েছিল। কিন্তু প্রেমিকা জানাল—সে গোলাপ-টোলাপ কিচ্ছু পায়নি, পেয়েছে ছারপোকা!’

হিরু বলল। অন্যরা চুপ। এ আবার কেমনতর কথা। গোলাপ তাহলে ছারপোকা হয়ে গেল নাকি! সেই সুকুমার রায়ের গল্পের মতো—ছিল রুমাল, হয়ে গেল বিড়াল!

একজন আবার হিরুর এসব ফান-টার কম বুঝে। সে বলল, ‘হিরু ভাই, তুমি নাকি ইদানীং সবাইকে ক্যারিয়ার বিষয়ে গাইড করছ? সেসব গল্পই বলো না।’

‘আরে, তাই তো বলছি!’

‘তাহলে ছারপোকা এলো কোত্থেকে?’

‘ছারপোকা থাকে রে। তাদের থাকতে হয়। গল্প শুনতে চাইবি, আর ছারপোকার গল্প শুনবি না, তাই কি হয়!’

‘আচ্ছা, ঠিক আছে শুনব। তবে, মূল গল্পও তো বলবে, নাকি?’

‘গল্পের নায়ক ছারপোকা হলে?’

‘সে গল্প বলো না প্লিজ।’

‘বেশ।’ হিরু আবারও বলতে লাগল। ‘একজন এলো—তার প্রেমিকার সমস্যা নিয়ে। প্রেমিকার বাসা তার বাসা থেকে অনেক দূরে। তাকে প্রথমে প্রেমিকার বাসার কাছাকাছি গিয়ে সেখান থেকে পিক করতে হয়। তারপর প্রেমিকাকে নিয়ে তার যেতে হয় ভালো কোনো রেস্টুরেন্টে। ওই এলাকায় আবার ভালো মানের কোনো খাবারের দোকানও নাই। সেই ভালো রেস্টুরেন্টে প্রেমিকাকে খাইয়ে তারপর আবার তাকে পৌঁছে দিতে হয় বাসায়। সেখান থেকে তাকে আবারও ফিরে আসতে হয়। এসব করতে করতে পুরো দিনই চলে যায়। আমার কাছে তার প্রশ্ন ছিল—ভাই, পুরো দিন যদি ডেটিংয়েই কাটাই, তবে কাজ করব কখন? প্রেমিকাকে পুষতে খরচ জোগানোর ব্যাপার আছে না! জলদি কোনো পরামর্শ দিন।’

‘কী করেন আপনি?’ আমি জানতে চেয়েছিলাম।

‘ইয়ে... মানে... কাউকে বইলেন না কিন্তু। আমি একজন চটপটি বিক্রেতা।’

‘উনি আপনার চটপটি চেখে দেখেছেন কখনো?’

‘সেখানেই তো কষ্ট ভাই। ব্যবসাটা শুরুর আগে ভেবেছিলাম—বেশিরভাগ মেয়েই তো ফুসকা-চটপটি পছন্দ করে, সেও হয়তো করবে। তাহলে আমার ডেটিং খরচটাই বেঁচে যাবে। কিন্তু...’

‘হু। আপনার সমস্যাটা বুঝতে পারলাম। আপনি এক কাজ করুন—প্রেমিকার সাথে সরাসরি ডেটিং বাদ দিয়ে দিন। ভার্চুয়াল ডেটিংয়ে মনোযোগী হোন।’

‘কিন্তু... ও কি রাজি হবে? ওর যে খানা-পিনার বেশ শখ...।’

‘সেসব তো বাদ দিতে বলছি না। আপনি একেকদিন তার একেক ফেভারিট আইটেম পার্সেল করে দেবেন। তার দরকার খাবার। তিনি বাসায় বসেই সেটা পেয়ে যাবেন। অন্যদিকে, আপনার আসা-যাওয়া প্লাস, আপনার নিজের খাওয়ার খরচা বেচে যাবে।’

এই বলে হিরু থামল। অন্যদের কৌতূহল তখন চরমে। জানতে চাইল, ‘তারপর?’

