বাঙালির কাছে সার্বজনীন এক উত্সবের নাম দুর্গাপূজা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব বাঙালির এক মহামিলনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে দুর্গাপূজার মণ্ডপগুলো। তাই এই উত্সব উদযাপনে পোশাকের প্রতি সবারই থাকে আলাদা নজর। আসছে পূজার ফ্যাশনের খবর জানাচ্ছেন লোপা চৌধুরী
প্রকৃতিজুড়ে বিরাজ করছে সাদা মেঘের ভেলা আর কাশফুলের স্নিগ্ধতা। ঠিক এমনই শুভ্র প্রকৃতির মাঝে সিঁদুর রাঙা আমেজ নিয়ে আসবে শারদীয় দুর্গাপূজা। পূজা আর শরত্ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় উত্সবের বর্ণিল পোশাক আর সাজসজ্জায়। কাশফুলের শুভ্রতা দেখা যায় পূজার শাড়িতেও। সাদা গরদের এই শাড়ির লাল পাড় ধারণ করে শক্তির প্রতীক। আর সাদা যে শান্তির বার্তা পিঠে করে স্বর্গ হয়ে পৃথিবী ঘুরে বেড়ায়। সেই আদিকাল থেকেই সাদা আর লালের সঙ্গে সখ্য গড়ে পূজায় সেজে আসছে মানুষ। লাল পেড়ে সাদা শাড়ির সঙ্গে আলতা রাঙানো পা ও সিঁদুরের রক্তিম ছোঁয়া পূর্ণ করে সনাতনী সাজকে। কপালে বড় একটি সিঁদুরের টিপ আর শাখা-পলার উপস্থিতি সেই সাজের জৌলুসকে বাড়িয়ে দেয় আরো কয়েকগুণ। তবে এ সাজ কেবল বিবাহিত নারীদের জন্যই।
একটু কম বয়সীরা শাড়ির পাশাপাশি বেছে নিতে পারেন সালোয়ার-কামিজ কিংবা জিন্স-ফতুয়া ও কুর্তাকে। লাল-সাদার পাশাপাশি বিভিন্ন উজ্জ্বল রং উঠে আসতে পারে পূজার পোশাকে। কেননা দুর্গাকে সাদরে বরণ করতে ঐতিহ্য আর সনাতনী সাজের পালে আজ লেগেছে নতুন হাওয়া। যে হাওয়াটা আধুনিকতার মলাটে মোড়ানো। তাই ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার স্বাচ্ছন্দ্য মেলবন্ধনে দেখা যায় গতানুগতিক রঙের পাশাপাশি সবুজ, নীল আর বেগুনিসহ অনেক রং এসে ধরা দেয় এই উত্সবে। শাড়ির পাশাপাশি এখন সালোয়ার-কামিজ, জিন্স ফতুয়া, টপস ও কুর্তায় দেখা যায় এসব রং। ফেব্রিক হিসেবে এখনকার পোশাকে প্রাধান্য পেয়েছে ভয়েল, সুতি, অ্যান্ডি সিল্ক, হাফ সিল্ক ও মসলিন। আর এসবে ব্যবহার করা হয়েছে এমব্রয়ডারি, স্ক্রিন প্রিন্ট, অ্যাপলিকের কাজসহ সিকোয়েন্স ও মেটালের কম্বিনেশন। অনেক কিছুর মতোই পূজার ফ্যাশনকেও প্রভাবিত করেছে সময়। ফলে মাত্র দশক তিনেক আগেও যে ধুতি ছিল ওতপ্রোত, সেই ধুতির জায়গা নিয়েছে পায়জামা বা আরো এগিয়ে বললে জিন্স। অন্যদিকে শাড়ির জায়গায় অনেকদিন আগেই প্রবেশাধিকার পেয়েছে সালোয়ার-কামিজ বা চুড়িদার কামিজ। এমনকি জিন্সও ব্রাত্য নেই। ফলে কোনো মণ্ডপে জিন্স-পাঞ্জাবি বা জিন্স-ফতুয়া পরা তরুণ আর জিন্স-কুর্তিতে কোনো তরুণীকে দেখলে আজ আর আমরা অবাক হই না। কারণ চলতি সময়ে থাকাই তো ফ্যাশন। তাই সংযোজন আর বিয়োজনকে নিয়েই এগিয়ে চলেছে পূজার ফ্যাশনও।
