>> বেনজির আবরার
মানবিক মানুষের গল্প আমরা কমই সামনে আসতে দেখি। হতে পারে তাই, লুকোছাপাতেই কয়েক বছর পেরিয়ে গেছে কুমিল্লার সাধারণ মানুষের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘জাগ্রত মানবিকতা’। পিতা স্থানীয় সংসদ সদস্য বলেই কি না— পড়াশোনা শেষে পিতার মমতার স্পর্শে বেড়ে উঠা শহরকে নিয়ে ভাবতে শুরু করলেন কন্যা তাহসীন বাহার সূচনা।
শহরজুড়ে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে নারীদের আইনি সহায়তা প্রদান, মশক দমনে ২৭টি ওয়ার্ডে কাজ, প্রতিনিয়ত ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্প, বিভিন্ন স্কুলে সচেতনতামূলক আয়োজন, এতিমখানায় সাহায্য, রমজানে সেহরি ও ইফতার আর করোনাজুড়ে পিতার ফেসবুক পেজে আসা মেসেজ দেখে দেখে সাহায্য নিয়ে মানুষের সামনে হাজির হওয়া— এ যেন রূপকথার রাজকন্যা সূচনা!
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক তাহসীন বাহার সূচনা! কুমিল্লার এই মেয়ে পেয়েছেন তার বাবা কুমিল্লা-৬ আসনের সাংসদ আকম বাহাউদ্দীন বাহারের নেতৃত্বগুণের পুরোটাই। তার পিতা কুমিল্লার পৌরসভার দু’বারের মেয়র ছিলেন এবং বর্তমান এমপি। এমপি পরিবারের এই বড়কন্যা পেশায় পারিবারিক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানও সামলান পরিচালক হিসেবে।
পড়াশোনা কুমিল্লা মিশনারি স্কুল, কুমিল্লা উইমেন্স কলেজে উচ্চমাধ্যমিক, এরপর উত্তরার উইমেন্স মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পড়েছেন। তারপর শুরু করেছেন জাগ্রত মানবিকতার কাজ। বাবাকে যখন একজন বলল, আপনার মেয়ে এমবিবিএস পাশ, আপনার জীবনে তো আর চাওয়া পাওয়ার কিছু নেই। বাবা উত্তরে বললেন, দোয়া করো যাতে মানুষ হয়। ভালো মানুষ না হলে লাভ হবে না।
বাবাকে প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পেলেন নিজের স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান জাগ্রত মানবিকতায়, মা মেহেরুন্নেসা বাহার সংগঠনটির সভাপতি। পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে চলার এই সময়টায় একজন মানুষের কথা উঠবেই, সাইফুল ইসলাম রনি। তিনি তাহসীনের স্বামী, তবে এরচেয়ে বড় যদি বলা হয় সূচনার সকল কাজের প্রধান অনুপ্রেরণাদাতা।
কুমিল্লা শহরের ২৭টি ওয়ার্ডের পাশাপাশি জেলার ১৬টি উপজেলায় জাগ্রত মানবিকতা কাজ করছে নিয়মিত। জেলার বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে তাদের কাজ, প্রতিনিয়ত নানা তরুণ-তরুণী যুক্ত হচ্ছেন এই প্লাটফর্মে।
২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠন গত রমজানে প্রতিদিন ইফতার আর সেহরি করিয়েছে পথের মানুষদের। শহরের আশ্রম, এতিমখানা, মাদ্রাসায় তাদের সহযোগীতা প্রায় নিয়মিতই যায়। করোনায় স্থানীয় সংসদ সদস্য বাবার ফোন ও ফেসবুক পেজ থেকে নিম্ন-মধ্যবিত্তদের খাবার পাঠানোর ভলান্টিয়ারশিপ। জাগ্রত মানবিকতা করেছে লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্থ হাজারো মানুষের জন্য খাদ্য সরবরাহ। লকডাউনে পাঁচ হাজার অস্বচ্ছল মানুষের পনেরো দিনের খাদ্য দিয়েছেন তারা। অক্সিজেন ব্যাংক, প্লাজমা সহায়তা তো রয়েছেই। জাগ্রত মানবিকতা কারো অনুদান চেয়ে নেয় না। যদি কেউ দিতে চান তবে তাদেরকে ইভেন্টে এসে নিজ হাতে সহায়তা দিতে হয়।
এখন পর্যন্ত তারা ছয়জন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের পুরো খরচ বহন করেছেন তাদের ফান্ড থেকে। এরমধ্যে ক্যান্সারের ২ জন, হার্টের ২ জন, টিউমার নিয়ে থাকা ২ জন রয়েছেন। সার্জারির দায়িত্বই তারা নিয়েছেন ছয়জনের এখন পর্যন্ত। এই কাজ করতে গিয়ে প্রতিদিন মানুষের জীবনের গল্প তার চোখে ভাসে। সূচনা বললেন, সব মানুষের জীবনের গল্প এক নয়। আমরা নাঙ্গলকোটের একটা ছেলের সন্ধান পেয়েছিলাম, নাম রবিউল। ওর প্রতিবন্ধী জীবনে চিকিত্সা দিতে আমরা ওর পুরো খরচ বহন করি। ছেলেটাকে যখন আমি দেখতে যাই— সে বলে ওঠে, ‘আপনি আছেন, তাই আমি ভয় পাই না।’ এরকম নানা গল্প আমার চোখে এসেছে গত কয়েক বছর জাগ্রত মানবিকতার কাজ করতে গিয়ে। স্বপ্ন দেখি— কুমিল্লার মানুষের দুঃখগুলো যেন আমার নলেজে আসে; সব মোচন না করতে পারি—জানলে অন্তত সমাধানের চেষ্টা তো করতে পারব।