‘আরেক যুবক এসেছিল। “নিজে খেটে কিছু একটা করতে চাই।” বলেছিল আমায়। তখন আমি তাকে পরামর্শ দিলাম, ‘কুরিয়ার সার্ভিসের ব্যবসা শুরু করতে পারেন। এখন তো শুধু খাবারই তাড়াতাড়ি ডেলিভারি হয়, আপনি ১২ ঘণ্টার মধ্যে সবকিছু ডেলিভারি দেবেন।’

‘তারপর?’ আবারও অন্যদের প্রশ্ন।

হিরু বলল, ‘তারপর আর কী! দুজনই আমার পরামর্শ মতো কাজ করতে লাগল।’

‘না মানে... ওই ছারপোকা কিভাবে এল?’

‘হাঃ হাঃ। আমি আসলে তোদেরকে ছারপোকার প্রসঙ্গ তুলে বিরক্ত করতে চাইনি। তোরাই যেহেতু আগ্রহ দেখাচ্ছিস...। প্রথম যুবক ভাবল, প্রেমিকাকে তো রোজ রোজ খাবার পার্সেল করে দিই, আজ একটু অন্য কিছু পাঠাই না। এই ভেবে সে প্রেমিকার জন্য এক তোড়া গোলাপ পাঠাল। সাথে একটা বই। তার ভিতরে লাভ লেটার। এতদিন ডেটিং করলেও, মেয়েটা তাকে ভালোবাসে কি না, তাই জানে না সে! সেটা জানতেই তার এমন পরিকল্পনা। তো বইটা সে দ্বিতীয় যুবকের কুরিয়ার সার্ভিসের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাঠাল। দ্বিতীয় যুবক ১২ ঘণ্টার সার্ভিসের কথা বললেও, যখন সে বুঝতে পারে—ভিতরে খাবার জাতীয় কিছু নেই, সেটা ডেলিভারির ক্ষেত্রে একটু লেট করত সে। মানে, তখন সে তার গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে ডেটিংয়ে যেত। ১২ ঘণ্টার জায়গায় ৩৬ ঘণ্টা পরে গিয়ে পার্সেলটি পৌঁছাল। ততক্ষণে গোলাপ শুকিয়ে গেছে। পাপড়ি ঝরে গেছে। রয়ে গেছে কাণ্ডটা। বইটা খুলে মেয়েটি পেল কিছু ছারপোকা। কোনো এক ছারপোকা হয়তো প্যাকেট করার আগে বইয়ের ভিতরে ডিম পাড়ে। ওই ডিমগুলো ফুটেই বাচ্চা হয়েছে, বড়ও হয়েছে!’

‘কিন্তু লাভ লেটারটা...?’ অন্যরা জানতে চাইল।

হিরু স্ফিত হেসে বলল, ‘ওটা দ্বিতীয় যুবক তার গার্লফ্রেন্ডকে দেওয়ার জন্য নিয়ে গেছিল!’

 

২

হঠাত্ একজনের মাথায় আইডিয়া এল—সে এক্সপোট-ইমপোর্টের ব্যবসা করবে। সবাই তো কেবল বিদেশ থেকে মালামাল আনে, সে করবে উল্টোটা। বাংলাদেশ থেকে পণ্য বিদেশে এক্সপোর্ট করবে। কিন্তু কিছুতেই মনমতো পণ্যর আইডিয়া পেল না। যা পায়, তা ওই দেশে চলে না বা এরমধ্যেই ওই দেশের বাজার কেউ দখল করে বসে আছে। অবশেষে হিরুর মুখোমুখি হলো সে।

হিরু তাকে বলল, ‘আপনি দেশ থেকে ছারপোকা এক্সপোর্ট করা শুরু করুন।’

‘ছারপোকা?’ লোকটা চমকে উঠল। ভাবল, হিরু বুঝি তার সাথে মশকরা করছে।

কিন্তু হিরু সিরিয়াস। সে বলল, ‘এটাকে রপ্তানি না বলে পাচারও বলতে পারেন। ওরা যখন ছারপোকার যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে উঠবে, তখন এ দেশ থেকে ছারপোকা মারার ওষুধ রপ্তানি করা শুরু করবেন।’

‘কিন্তু এত এত ছারপোকা কোথায় পাব?’