পূজার ফ্যাশন নিয়ে নন্দিত ফ্যাশন ডিজাইনার ও বিশ্বরঙ-এর স্বত্বাধিকারী বিপ্লব সাহা বলেন, পূজার মূল আনন্দই হলো দল বেঁধে বন্ধুদের সঙ্গে কিংবা সপরিবারে মন্দিরে মন্দিরে ঘুরে বেড়ানো। আর দেবী দর্শনসহ পূজার অনুষ্ঠানগুলো আনন্দঘন করে তোলা। আর এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে স্বাচ্ছন্দ্যময় পোশাক। এবারের দুর্গাপূজায় মোটিফের উত্স হচ্ছে আমাদের চিরচেনা ‘প্রকৃতি’। প্রকৃতি বলতে এই পৃথিবী তথা সমগ্র সৃষ্টিকে নির্দেশ করে। প্রকৃতি বলতে জাগতিক বিশ্বের মানব সৃষ্ট-নয় এমন দৃশ্য-অদৃশ্য বিষয় এবং জীবন ও প্রাণকে বোঝায়। স্বয়ং স্রষ্টার সৃষ্ট গাছ-পালা, নদী-নালা, পশু-পাখি, পাহাড়-পর্বত ইত্যাদি সকল বস্তুুর মতো মানুষও প্রকৃতির একটি উপাদান মাত্র। তাই আমরা ‘দুর্গাপূজা ২০২০’র পোশাক অলংকরণের অনুষঙ্গ হিসেবে প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানকে গ্রাফিক্যাল জ্যামিতিক ফর্মের সমন্বয়ে উপস্থাপন করেছে কাপড়ের মলিন সার্ফেসে। পোশাকের প্যাটার্নেও এসেছে ভিন্নতা। এবার দুর্গাপূজার পোশাকগুলো সিল্ক, হাফ সিল্ক, ডুপিয়ান, এন্ডি সহ বিভিন্ন কাপড়ের শাড়ি, পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস, ফতুয়া, শার্ট, টি-শার্ট, ইত্যাদিতে তুলে ধরা হয়েছে প্রকৃতির উপাদান— গাছ লতা, পাতা, ফুল ইত্যাদির গ্রাফিক্যাল জ্যামিতিক ফর্মগুলোর মোটিফ এবং গরমের কথা মাথায় রেখে ব্যবহার করা হয়েছে সুতি ও খাদি কাপড়। দুর্গাপূজার পোশাক গুলোতে উত্সবের আমেজ ফুটিয়ে তুলতে উজ্জল রঙের ব্যবহার করা হয়েছে, পাশাপাশি কাজের মাধ্যম হিসাবে এসেছে চুনরি, টাই-ডাই, ব্লক, বাটিক, এ্যাপলিক, কাটওয়ার্ক, স্ক্রিন প্রিন্ট ইত্যাদি।
আমাদের ফ্যাশন হাউজগুলো নান্দনিক ডিজাইনের পূজার পোশাক দিয়ে সাজিয়েছে তাদের আউটলেট। আপনি পূজার দিনের জন্য পছন্দের পোশাক কিনতে যেতে পারেন বিশ্বরঙ, অঞ্জন’স, কে ক্র্যাফট, রঙ বাংলাদেশ, বিবিআনা, নগরদোলা, বাংলার মেলাসহ অন্যান্য ফ্যাশন হাউজে। উত্সবের ফ্যাশনে শুধু নতুনত্বই নয়, ঐতিহ্যের ছোঁয়া আছে বলেই উত্সবের সাজে সার্বজনীনতা খুঁজে পাওয়া যায়।
মডেল চিত্রনায়ক ফেরদৌস ও শবনম ফারিয়া
পোশাক ও ছবি বিশ্বরঙ
