প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘বাংলাদেশকে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ হিসেবে আমরা গড়ে তুলব। মুজিববর্ষে এটাই আমাদের অঙ্গীকার।’ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র ব্রেইল সংস্করণের মোড়ক উন্মোচনকালে তিনি আরো বলেন, ‘পঁচাত্তরে জাতির পিতাকে হত্যার পরে বাংলাদেশে স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাস ও ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নাম সব জায়গা থেকে মুছে ফেলা হয়েছিল। এ বই প্রকাশ হওয়ার পর সেই ইতিহাস বিকৃতির হাত থেকে কিছুটা হলেও আমরা রক্ষা পেয়েছি।’
প্রধানমন্ত্রী গতকাল বুধবার সকালে মন্ত্রিসভার সাপ্তাহিক বৈঠকের আগে এক ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে অংশ নেন। তিনি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে গণভবন থেকে এবং মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদের কক্ষ থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতার অসমাপ্ত আত্মজীবনী সারা বিশ্বে ইতিমধ্যে ১৪টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং আরো কয়েকটি ভাষায় অনুবাদ করার জন্য আমাদের কাছে অনুমতি চাওয়া হয়েছে। বিশ্বে যারাই এটা পড়েছে, তাদের কাছেই এটা অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য হয়েছে।’ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের ছয় খণ্ড ব্রেইল সংস্করণ প্রকাশ করায় প্রধানমন্ত্রী সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান। সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ অনুষ্ঠানে সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা করেন এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ দুটি বইয়ের নামকরণই জাতির পিতার ছোট কন্যা শেখ রেহানার করা—অনুষ্ঠানে জানান প্রধানমন্ত্রী। প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক শ্রেণি পর্যন্ত বছরের শুরুতে বিনা মূল্যে যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হয়, সেগুলোও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য ব্রেইল আকারে প্রকাশ করা হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে এই ব্রেইল বই প্রকাশ করার ফলে আমি মনে করব আমাদের সমাজের একটা মূল্যবান গোষ্ঠী, তারাও ইতিহাসটা জানার সুযোগ পাবে। আর এর মধ্য দিয়ে তারাও যে আমাদেরই একজন, সেটাও কিন্তু প্রমাণিত হলো।’ তিনি বইগুলো লাইব্রেরিতে সংগ্রহের পরামর্শ দিয়ে বলেন, কেননা, ব্যক্তিগত পর্যায়ে সংগ্রহ করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য এগুলো পড়াটা একটু কষ্টসাধ্য হবে।
প্রধানমন্ত্রী তার প্রয়াত বান্ধবী সাংবাদিক বেবী মওদুদকে নিয়ে জাতির পিতার ডায়েরিগুলো সংগ্রহ এবং একে পরিপূর্ণ বই আকারে প্রকাশের উদ্যোগ নেন উল্লেখ করে বলেন, ‘ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের রিপোর্টগুলো নিয়ে ইতিমধ্যে বই প্রকাশ করেছি (সিক্রেট ডকুমেন্ট অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান), যার ৬ খণ্ড ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে এবং ৭ম ও ৮ম খণ্ড (মোট ১৪ খণ্ডের মধ্যে) প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। এর মাধ্যমেও কিন্তু আমাদের দেশের সংগ্রামের ইতিহাস, বিশেষ করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামের ইতিহাসটা বের হয়ে এসেছে এবং আমরা কীভাবে স্বাধীনতা অর্জন করেছি সেটা ধীরে ধীরে প্রকাশ পেয়েছে। বঙ্গবন্ধুর কারাগারে বসে লেখা অপর আত্মজীবনী ‘কারাগারের রোজনামচা’র বিষয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ১৯৬৬ সালে ৬ দফা দেওয়ার পর তাকে (বঙ্গবন্ধু) যখন গ্রেফতার করে কারাগারে রাখা হয়, সে সময় তিনি এই ডায়েরিটা লেখেন। আর ১৯৫২ সালে একটি শান্তি সম্মেলন উপলক্ষ্যে চীন ভ্রমণ নিয়ে জাতির পিতা লেখেন ‘আমার দেখা নয়া চীন’। ১৯৫৪ সালে তিনি যখন গ্রেফতার ছিলেন, তখন এই লেখাটা লিখেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার এসব ব্যক্তিগত ডায়েরি, যা পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলো প্রতিটি খাতার ওপরই জেলখানার সেন্সরশিপের সিল ও সই রয়েছে। সময়গুলোও সেখান থেকে খোঁজ করে বের করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে আত্মজীবনী লেখার জন্য বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা সব সময় উদ্বুদ্ধ করতেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার মা সব সময় অনুপ্রেরণা দিতেন, তিনি (বঙ্গবন্ধু) যেন তার জীবনীটা লিখে রাখেন। সেই থেকে তিনি কিন্তু লিখতে শুরু করেন। বাবা যতবার কারাগার থেকে মুক্তি পেতেন, আমার মা জেলগেটে থেকে বাবার লেখার খাতাগুলো সংগ্রহ করে রাখতেন।’
অসমাপ্ত আত্মজীবনীর পাণ্ডুলিপি উদ্ধারের ইতিহাস প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, ১৯৭১ সালে এই খাতাগুলো আমরা প্রায় হারাতে বসেছিলাম। আমাদের ধানমন্ডির বাসায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী লুটপাট করে। তবে এগুলো লাইন টানা রুল করা কিছু খাতা ছিল বিধায় সেগুলো তাদের নজরে পড়েনি বা তাদের কাছে এগুলোর কোনো মূল্য ছিল না। যাই হোক, একসময় সেগুলো উদ্ধার করে নিয়ে আসি, যা অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ভূমিকায় আমি লিখেছি। খাতাগুলোর জীর্ণ-শীর্ণ দশা ছিল। ফটোকপি করে, স্ক্যান করে ম্যাগনিফাইং গ্লাস ব্যবহার করে অনেক কষ্ট করে সেগুলোর পাঠোদ্ধার করতে হয়েছে।’ জেনারেল জিয়ার আদলে খালেদা জিয়ার ইতিহাস বিকৃতির পদক্ষেপ সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০০১ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বঙ্গবন্ধু চেয়ার পর্যন্ত সরিয়ে দেয়।’
প্রতিবন্ধী নারীর দায়িত্ব নিলেন প্রধানমন্ত্রী
নিজে গরিব হওয়া সত্ত্বেও চাষি আমজাদ আলী শারীরিকভাবে অসুস্থ গর্ভবতী এক প্রতিবন্ধী নারীকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে চিকিত্সার ব্যবস্থা নেন। সংবাদপত্রের মাধ্যমে ঘটনাটি জানতে পেরে মানবিক চাষি আমজাদ আলীকে পুরস্কৃত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেন ঐ প্রতিবন্ধী নারীর।