‘সে জন্য চিন্তা করতে হয়! ঢাকা শহরে এত এত মেস আছে। ছেলে-মেয়েদের কত কত হল আছে, হোস্টেল আছে। সেসবে যত ছারপোকা আছে, তা আপনি পঞ্চাশ বছর ধরে রপ্তানি করলেও শেষ হবে না।’

‘বলেন কী!’ লোকটা খুশি মনে চলে গেল। কয়েক মাসের ভিতরেই তার ব্যবসা ফুলে ফেঁপে উঠল। বিদেশে সে এখন নিয়মিত ছারপোকা বিষয়ক ‘সেমিনার’ করে। ছারপোকার খারাপ দিকগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি তার কাছে যে ছারপোকা মারার বাজারের সবচেয়ে ভালো ওষুধটা আছে, সে কথা বলতে ভুল করে না সে। আমাদের দেশের লোকজন অবশ্য তাকে বলবে—ক্যানভাসার!

কয়েকদিন পর হিরুর কাছে আরেক যুবক এল। ‘কী সমস্যা?’ হিরু জানতে চাইল।

‘ছারপোকার যন্ত্রণায় থাকতে পারছি না।’

‘ওষুধ দিন।’

‘দেশের বাজারে ছারপোকা মারার ওষুধই তো নাই।’

‘বলেন কী! তাহলে আপনি আপাতত কয়েকটা দিন আমেরিকা কাটিয়ে আসুন। এদেশে ছারপোকা কমলে তবেই ফিরবেন।’

‘তাই সই।’ যুবক চলে গেল। হিরু খোঁজখবর নিল। সত্যিই দেশের বাজার থেকে ছারপোকা মারার সমস্ত ওষুধ গায়েব। আরও খোঁজ নিয়ে জানতে পারল—পুরো ব্যবসা এখন একজন মাফিয়ার হাতে। সে দেশের সমস্ত ওষুধ কিনে নেয়। একাই বিদেশে এক্সপোর্ট করে।

হিরু সেই ব্যবসায়ীকে ফোন দিলো। ‘আপনি নাকি এখন বিরাট ডন হয়ে গেছেন!’

‘আজ্ঞে, আপনাদের দোয়ায়।’

‘আমি আপনাকে কখনো দোয়া করিনি। সে যাকগে, এখন বলুন তো—আপনাকে বলেছিলাম—আগে ছারপোকা পাঠাবেন, পরে পাঠাবেন ওষুধ। কিন্তু অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে—আপনি শুধু ওষুধই পাঠাচ্ছেন।’

‘আজ্ঞে ঠিক ধরেছেন। আমি প্রথমে এক চালন ছারপোকা পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু পুরো চালান ফেরত এসেছে।’

‘কেন?’

‘ওদের দেশ নাকি ছারপোকায় বোঝাই। কেবল ওরা ওষুধটাই পাচ্ছিল না!’

৩.

হিরুর এরূপ মানুষকে উদারচিত্তে পরামর্শ দিয়ে বেড়ানোর ব্যাপারটিকে কেউ কেউ ভালো চোখে দেখেনি। তারা ব্যঙ্গ করে বলছে, ‘নিজের তো খেয়েদেয়ে কামকাজ নাই। যুবক সমাজকে গোল্লায় পাঠাচ্ছে!’

তাদেরই একজন নসু গাজী। সে ধান্দায় নামল। হিরুর কাছে যারা পরামর্শ চাইতে আসবে, তাদের সবাইকে সে নিজের কাছে ডেকে নেবে। হিরুর আগেই সেই তাদেরকে মোটিভেটেড করবে। বিনিময়ে তাদের কাছে থেকে ফি আদায় করবে।

প্রথম প্রথম হিরুর কয়েকজন গ্রাহককে চুরি করল সে। তাদেরকে নানা পরামর্শও দিল। বিষয়টা হিরুর কান অবধিও গেল। কিন্তু কিছুই বলল না সে।

‘তুমি ওর বিরুদ্ধে কেস করো, হিরু ভাই।’ হিরুর শুভাকাঙ্ক্ষীরা বলল তাকে।

‘একজন যদি কিছু করে খেতে চায়, খাক না।’

কিন্তু অন্যরা মেনে নিতে পারল না। হিরুকে চাপাচাপি করতে লাগল, ‘অন্ততপক্ষে নসু গাজীকে একটা বাঁশ দেওয়া হোক!’

