মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প করোনা মহামারিকে কখনোই পাত্তা দেননি। যুক্তরাষ্ট্রে করোনা ভয়াবহ রূপ নিলেও তিনি ছিলেন উদাসীন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের যখন এক মাস বাকি, ঠিক তখনই করোনায় আক্রান্ত হলেন তিনি ও তার স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্প। টুইট করে ট্রাম্প নিজেই এই খবর জানান। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, ৭৪ বছর বয়সি ডোনাল্ড ট্রাম্পের শারীরিক অবস্থা জটিল হওয়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে।
আক্রান্তের ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই স্থানীয় সময় শুক্রবার সন্ধ্যায় তাকে ওয়াল্টার রিড ন্যাশনাল মিলিটারি মেডিক্যাল সেন্টারে নেওয়া হয়। হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পূর্ব সতর্কতা হিসেবেই প্রেসিডেন্টকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তার শরীরে ‘মৃদু উপসর্গ’ ছিল। ওষুধ দেওয়ার পর তিনি ‘ক্লান্ত কিন্তু ভালো মেজাজে’ ছিলেন। তিনি আগামী কয়েক দিন ওয়াল্টার রিডের প্রেসিডেন্সিয়াল অফিস থেকে কাজ করবেন। পরে জানানো হয়, ট্রাম্পের সামান্য শ্বাসকষ্ট ছিল। তবে তিনি ভালো আছেন। ট্রাম্পের পর তার ঘনিষ্ঠ বেশ কয়েক জন কর্মকর্তা ও সিনেটর করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।
ট্রাম্প অসুস্থ হওয়ায় মার্কিন প্রশাসন সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন। যদিও মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট অসুস্থতার কারণে কাজ না করতে পারলে তিনি তার দায়িত্ব ভাইস প্রেসিডেন্টের কাছে ন্যস্ত করতে পারেন। অর্থাত্, ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স সাময়িকভাবে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হতে পারেন। তবে হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখনো দায়িত্ব পালন করছেন।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আর মাত্র এক মাস বাকি আছে। এর মধ্যে ট্রাম্পের অসুস্থতা নতুন সংকটের তৈরি করেছে। কোলাহলপূর্ণ নির্বাচনি প্রচারণা থমকে গেছে। ট্রাম্পকে আক্রমণ করে দেওয়া একটি বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেন। ট্রাম্প করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় আগামী প্রায় দুই সপ্তাহ কোনো জনসমাবেশে অংশ নিতে পারছেন না। ফ্লোরিডার মিয়ামিতে আগামী ১৫ অক্টোবর নির্ধারিত দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট বিতর্কে তিনি অংশ নিতে পারবেন কি না, সেটাও এখনো পরিষ্কার নয়।
কোনো কারণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারলে কী হবে? যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনের আগে প্রার্থী বদল করতে হয়নি। কিন্তু নির্বাচনের আগে মনোনীত প্রার্থী মারা গেলে বা অক্ষম হলে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের গণতন্ত্র অনুযায়ী প্রার্থী নির্বাচিত করতে পারবে। নিয়ম অনুযায়ী রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী অক্ষম হলে বা মারা গেলে পার্টির কনভেনশন ডাকা হবে। সেখানে সব অঙ্গরাজ্য থেকে দলের ১৬৮ জন প্রতিনিধির সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে নতুন প্রার্থী নির্বাচিত হবেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থীই যে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হবেন এমন কোনো নিয়ম নেই। অন্যদিকে একই নিয়মে ডেমোক্র্যাট দলের ৪৪৭ জন প্রতিনিধির ভোটে নতুন প্রার্থী নির্বাচিত হবেন।
কিন্তু এমন সংকটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পেছাতে পারে কি? বিশেষজ্ঞদের জন্য সেটা বলা খুবই মুশকিল। কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয় আইন অনুযায়ী। আইনে বলা আছে, প্রতি চার বছর পর নভেম্বর মাসের প্রথম সোমবারের পরের মঙ্গলবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেই হিসাবে আগামী ৩ নভেম্বর ভোট অনুষ্ঠিত হবে। ট্রাম্প অসুস্থ হওয়ায় নির্বাচন পেছানো যাবে কি না, সেটা নির্ভর করছে মার্কিন কংগ্রেসের ওপর। মার্কিন আইন প্রণেতাদের হাতেই এই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট চাইলেই কিছু করতে পারবেন না। মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের সদস্যরা একমত হয়ে আইন পরিবর্তন করলেই সেক্ষেত্রে নির্বাচনের দিন পেছানো সম্ভব হতে পারে। উচ্চকক্ষ সিনেটের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতে থাকলেও নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে ডেমোক্র্যাটদের হাতে। তাই দুই কক্ষের আইন প্রণেতাদের একমত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
নির্বাচনের দিন বদলালেও প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের হেরফের হওয়ার কোনো সুযোগ নেই যুক্তরাষ্ট্রে। মার্কিন সংবিধানে বলা আছে, প্রেসিডেন্টের মেয়াদ হবে চার বছর। সেই হিসাবে ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি দুপুর থেকে ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। এই বিধানে পরিবর্তন আনতে হলে সংবিধানেই সংশোধনী আনতে হবে। সেটা হতে হবে দুই কক্ষের আইন প্রণেতাদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে। এটি অন্যভাবেও হতে পারে। সেটা অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের আইন করা। এক্ষেত্রে সংশোধনীর পক্ষে থাকতে হবে দুই-তৃতীয়াংশ অঙ্গরাজ্যকে। কিন্তু মার্কিন রাজনীতির বাস্তবতায় এর কোনোটিই এই মুহূর্তে সম্ভব বলে মনে হচ্ছে না। তাই নির্বাচন নির্দিষ্ট সময়ে হবে ধরে নেওয়া যায়। আর কোনো কারণে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী শেষ পর্যন্ত দাঁড়াতে না পারলে সেক্ষেত্রে দল নতুন প্রার্থী দেবে। কিন্তু আগাম ভোট শুরু হওয়ার পর নতুন প্রার্থী এলে তা নিয়ে বড় ধরনের জটিলতার শঙ্কা থেকেই যায়। এসব কারণে ৩ নভেম্বর এক ঘটনাবহুল নির্বাচন দেখার সুযোগ পেতে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব!