হিরু এবারও মুচকি করে একটু হাসল। সে খেয়াল করেছে—ওদের সাথে হিরু যেসব কথাবার্তা বলছে, নসু গাজী তার থেকেই আইডিয়া নিচ্ছে। হিরু তাই বিড়বিড় করে বলল, ‘ছারপোকা নিয়ে তো হলোই। ভাবছি—এবার উঁকুন নিয়ে ব্যবসা করব।’

‘তুমি ব্যবসা করবে?’

‘না মানে... অন্যদেরকে আইডিয়াটা দেব আর কী!’

‘কী রকম হবে ব্যবসাটা?’

‘এই ধর—উকুন ছড়িয়ে দিয়ে উকুননাশক শ্যাম্পু বিক্রয় করবে।’

‘শ্যাম্পুটা পাবে কোথায়?’

‘উকুন ধ্বংসে ভালো একটা শ্যাম্পু বের হয়েছে। ওপাড়ার কেরামত আলী আছে না—যে অনেক বছর ধরেই বিদেশে থাকে। ওইদিন সে-ই খবরটা দিল আমায়।’

নসু গাজী আড়াল থেকে ওদের সমস্ত কথা শুনল। সে ভাবল, ‘এবার আর অন্যকে পরামর্শ নয়, খোদ নিজেই ব্যবসায় নামব।’

কয়েক ট্রাক উকুন আমদানী করল সে। ছড়িয়ে দিল সবার মাথায়। পাশাপাশি কেরামত আলীকে দিয়ে উকুননাশক শ্যাম্পুও আমদানি করল।

কয়েকদিন গেল। কিন্তু তার শ্যাম্পু বিক্রি হচ্ছে না। এক প্যাকেটও না। চিন্তায় চিন্তায় নসু গাজীর হিসুও বন্ধ হওয়ার দশা।

অবশেষে হিরুর শরণাপন্ন হলো সে। হিরু সব জানলেও, নসু গাজীর মুখ থেকেই পুরোটা শুনল আবার।

শেষে মুচকি হেসে বলল, ‘আমাদের এই এলাকায় একটা সার্কাসের দল এসেছে, জানো?

‘শুনেছিলাম। যাওয়া হয়নি।’

‘ওই সার্কাস দলটা শুধু একশটি বানর দিয়ে গড়া। বানরগুলো এমনভাবে ট্রেইন্ড যে ওরা কারওর মাথার সবগুলো উকুন বাছতে মাত্র এক মিনিটেরও কম সময় নেয়!’

‘তাতে কী হয়েছে?’

‘সার্কাস মালিকের একটা ইন্টারভিউ পড়েছিলাম ক’দিন আগে। সে নাকি গিনেস বুকে নাম লেখাতে চায়। সবচেয়ে কম সময়ে পুরো এলাকার সবার মাথা থেকে উকুন বাছাই করে ফেলবে। অর্থাত্ সবচেয়ে কম সময়ে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক উকুন বাছাই করবে ওরা!’

নসু গাজীর মুখে কোনো কথা নাই। ৬৪০ ভোল্টের বৈদ্যুতিক শক খেয়েছে যেন। মিনমিন করে বলল, ‘তাহলে এখন আমার কী হবে, হিরু ভাই? এত্তগুলা শ্যাম্পু আমদানি করলাম...’

‘ওগুলো রেখে দাও। বানরের দল তো আর সারাবছর থাকবে না। ওরা চলে গেলে আবারও (আপনাআপনিই) মানুষের মাথায় উকুন জন্মাবে। তখন তুমি একটা-দুটো করে শ্যাম্পু বিক্রি কোরো, কেমন?’

‘আচ্ছা, তাই হবে।’

নসু গাজীর এই ধাক্কা সামলাতে বহু সময় লেগেছিল। একটানা সে বিছানায় পড়ে ছিল তিন মাস। এতে খোদ তার মাথায়ই উকুন জন্মায়। নিজের শ্যাম্পুর চালানের প্রথম কাস্টমার অবধারিতভাবে তাকেই হতে হলো!   g